লজিস্টিক এফটিএক্স অনুশীলনের যুগে সেনাবাহিনী, সেনাপ্রধানের ‘টার্গেট’ বিশ্বমানের

প্রকাশিতঃ 9:34 am | January 09, 2022

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর :

১৯ ডিসেম্বর থেকে ১৪ জানুয়ারি। সেনাবাহিনীর চার সপ্তাহের শীতকালীন বহিরঙ্গন প্রশিক্ষণ। ক্যান্টনমেন্ট থেকে মাঠ সংযোগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা। দেশের দায়িত্বপূর্ণ প্রতিটি এলাকায় প্রায় শতভাগ সেনা সদস্য। নব উদ্যম নিয়েই চালিয়ে যাচ্ছেন নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ।

প্রবেশ করেছেন লজিস্টিক এফটিএক্স অনুশীলনের যুগেও। ৫০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সূচিত হয়েছে নতুন এক ধারা। যুদ্ধক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে পরিচিত এই ফিল্ড ট্রেনিং এক্সারসাইজের (এফটিএক্স) মাধ্যমে নিজেদের যুগোপযোগী করতে সুচিন্তিত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে সেনা সদর দপ্তর।

সেনাবাহিনীর নিজস্ব সক্ষমতায় সব ফরমেশনের মধ্যে ওয়্যারলেস, ভিস্যাট ও ইন্টারনেট কমিউনিকেশন যেমন স্থাপন করা হয়েছে, তেমনি প্রশিক্ষণে পরীক্ষা করা হচ্ছে সেনাবাহিনীতে নতুন সংযোজিত অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জামাদির কৌশলগত ব্যবহারও।

আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন সেনাবাহিনী গড়তে উন্নত-আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ভূমিকা পালন করবে যুগান্তকারী, এমটিই বলছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। তাদের ভাষ্য হচ্ছে- নিজ নেতৃত্বাধীন বাহিনীর দীর্ঘ ৫০ বছরের উজ্জ্বল-গৌরবময় পথপরিক্রমার ধারাবাহিকতায় নতুন বছরে নতুন প্রত্যাশায় সম্ভাবনার পথে স্বপ্নের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ।

ফলশ্রুতিতে প্রশিক্ষণকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে তিনি বিশ্বমানের একটি বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে প্রবলভাবেই আশাবাদী। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রশিক্ষণ পরিদর্শনকালে নিজের প্রতিটি বক্তব্যেই এই বিষয়টিকে ফোকাস করেছেন সেনাপ্রধান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশিত পেশাদারিত্বের কাঙ্খিত মান অর্জনের মতোই উদয়াস্ত নিরবচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণেই তাই পূর্ণ মনোনিবেশ করেছেন তার বাহিনীর সেনা সদস্যরা। পরিকল্পিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে দক্ষতার শিখরে পৌঁছতে চায় প্রতিটি সেনা সদস্য। সময়োপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই সামরিক বিশ্ব পরিমন্ডলে নিজেদের নতুন চেহারায় মেলে ধরার মাধ্যমে দুর্বৃত্তদেরও আবারও জানান দিতে চায়- ‘বাংলার মাটি, দুর্জয় ঘাঁটি’।

সূত্র মতে, উন্নয়নের সোপানে প্রশিক্ষণ অগ্রগতির সাফল্য নিশ্চিতে তৃণমূলে ছুটছেন সেনাপ্রধান। একেকদিন একেক এলাকায় যাচ্ছেন। আধুনিক প্রশিক্ষণ সাফল্যের নবযাত্রাকে বেগবান করতে গত ১২ দিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, হবিগঞ্জ, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, নড়াইল, খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায় স্বচোখে প্রশিক্ষণ পরিদর্শন করেন জেনারেল শফিউদ্দিন। বাহিনী প্রধানের সরাসরি উপস্থিতিতে আরও চাঙ্গা ও উজ্জীবিত হয়ে উঠছেন প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া সদস্যরা।

সূত্র মতে, সেনাপ্রধান প্রশিক্ষণসমূহের এলাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সার্বভৌম মানবিকতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড় করিয়েছেন দেশপ্রেমিক নিজ বাহিনীকে।

ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দর্শন ‘জনগণের সেনাবাহিনী’ বাস্তবায়নে দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন। দেশজুড়ে অসহায় ও দু:স্থ মানুষের শরীরে সেনারা জড়িয়ে দিচ্ছেন উষ্ণতার উপহার। ত্রাণ আর চিকিৎসা সেবাসহ নানামুখী জনকল্যাণমুখী কর্মযজ্ঞে সম্পৃক্ত রেখে স্থানীয়দের বুলিয়ে দিচ্ছেন মমতার পরশ।

আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, প্রতি বছরই শীতকালীন প্রশিক্ষণে বের হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। গত বছর অপারেশন কোভিড শিল্ড পরিচালিত হওয়ায় হয়নি প্রশিক্ষণ। ফলে এক বছরের বিরতিতে পূর্ণোদ্যমে অনুশীলনে মনোযোগ দিয়েছে বাহিনীটির সদস্যরা।

সেনাসদর দপ্তরসহ সেনাবাহিনীর সকল ফরমেশন মোতায়েন হয়েছে বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ এলাকায়। এই প্রশিক্ষণে সেনাবাহিনী সদর দপ্তর বহিরঙ্গনে এসে পূর্ণাঙ্গরূপে অনুশীলন করছে।

একই সূত্র বলছে, লজিস্টিক’র র ওপর ফিল্ড ট্রেনিং এক্সারসাইজ (এফটিএক্স) পরিচালনার অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণে সড়কপথের পাশাপাশি আকাশপথ, নদীপথ এবং রেলপথে সফলভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে রসদ সম্ভার পরিবহন করা হচ্ছে। ফোর্সেস গোল-২০৩০’র আলোকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নতুন সংযোজিত অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জামাদির কৌশলগত ব্যবহারও এবারের শীতকালীন প্রশিক্ষণে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

সেনা সদর মনে করছে, চলতি বছরের শীতকালীন প্রশিক্ষণ অনেক বেশী অভিনব ও বাস্তবধর্মী। দেশের সেবায় নিজেদের প্রস্তুত করে তুলতে সরেজমিনে বাস্তবধর্মী বিভিন্ন সামরিক বিষয়াদি অনুশীলনের মাধ্যমে পেশাগত দক্ষতার উন্নয়ন সাধন করাই মাসব্যাপী পরিচালিত এই অনুশীলনের মূল লক্ষ্য।

আইএসপিআর জানায়, এবারের অনুশীলনে সেনাবাহিনী প্রধান, প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, জিওসি আর্মি ট্রেনিং এ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ড, কমান্ড্যান্ট ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজসহ অন্যান্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন ফরমেশনে অনুশীলন কার্যক্রম পরিদর্শন এবং তাৎক্ষণিক দিকনির্দেশনা প্রদান করছেন।

কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্যের পেশাগত উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সার্বিকভাবে একটি বিশ্বমানের বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আশাবাদী সেনাপ্রধান।

যুদ্ধ বা বৈরিতা চান না প্রতিরক্ষামন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে আক্রান্ত হলে মোকাবিলার শক্তি অর্জন করতে চান। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে আধুনিক ও চৌকস বাহিনীতে রুপ দিতে নানামুখী উদ্যোগ ও কর্মপ্রয়াসের সফল বাস্তবায়নে ব্রত প্রধানমন্ত্রী।

স্বাধীনতা সুরক্ষার পবিত্র দায়িত্বে থাকা এই বাহিনীটিতে অত্যাধুনিক সাঁজোয়া যান, মাঝারি ও দূরপাল্লার এমএলআরএস রেজিমেন্ট, আকাশ বিধ্বংসী স্বয়ংক্রিয় সোরাড, ভিসোরাড ও সর্বাধুনিক অরলিকন মিসাইল রেজিমেন্টসহ নানাবিধ অস্ত্র-সরঞ্জামাদি সংযোজন করেছেন।

সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন দিকনির্দেশনায় জেনারেল এস এম শফিউদ্দিনের নেতৃত্বে এখন উন্নত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এবারের শীতকালীন প্রশিক্ষণে পুরোমাত্রায় সাফল্য নিশ্চিতের পাশাপাশি দেশপ্রেমিক সেনারা লজিস্টিক এফটিএক্স অনুশীলন অভিষেক নিজেদের প্রাণে প্রাণে শুভ কল্যাণের দোলার মাধ্যমে সামরিক বিশ্বে নিজেদের সমৃদ্ধির নতুন এক বার্তাই দিয়ে যাচ্ছে যেন!

কালের আলো/এমএএএমকে