প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক ইভেন্টে অংশগ্রহণ, প্রথম ড্র, প্রথম জয়- এমন অনেক কীর্তি গড়ার পর কণা-সারিকারা গড়েন নতুন এক ইতিহাস। ড্র করলেই এশিয়ান গেমসের মূল পর্বের টিকিট নিশ্চিত হয়ে যেত সেখানে জয় দিয়েই ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় গ্রুপ পর্বের শেষটা রাঙিয়েছেন তাঁরা। এশিয়ান গেমসের বাছাইপর্বে সম্প্রতি হংকং চায়নাকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার পাশাপাশি প্রথমবার এশিয়ান গেমসেও নাম লিখিয়েছেন লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এর আগে চীনের সানিয়াতে এশিয়ান বিচ গেমসে ১৪ বছর পর পদক জিতেছে বাংলাদেশ কাবাডির মেয়েরা।
লাল সবুজের মেয়েদের এই দুই সাফল্যে আনন্দিত দেশ। শনিবার (২৩ মে) রাজধানীর তেজগাঁও এর বিমান বাহিনী ফ্যালকন হলে ক্রীড়াঙ্গনের দুই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য উদযাপনে এবার বিশেষ আয়োজন করা হয় এদিন। সংবর্ধনার মাধ্যমে ঐতিহাসিক দুটি দলকেই এদিন পুরস্কার প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক, প্রধানমন্ত্রীর কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, হকি ফেডারেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং তাঁর সহধর্মিনী বাংলাদেশ বিমান বাহিনী মহিলা কল্যাণ সমিতি (বিএএফডব্লিউডব্লিউএ) ও আদার্স’ উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন ক্লাব (ওডব্লিউসিসি) এর সভাপতি বিএএফ লেডিস ক্লাব ও চিলড্রেনস ক্লাব- এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক সালেহা খান উপস্থিত ছিলেন।
জানা যায়, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পক্ষ থেকে নারী হকি দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়, কোচ ও ফিজিও পেয়েছেন এক লাখ টাকা করে পুরস্কার। নারী হকির পৃষ্ঠপোষক ব্র্যাংক ব্যাংকও এদিন খেলোয়াড়দের আরও ১ লাখ টাকা করে দিয়েছে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক খেলোয়াড়দের হাতে এই অর্থ হস্তান্তর করেন। নারী হকি দলের পাশাপাশি এদিন আর্থিক প্রণোদনা পেয়েছে নারী কাবাডি দলও। সদ্য সমাপ্ত এশিয়ান বীচ গেমসে বাংলাদেশ নারী দল ব্রোঞ্জ পদক লাভ করে। এই সাফল্য অর্জনের জন্য খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফকে ১ লাখ টাকা করে দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এদিন সফল নারী হকি ও কাবাডি দলের খেলোয়াড়দের হাতে ৫০ লাখ টাকার অর্থ পুরস্কার তুলে দিয়েছেন।

অনুষ্ঠানে হকি ফেডারেশনের সভাপতি ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন হকির নানাবিধ সীমাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত টার্ফ ও ব্যয়বহুল সরঞ্জামের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে দেশের ক্রীড়াঙ্গন পুনর্গঠনের উদ্যোগ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।’ বিমান বাহিনী প্রধান বিভাগীয় পর্যায়ে ফাইভ-এ-সাইড হকি টার্ফ স্থাপন এবং ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা হকি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে বিনামূল্যে খেলার সরঞ্জাম দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলা বজায় রেখে সেরাটা খেলার পরামর্শ দেন।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বিমান বাহিনী প্রধানের আহ্বান এর প্রতি সাধুবাদ জানান। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, ‘সরকার বিকেএসপি নিয়ে বড় পরিসরে কাজ করছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নতুন হকি খেলোয়াড় তুলে আনার লক্ষ্যে সরকার ছোট ছোট ‘মিনি টার্ফ’ তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।’
বাংলাদেশ নারী হকি দলের কণা-সারিকাদের এবার লক্ষ্য জাপানের মাটিতে জুনিয়র এশিয়া কাপে ভালো কিছু করা। ২৯ মে থেকে ৬ জুন প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে বাংলাদেশ ছেলে ও মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৮ দল। দুই দলই জাপানের বিমানে চড়বে ২৭ মে। ইতোমধ্যেই বিকেএসপিতে শুরু হয়েছে প্রস্তুতি ক্যাম্প। শনিবার (২৩ মে) বিমানবাহিনীর ফ্যালকন হলে দুই জুনিয়র দলের জার্সি উন্মোচন-ফটোসেশনও হয়েছে এদিন।

অনুষ্ঠানে নিজের খেলোয়াড়ী জীবনের স্মৃতিচারণ করে দেশের হকি ও কাবাডি খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে একটি অনুপ্রেরণামূলক বার্তা দেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তিনি বলেন, ‘নিজের খেলার সরঞ্জাম নিজে বহন ও যত্ন করলে সেটার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ে ও সেটি গুরুত্ববহ হয়।’ উদাহরণ টেনে তিনি জানান, এখনো কোথাও খেলতে গেলে তিনি নিজেই নিজের বুট ও ব্যাগ বহন করেন এবং খেলোয়াড়ী জীবনে প্র্যাকটিস বা খেলার পর নিজেই বুট পরিষ্কার করতেন।
দেশের ক্রীড়াঙ্গনে একের পর এক গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য বয়ে আনছেন নারী ক্রীড়াবিদরা। এবার সেই সাফল্যের মুকুটে যুক্ত হলো আরও একটি উজ্জ্বল পালক। ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় এশিয়ান গেমস বাছাইয়ের গ্রুপ পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সেমিফাইনালে উঠে বাংলাদেশ। জাতীয় হকি নারী দল অর্জন করে রৌপ্যপদক। এর মাধ্যমেই আসন্ন এশিয়ান গেমসের মূল পর্বে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছেন অর্পিতারা; যা পুরো ক্রীড়াঙ্গনে সৃষ্টি করে ব্যাপক আলোড়ন। ২০১৯ সাল থেকে নারী হকি দল যাত্রা শুরু করে। বয়স ভিত্তিক পর্যায়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আসরে অংশগ্রহণ করে ব্রোঞ্জ ও সিলভার পদক অর্জন করে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। তবে, এশিয়ান গেমস কোয়ালিফাইং টুর্নামেন্টে এবারই প্রথম জাতীয় নারী হকি দল হিসেবে আন্তর্জাতিক কোনো টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেছে এবং রৌপ্য পদক অর্জন করেছে।
আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, এশিয়ান বিচ গেমস শুরুর প্রথম তিন বছর বাংলাদেশ কাবাডিতে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিল। ১৪ বছর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও জাতীয় কাবাডি দলের নারী সাফল্যে সেই মুকুট ফেরত পেলো বাংলাদেশ। অনূর্ধ্ব-১৮ এশিয়া কাপে পুরুষ টুর্নামেন্টে মোট ৯টি দেশ বাংলাদেশসহ ইন্ডিয়া, কোরিয়া, জাপান, চাইনিজ তাইপে, কাজাখাস্তান, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান ও চীন এবং নারী টুর্নামেন্টে মোট ৮টি দেশ বাংলাদেশসহ ইন্ডিয়া, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, চীন, জাপান ও চাইনিজ তাইপে অংশগ্রহন করবে। গত বছর এই টুর্নামেন্টে পুরুষ দল সেমিফাইনাল খেলে এবং নারী হকি দল ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জাপানের মাটিতে জুনিয়র এশিয়া কাপে মেয়েদের জন্য এবারের যাত্রাটা ঠিক আগের মতো মসৃণ নয়। গত বছর তারা প্রথমবার অংশ নিয়েই বাজিমাত করেছিল, জিতেছিল ব্রোঞ্জ। কিন্তু এবার গ্রুপ পর্বে তাদের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে গত আসরের চ্যাম্পিয়ন জাপান আর রানার্সআপ চীন। সঙ্গে আছে শক্তিশালী চায়নিজ তাইপেও। মাঠের লড়াই কতটা কঠিন হতে যাচ্ছে, তা কোচ জাহিদ হোসেনের কথায়ও স্পষ্ট, ‘গতবার কিন্তু আমাদের প্রতিপক্ষ সহজ ছিল। সে জন্য আমরা প্রথম অংশ নিয়ে একটা পদক জিততে পেরেছি। এবার সেটা কঠিন হবে।’ তবে কঠিন মানেই মেনে নেওয়া নয়, কোচের কণ্ঠে সেই প্রত্যয়, ‘আমরা আশা ছাড়ছি না। ভালো খেলতে পারলে অবশ্যই ইতিবাচক কিছু পাওয়া যাবে। মেয়েরা খুব আত্মবিশ্বাসী। তারা এই বাধাটা জয় করতে চায়।’

বাংলাদেশ জাতীয় নারী হকি দলের অধিনায়ক অর্পিতা পাল বলেন, ‘হকি ফেডারেশন ও বিকেএসপি আমাদের জন্য অনেক কাজ করেছে এজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। সরকারও নানাভাবে সাহায্য করেছে। আমরা অলিম্পিক খেলতে চাই।’ এশিয়ান বীচ গেমসে বাংলাদেশের অধিনায়কত্ব করা শ্রাবণী মল্লিক বলেন, ‘দেশের পতাকাকে বিশ্ব মঞ্চে তুলে ধরতে চাই আমরা। এজন্য সকলের সহযোগিতা প্রত্যাশী।’
কালের আলো/এমএএএমকে
আপনার মতামত লিখুন
Array