বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে গত ছয় মাসে দৃশ্যমানভাবে তৎপরতা বাড়িয়েছে সরকার। পাচারকারীদের বিদেশে গড়ে তোলা সম্পদের তথ্য সংগ্রহ, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সেগুলো দেশে ফেরাতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২৩টি দেশে ৪৪টি পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ বা মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানোর পাশাপাশি ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদ্যোগ হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশে থাকা সম্পদের সন্ধান এবং সেগুলো ফেরানোর আইনি প্রক্রিয়ায় সহায়তার জন্য আটটি আন্তর্জাতিক ল-ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আগের তুলনায় আরও সমন্বিত ও আক্রমণাত্মক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
টাস্কফোর্স পুনর্গঠন, এক ছাতার নিচে একাধিক সংস্থা
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে গঠিত আন্তসংস্থা টাস্কফোর্সকে পুনর্গঠন ও সক্রিয় করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বাধীন এই টাস্কফোর্সে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি সংস্থা যুক্ত রয়েছে। এর সাচিবিক সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
টাস্কফোর্সের অধীনে দেশের বড় ১০টি ব্যবসায়ী গ্রুপ এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তে ১০টি জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম (জেআইটি) গঠন করা হয়েছে। এসব দলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বিএফআইইউর কর্মকর্তারা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। এর বাইরে আরও দুই ব্যক্তিসহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তে নেওয়া হয়েছে।
২৩ দেশে ৪৪টি এমএলএআর
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের পথ অনুসরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হচ্ছে এমএলএআর। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের কাছ থেকে ব্যাংক হিসাব, সম্পদ, কোম্পানি কাঠামো, লেনদেনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া হয়। বর্তমান সরকারের সময়ে গত ছয় মাসে ২৩টি দেশে ৪৪টি এমএলএআর পাঠানো হয়েছে। এসব অনুরোধের মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থের গন্তব্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
তবে এমএলএআরের জবাব পাওয়া এবং সেই তথ্যকে বাংলাদেশের আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবহারযোগ্য প্রমাণে রূপান্তর করা সময়সাপেক্ষ। ফলে দ্রুত অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা।
শনাক্ত ৪২ প্রতিষ্ঠান, সামনে সম্পদ উদ্ধারের কঠিন লড়াই
সরকারি উদ্যোগে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এখন এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশে থাকা সম্পদের সন্ধান এবং সেগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় জব্দ বা দেশে ফিরিয়ে আনার কাজ সামনে। এই পর্যায়েই আটটি আন্তর্জাতিক ল-ফার্মের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিদেশি আইনের কাঠামো, সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রক্রিয়া এবং সম্পদের মালিকানা কাঠামো বিশ্লেষণে স্থানীয় সংস্থার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ, অর্থ পাচার শনাক্ত করা থেকে অর্থ দেশে ফেরানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি এখন কয়েকটি ধাপে এগোচ্ছে—তথ্য সংগ্রহ, সম্পদ শনাক্তকরণ, আইনি ব্যবস্থা এবং শেষ পর্যন্ত অর্থ প্রত্যাবাসন।
দেড় শতাধিক অনুসন্ধান আটকে তথ্য-প্রমাণে
তবে সরকারের এই তৎপরতার মাঝেও বড় বাধা হয়ে আছে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণের সংকট। দুদকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বিদেশে অর্থ পাচারসংক্রান্ত ১৫৭টি মামলা বা অনুসন্ধান অনিষ্পন্ন ছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ১৪৮।
দুদক সূত্র বলছে, বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় নথি ও আর্থিক তথ্য না পাওয়ায় এসব অনুসন্ধানের বড় একটি অংশ বছরের পর বছর ঝুলে আছে। কারণ অর্থ পাচারের অভিযোগ আদালতে প্রতিষ্ঠিত করতে শুধু সন্দেহ বা দেশীয় তথ্য যথেষ্ট নয়; বিদেশে থাকা অর্থ-সম্পদ এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও আইনসম্মত প্রমাণ প্রয়োজন।
এ কারণে এমএলআরের মাধ্যমে তথ্য পাওয়াকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে তদন্ত কর্মকর্তাদের পাঠিয়ে সরাসরি তথ্য ও নথি সংগ্রহের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
পাচারের প্রধান গন্তব্য ১০ দেশ
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থ পাচারের অভিযোগে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে কানাডা, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কেম্যান আইল্যান্ড ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড। এসব দেশে বাংলাদেশি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা সম্পদ এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহে দীর্ঘদিন ধরেই যোগাযোগ করছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। কিন্তু প্রতিটি দেশের আইন ও প্রক্রিয়া আলাদা হওয়ায় এক দেশের তদন্ত পদ্ধতি অন্য দেশে সরাসরি প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। এখানেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দক্ষ আইনি প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।
পুরোনো উদ্যোগ, নতুন গতি
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর আইনি উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০০৭ সালের পর থেকেই এ ধরনের অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ শুরু হয়। গত প্রায় দেড় যুগে দুদক বিশ্বের ৭১টি দেশে শতাধিক এমএলএআর পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ২৭টির জবাব পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অর্থাৎ, বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তার প্রক্রিয়া চললেও কাঙ্ক্ষিত গতিতে অর্থ দেশে ফেরানো সম্ভব হয়নি। বর্তমান উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো—শুধু এমএলএআর পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তদন্ত, সম্পদ শনাক্তকরণ ও আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তাকে আরও সমন্বিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
দুদক ইতোমধ্যে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই), জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে বৈঠক করেছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন করে তদন্ত
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক মন্ত্রী, এমপি, আমলা ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান জোরদার করে দুদক। সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সাবেক এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর রহমানসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও মামলা হয়েছে।
তবে এসব অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য ও মালিকানা কাঠামোর প্রমাণ সংগ্রহই বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে নতুন করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগকে এসব তদন্তের পরবর্তী ধাপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
টাকা ফেরানোই এখন আসল পরীক্ষা
অর্থ পাচারের অভিযোগ শনাক্ত করা এবং বিদেশে সম্পদের সন্ধান পাওয়া—দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও শেষ পর্যন্ত সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে পাচার হওয়া অর্থ কতটা দেশে ফেরানো সম্ভব হয় তার ওপর। এখানে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—বিদেশি দেশ থেকে দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য তথ্য পাওয়া, আদালতে উপস্থাপনের মতো প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে সম্পদ জব্দ ও অর্থ প্রত্যাবাসন করা।
আটটি আন্তর্জাতিক ল-ফার্ম নিয়োগ, ২৩ দেশে ৪৪টি এমএলএআর এবং আন্তসংস্থা তদন্ত দলের কার্যক্রম তাই সরকারের উদ্যোগকে আগের তুলনায় আরও কাঠামোবদ্ধ করেছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য মাপা হবে তখনই, যখন শনাক্ত সম্পদ আইনি প্রক্রিয়ায় জব্দ করে তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবে বাংলাদেশে ফেরানো যাবে। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সরকারের সামনে এখন মূল প্রশ্ন তাই শুধু ‘কোথায় গেল টাকা’ নয়—কত দ্রুত, কতটা এবং কোন আইনি প্রক্রিয়ায় সেই টাকা দেশে ফেরানো সম্ভব হবে।
কালের আলো/এম/এএই
আপনার মতামত লিখুন
Array