প্রস্তাবিত বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে যথেষ্ট বরাদ্দ নেই: সিপিডি
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সংস্থাটির মতে, বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পক্ষে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও সামগ্রিক রাজস্ব ও প্রণোদনা কাঠামো এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিকেই বেশি সুবিধা দিচ্ছে। ফলে দেশের জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্য অর্জন এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণের পথে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত কী পেল?’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তী।
সিপিডির বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বরাদ্দের মাত্র ২ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাকি ৯৮ শতাংশ বরাদ্দ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয় হবে।
সংস্থাটি মনে করে, এই চিত্র সরকারের প্রশাসন ও জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিকেন্দ্রিক মানসিকতার উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। তবে সামগ্রিক জাতীয় বাজেটে এ খাতের অংশ কমে ২ দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদ্যুৎ বিভাগের বরাদ্দ কমে ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ কম। অন্যদিকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বরাদ্দ প্রায় ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সিপিডির মতে, মূলত গ্যাস অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উত্তোলন কার্যক্রমে জোর দেওয়ার কারণেই এই বৃদ্ধি ঘটেছে। তবে বাজেটে প্রথমবারের মতো সৌরবিদ্যুৎ খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ করহার বা কর অবকাশের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ভোক্তারা সৌরবিদ্যুতের বিল পরিশোধের বিপরীতে ৫ শতাংশ কর রিবেট সুবিধা পাবেন।
‘এছাড়া সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিলের কাঠামো এবং বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক কন্ডাক্টরের ওপর বিদ্যমান উচ্চ করহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এসব পণ্যে ৬২ থেকে ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত করভার থাকলেও তা কমিয়ে ২৬ থেকে ৩৮ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ওপর করভার ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৬ দশমিক ৩ শতাংশ, সোলার ইনভার্টারের কর ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং সোলার প্যানেলের কর ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২২ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং স্টেশনের ওপর আরোপিত কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং নিবন্ধন ফি কমানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে সিপিডি।
তবে সংস্থাটি বলছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য কিছু সুবিধা বাড়ানো হলেও একই সময়ে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক খাতেও উল্লেখযোগ্য কর ও শুল্ক সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। বাজেটে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি অব্যাহত রয়েছে, যা একে দেশের অন্যতম কম করযুক্ত জ্বালানি হিসেবে ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানিতে শুল্ক সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এছাড়া অভ্যন্তরীণ কয়লা অনুসন্ধান ও উত্তোলনে নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সিপিডির মতে, এই ধরনের পদক্ষেপ দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি রূপান্তর কৌশল এবং জলবায়ুবান্ধব উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকার একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে উৎসাহিত করার বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির জন্যও বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা ও কর-সুবিধা অব্যাহত রাখছে। ফলে নীতিগতভাবে একটি দ্বৈত অবস্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, যখন সরকার উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি না করার কথা বলছে, তখন একই সঙ্গে এলএনজির জন্য কর-সুবিধা বজায় রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একইভাবে নতুন কয়লা অনুসন্ধান এবং কয়লা আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট রাজস্ব কাঠামোর বিদ্যমান বৈষম্য পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগ থাকলেও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক খাতগুলো এখনো তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাচ্ছে। টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে হলে ভবিষ্যতে এসব বৈষম্য কমিয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ ও প্রণোদনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, ডেমোক্রেটিক বাজেট মুভমেন্টের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার মোস্তফা এবং ইডকলের চিফ রিস্ক অফিসার মোহাম্মদ জাবেদ ইমরানসহ সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array