শনিবার দুপুর। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) ঢুকতেই চোখে পড়ল ব্যস্ততার চেনা দৃশ্য। কোথাও শুটিংয়ের প্রস্তুতি, কোথাও সেট তৈরির কাজ, আবার কোথাও শিল্পী-নির্মাতাদের আড্ডা। এক ফ্লোর থেকে আরেক ফ্লোরে ছুটে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা।
দীর্ঘদিন পর যেন কিছুটা পুরোনো কর্মচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে এফডিসি। একই দিনে আলাদা দুটি শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন আফরান নিশো ও নুসরাত ফারিয়া। নিশো ব্যস্ত ছিলেন একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের শুটিংয়ে, আর ফারিয়া করছিলেন মেহেদী হাসান হৃদয়ের নতুন ওয়েব ফিল্ম ‘লাপাত্তা’র দৃশ্যধারণ।
শুটিংয়ের সূত্রেই অনেক দিন পর দেখা হয় নিশো ও ফারিয়ার। একে অপরের কাজের খবর নেন, কিছু সময় আড্ডাতেও মেতে ওঠেন দুজন।
বেলা দেড়টার পর এফডিসির ঝরনা স্পটের পুকুরপাড়ে ‘লাপাত্তা’র দৃশ্যধারণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পরিচালক মেহেদী হাসান হৃদয়। সহকারীকে দিয়ে নায়িকাকে দ্রুত শুটিং স্পটে আসার খবর পাঠানো হয়।
কিছুক্ষণ পর গোলাপি শাড়ি পরে সেখানে হাজির হন নুসরাত ফারিয়া। পাশে ছাতা ধরে হাঁটছিলেন একজন। ঝরনা স্পটের ছোট পুকুরের ওপর তৈরি করা হয়েছিল একটি ছোট্ট সেতু। বাহারি রঙের কাপড় ও বিভিন্ন ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছিল সেটটি।
পরিচালক জানান, সিনেমায় নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করছেন ফারিয়া। চরিত্রের প্রয়োজনেই এমন সাজসজ্জা করা হয়েছে। এই ওয়েব ফিল্মের মাধ্যমে অনেক দিন পর ক্যামেরার সামনে ফিরেছেন অভিনেত্রী। পরিচালক মেহেদী হাসান হৃদয়ের সঙ্গে এবারই প্রথম কাজ করছেন তিনি।
‘লাপাত্তা’য় নায়কের চরিত্রে অভিনয় করছেন রুশো শেখ। ফারিয়ার আগেই কস্টিউম পরে শুটিং স্পটে প্রস্তুত ছিলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর শুরু হয় দৃশ্যধারণ।
শুটিংয়ের সময় পরিচালকের মুঠোফোনে বাজছিল মনির খান ও কনকচাঁপার জনপ্রিয় গান ‘এই বুকে বইছে যমুনা’। নব্বইয়ের দশকে ‘প্রেমের তাজমহল’ সিনেমায় রিয়াজ ও শাবনূরের ঠোঁটে জনপ্রিয় হওয়া গানটি ‘লাপাত্তা’তেও অল্প সময়ের জন্য ব্যবহৃত হবে। তবে এবার গানটির সঙ্গে পর্দায় দেখা যাবে নুসরাত ফারিয়া ও রুশো শেখকে।
কয়েকবার দৃশ্য ধারণের পর পরিচালক সন্তুষ্ট হলে পরের দৃশ্যের প্রস্তুতি নেন ফারিয়া। এবার তার সঙ্গে একই ফ্রেমে ছিলেন অভিনেতা নাসির উদ্দিন খান। পরিচালক জানান, ছবিটিতে নাসির উদ্দিন খান তিনটি চরিত্রে অভিনয় করছেন। এর মধ্যে দুটি চরিত্র মুচি সম্প্রদায়ের বাবা ও ছেলের, অন্যটি একজন ব্যবসায়ীর।
শুটিংয়ের ফাঁকে নতুন কাজ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ফারিয়া। বলেন, গল্পটি তার বেশ ভালো লেগেছে। পছন্দের একটি চরিত্র নিয়ে অনেক দিন পর কাজে ফিরতে পেরে আনন্দিত তিনি।
ফারিয়ার সঙ্গে কথা বলার সময় উঠে আসে আফরান নিশোর প্রসঙ্গ। তিনি জানান, এফডিসিতেই নিশোর সঙ্গে দেখা হয়েছে। দুজনই একে অপরের কাজের খবর নিয়েছেন। অনেক দিন পর দেখা হওয়ায় দুজনেরই ভালো লেগেছে।
ফারিয়ার শুটিং স্পট থেকে বেরিয়ে এফডিসির অন্য প্রান্তে যেতেই দেখা গেল ভিন্ন ব্যস্ততা। পরিচালক সমিতির সামনের একটি ফ্লোরে চলছিল আরেকটি সিনেমার শুটিংয়ের প্রস্তুতি। সেখানে ‘বাসর হবে মাটির ঘরে’ ছবির গানের দৃশ্য ধারণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।
সেখান থেকে বের হতেই দেখা মেলে একসময়ের ব্যস্ত নির্মাতা বাদল খন্দকারের। ‘দুনিয়ার বাদশা’ দিয়ে নির্মাণে যাত্রা শুরু করা এই পরিচালক ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘পৃথিবী তোমার আমার’, ‘মিস ডায়না’, ‘সাগরিকা’, ‘প্রেম করেছি বেশ করেছি’ ও ‘বিদ্রোহী পদ্মা’র মতো সিনেমা নির্মাণ করেছেন।
পরিচালক সমিতির বারান্দায় কয়েকজন নির্মাতার সঙ্গে আড্ডায় ছিলেন তিনি। দেখা হতেই ডাক দিয়ে বসান। শুরু হয় সিনেমার নানা সময়ের গল্প। কথায় কথায় উঠে আসে এহতেশাম, মনতাজুর রহমান আকবর থেকে শুরু করে হালের রায়হান রাফীর প্রসঙ্গ। আলোচনায় আসে হেলাল খান, সালমান শাহ ও শাকিব খানের কথাও।
পুরোনো সিনেমা, এফডিসির স্মৃতি ও নির্মাণের নানা অভিজ্ঞতার গল্পে জমে ওঠে আড্ডা। বর্তমানে নির্মাণের চেয়ে ব্যবসায় বেশি মনোযোগী বাদল খন্দকার। তবে সময় পেলেই এফডিসিতে চলে আসেন। পুরোনো জায়গায় পরিচিত মানুষদের সঙ্গে দেখা করা ও আড্ডা দেওয়াকে তিনি অনেকটা স্মৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার মতোই মনে করেন।
এদিকে এফডিসির ক্যানটিনের সামনে চলছিল আরেকটি শুটিং। সেটি ছিল আফরান নিশোর একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের কাজ। সেখানে দেখা হয় অভিনেতা শরিফ সিরাজের সঙ্গে। তিনি জানান, শুটিংয়ে তিনিও অংশ নিচ্ছেন এবং নিশো মেকআপ রুমে রয়েছেন।
কড়ইতলার পাশের রূপসজ্জা কক্ষে গিয়ে দেখা যায় নিশোকে। তখন দুপুরের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। কথা প্রসঙ্গে নিশো নিজেই জানতে চান, মেহেদী হাসান হৃদয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি কি না। ‘লাপাত্তা’র শুটিং দেখতে আসা এবং ফারিয়ার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা জানালে তিনিও জানান, ফারিয়ার সঙ্গে তার দেখা হয়েছে এবং দুজনই একে অপরের খোঁজ নিয়েছেন।
কাজের প্রসঙ্গে নিশো জানান, এ বছর আবার বড় পর্দায় তাকে দেখা যেতে পারে। ‘সুড়ঙ্গ ২’ সিনেমায় তার অভিনয়ের বিষয়টি মোটামুটি নিশ্চিত। সবকিছু ঠিক থাকলে এ বছর দুটি সিনেমায়ও দেখা যেতে পারে তাকে। তবে অন্য কোনো কাজ এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান তিনি।
এ সময় রূপসজ্জা কক্ষে আসেন বিজ্ঞাপনচিত্রটির পরিচালক শঙ্খ দাশ গুপ্ত। এফডিসি ও চলচ্চিত্রের নানা বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে কথাবার্তা চলছিল। কিছুক্ষণ পর সেখানে যোগ দেন অভিনয়শিল্পী ও তরুণ পরিচালক পার্থ শেখ।
এরপর আড্ডা আরও জমে ওঠে। এফডিসির স্মৃতি, শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা ও জীবনের নানা মজার ঘটনা নিয়ে গল্পে মেতে ওঠেন তারা। বাইরে তখন ক্যামেরা, আলো আর শুটিংয়ের ব্যস্ততা; আর ভেতরে চলচ্চিত্রের মানুষদের গল্পে ফিরে আসছিল এফডিসির নানা সময়ের স্মৃতি।
ফেরার পথে কড়ইতলার সামনে দেখা হয় রূপসজ্জাশিল্পী মোহাম্মদ সেলিমের সঙ্গে। নতুন একটি কাজের বিষয়ে কথা বলতে এফডিসিতে এসেছেন তিনি। শিগগিরই সেই কাজ শুরু হওয়ার কথা জানান।
একই দিনে এফডিসিতে চলছিল অন্তত তিনটি আলাদা শুটিং। একদিকে নুসরাত ফারিয়ার ‘লাপাত্তা’, অন্যদিকে আফরান নিশোর বিজ্ঞাপনচিত্র। কাজের ধরন আলাদা হলেও এই দুই শুটিংই দীর্ঘদিন পর নিশো ও ফারিয়াকে মুখোমুখি করে দিল।
আর সেই দেখা হওয়ার সূত্র ধরে একটি শনিবারের এফডিসি হয়ে উঠল নতুন কাজ, পুরোনো স্মৃতি, আড্ডা আর সিনেমার মানুষের চেনা ব্যস্ততার এক মিলনস্থল।
এফডিসির ঝরনা স্পট, ক্যানটিন, রূপসজ্জা কক্ষ কিংবা কড়ইতলা—প্রতিটি জায়গাতেই যেন আলাদা গল্প। কোথাও ক্যামেরার সামনে তৈরি হচ্ছে নতুন দৃশ্য, কোথাও পুরোনো দিনের সিনেমা নিয়ে জমছে আড্ডা। সব মিলিয়ে শনিবারের এফডিসি মনে করিয়ে দিল, ক্যামেরার বাইরে ঘটে যাওয়া এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই হয়তো চলচ্চিত্রের এই চেনা জায়গাটির গল্পকে এখনো জীবন্ত করে রেখেছে।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array