বিমান চলাচলে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি যেমন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে, তেমনি তৈরি করছে নিরাপত্তার নতুন ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ভবিষ্যৎ উপযোগী, কার্যকর ও টেকসই ফ্লাইট সেফটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ঢাকায় শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক উড্ডয়ন নিরাপত্তা সেমিনার। প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, উন্নত প্রশিক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং সমন্বিত দলগত কার্যক্রমের মাধ্যমে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এ সেমিনারের উদ্বোধন করা হয়। সেমিনারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। আগামী ২৮ অক্টোবর সেমিনারটি শেষ হবে।
- ২০ দেশের বিমান বাহিনী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে শুরু তিন দিনের ফ্লাইট সেফটি সেমিনার
- প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে দক্ষ জনবল, উন্নত প্রশিক্ষণ ও দলগত সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব;
- অংশ নিচ্ছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক ও বেসামরিক বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) যৌথ ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এ আন্তর্জাতিক সেমিনারে দেশি-বিদেশি বিমান চলাচল ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন। সেমিনারে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফ্লাইট সেফটির সংস্কৃতি গড়ে তোলা, উদীয়মান ঝুঁকি মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সর্বোত্তম চর্চা বিনিময়ের মাধ্যমে নিরাপদ আকাশ নিশ্চিত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এই বছরের সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্য—‘প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং দলগত কাজ: ভবিষ্যৎ-উপযোগী সুরক্ষামূলক মানসিকতা তৈরি করা’। প্রতিপাদ্যটি শুধু প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নয়ন নয়, বরং মানবসম্পদ, দক্ষতা, নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে এনেছে।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন বলেন, ‘বিমান চলাচল খাতে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করার পাশাপাশি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।’ তিনি উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, যথাযথ প্রশিক্ষণ, দক্ষ জনবল, কার্যকর নেতৃত্ব, আন্তঃসংস্থা সমন্বয় এবং দলগত কার্যক্রমকে ফ্লাইট সেফটি নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আধুনিক বিমান চলাচলে শুধু উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করাই যথেষ্ট নয়; সেই প্রযুক্তি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বিতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিমান বাহিনী প্রধান ফ্লাইট সেফটি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী করে তুলতে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও দলগত কার্যক্রমের সমন্বিত প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক সেমিনার অংশগ্রহণকারী দেশ ও সংস্থাগুলোর মধ্যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সর্বোত্তম চর্চা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে। এর মাধ্যমে ফ্লাইট সেফটির ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।
নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রযুক্তির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দক্ষতাও
আধুনিক বিমান চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি, মানবিক দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার পারস্পরিক সম্পর্ক ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। উন্নত প্রযুক্তি ঝুঁকি শনাক্তকরণ ও পরিচালনাগত দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করলেও প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নির্ভর করে প্রশিক্ষিত জনবল, কার্যকর নেতৃত্ব এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর।
এ কারণে সেমিনারে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন, হিউম্যান ফ্যাক্টর, সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এসএমএস), মানব-প্রযুক্তির সমন্বয় এবং দলগত কার্যক্রমকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে আলোচনা বিমান চলাচলের নিরাপত্তাকে কেবল দুর্ঘটনা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশেষজ্ঞ ও অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন প্রবন্ধ উপস্থাপন এবং মতবিনিময়ের মাধ্যমে ফ্লাইট সেফটির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরছেন। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ ফ্লাইট সেফটি ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে এসব আলোচনা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ ও কার্যকর পদ্ধতি বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করছে।
এই সেমিনারে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশের পাশাপাশি ব্রাজিল, চীন, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, জর্ডান, মরক্কো, মিয়ানমার, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, কাতার, কুয়েত, রাশিয়া, সুদান, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও জিম্বাবুয়ের বিমান বাহিনীর প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
এ ছাড়া প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়া, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা এ সেমিনারে যোগ দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ)-এর প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণও এবারের আয়োজনের উল্লেখযোগ্য দিক।

বিভিন্ন দেশের সামরিক ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ এ সেমিনারকে অভিজ্ঞতা বিনিময়, নিরাপত্তা চর্চার তুলনামূলক পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরছে।
সামরিক-বেসামরিক সমন্বয়ে অংশগ্রহণ
সেমিনারে দেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, প্রশাসনিক, গবেষণা ও বিমান পরিবহনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও অংশ নিচ্ছেন। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড এবং বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী।
এ ছাড়া বিভিন্ন এয়ারলাইনস, ফ্লাইং একাডেমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নিচ্ছেন। অন্যান্য অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ জরিপ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো) এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এ অংশগ্রহণ বিমান চলাচলের নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহুমাত্রিক বিষয়গুলোকে একই আলোচনার পরিসরে নিয়ে এসেছে। বিমান পরিচালনা, আবহাওয়া, জরুরি সাড়া প্রদান, সীমান্ত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, গবেষণা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের মতো ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সহযোগিতা জোরদার করা নিরাপত্তাব্যবস্থার সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নয়ন
সেমিনারের বিভিন্ন অধিবেশনে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সেফটি চর্চা, উদীয়মান ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও মতবিনিময় চলছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা তাঁদের প্রবন্ধ ও আলোচনায় প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, মানবিক উপাদান, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত দলগত কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরছেন। বিশেষ করে ভবিষ্যৎ ফ্লাইট সেফটি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী করতে প্রযুক্তির সঙ্গে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, হিউম্যান ফ্যাক্টর এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার সমন্বয় অপরিহার্য। একই সঙ্গে ঝুঁকি শনাক্তকরণ, তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই সেমিনারে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা ও সর্বোত্তম চর্চা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন, সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং বিমান চলাচলের ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলোই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে।
কালের আলো/এমএএএমকে
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]