ফেনীতে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান
বিদ্যুৎমন্ত্রীর বাড়িতে বিদ্যুৎ আছে, সাধারণ মানুষ অন্ধকারে
দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যার বিচার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।
শনিবার (০৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর মহিপাল এলাকায় ১১-দলীয় ঐক্যের লংমার্চের পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, সরকারের কর্মকাণ্ডে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে দেশে নতুন করে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তা প্রতিহত করার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘এ সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করেছে। আমরা ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। এখন যাঁরা নতুন করে ফ্যাসিবাদ শুরু করবেন, তাঁদের ১৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে না।’ তিনি আরও বলেন, কোনো ধরনের চাপ বা ভয়ভীতি তাঁরা মেনে নেবেন না। যেখানে বাধা আসবে, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষোভ
দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সমালোচনা করে জামায়াতের আমির বলেন, সাধারণ মানুষ বিদ্যুৎ সংকটে ভুগলেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎমন্ত্রীর বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকে। সংসদে বিদ্যুৎ থাকে, কিন্তু সাধারণ মানুষের বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকে না।’ একই সঙ্গে গত ছয় মাসে শাপলা চত্বর ও পিলখানার হত্যাকাণ্ডসহ বড় হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ জানান তিনি। তাঁর দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলো এখন বন্ধ হয়ে গেছে।
‘এ দেশই আমাদের ঠিকানা’
দেশের ভবিষ্যৎ তরুণদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রত্যয়ের কথাও তুলে ধরেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, তাঁদের অন্য কোনো দেশের আশ্রয় বা বিকল্প ঠিকানা নেই। বাংলাদেশেই তাঁদের জন্ম এবং এই দেশই তাঁদের একমাত্র ঠিকানা।
সরকারের বিরুদ্ধে নাহিদ ইসলামের অভিযোগ
পথসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বর্তমান সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, র্যাব বিলুপ্ত না করে নতুন নামে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিএনপির বিরুদ্ধে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের অভিযোগ তোলেন তিনি। ১১-দলীয় ঐক্যের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন করা হলে তার পাল্টা জবাব দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি জানান, লংমার্চ শেষে ঢাকায় জনসভা করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, বর্তমান সরকারের গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনীহা রয়েছে। প্রয়োজনে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে সেই রায় বাস্তবায়নে বাধ্য করার কথা বলেন তিনি। অলি আহমদের অভিযোগ, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলেও বর্তমান সরকার তাঁর সরকারের আদলেই দেশ পরিচালনা করছে। অন্যদিকে, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানান। তাঁর অভিযোগ, গণভোটে বিপুলসংখ্যক মানুষ সংস্কারের পক্ষে মত দিলেও সরকার তা বাস্তবায়ন করছে না।
বিএনপির বিরুদ্ধেও ক্ষোভ
পথসভায় বক্তব্য দেওয়া একাধিক নেতা বিএনপির বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ তোলেন। এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, দেশের মানুষ ভালো নেই। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের পাশাপাশি বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগও করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিএনপির ওপর তাঁদের আর আস্থা নেই। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কোনো একক রাজনৈতিক নেতার নয়; এটি শহীদদের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ হবে। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সরকারের উদ্দেশে বলেন, জনগণের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পথ বেছে নিতে হবে। দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেনও সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের পকেট কাটার অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে গণভোটের রায় নিয়ে কোনো ধরনের টালবাহানা গ্রহণ করা হবে না বলে জানান তিনি।
ছয় দফা দাবিতে লংমার্চ
শনিবার (০৫ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে ১১-দলীয় ঐক্যের লংমার্চ শুরু হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে লংমার্চটি চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
পথে কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, চৌদ্দগ্রাম ও ফেনীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পথসভার আয়োজন করা হয়। জোটের ঘোষিত ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—অবিলম্বে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন; জুলাই গণহত্যার বিচার; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও অপরাধ দমন; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ; প্রশাসনের সর্বস্তরে দলীয়করণ বন্ধ করা।
লংমার্চে মহাসড়কে যানজট
লংমার্চ ও পথসভাকে কেন্দ্র করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী লেনে যান চলাচলে পরিবর্তন আনা হয়। ওই লেনের গাড়িগুলো ঢাকামুখী লেন দিয়ে চলাচল করায় মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ফেনীর মহিপালের পথসভায় ১১-দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন শরিক দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array