গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি ভাড়া ভবনে চলছে ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি বাংলাদেশের (ইউএফটিবি) শিক্ষা কার্যক্রম। প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে আরেকটি ভবনে চলছে ক্লাস, মাঝামাঝি তৃতীয় ভবনে প্রশাসনিক কাজ। প্রযুক্তি খাতের বিশেষায়িত এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম ছড়িয়ে আছে ছোট তিনটি ভাড়া ভবনে। ইউএফটিবির এই চিত্র আসলে দেশের উচ্চশিক্ষার বড় একটি সমস্যার প্রতিচ্ছবি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই। পাঁচটিতে এখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি; অন্যগুলোতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকলেও পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস নেই। প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত না করেই কেন একের পর এক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হলো?
ক্যাম্পাসের আগে ক্লাস
এই ২৫ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪টির অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অনুমোদন পায় ২০২৫ সালে। তালিকায় রয়েছে ছয়টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, তিনটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চারটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি বিশেষায়িত ও সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়। অধিকাংশের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের মধ্যে। অর্থাৎ কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্থায়ী ক্যাম্পাসে থাকার সময় এক দশক পর্যন্ত গড়িয়েছে। কোথাও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন ব্যবহার করা হচ্ছে, কোথাও ভাড়া বাড়ি, আবার কোথাও একাধিক স্থাপনায় ভাগ হয়ে আছে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য জমি নির্ধারণ হলেও নির্মাণ শেষ হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণও শুরু হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়-পরিবেশ নেই
শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকা ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী আট হাজারের কিছু বেশি। অধিকাংশ চলছে মাত্র দুই থেকে সাতটি বিভাগ নিয়ে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে অবশ্য সরাসরি স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী নেই। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি এবং কয়েকটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অন্য প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। কিন্তু যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি শিক্ষার্থী পড়ছে, তাদের জন্য সংকটটি স্পষ্ট। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়—গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ, খেলার মাঠ, আবাসন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর একাডেমিক মিথস্ক্রিয়ার পরিবেশ। বিশেষ করে প্রযুক্তি, কৃষি ও এভিয়েশন শিক্ষার মতো ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ল্যাব ও ব্যবহারিক অবকাঠামো ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
পাঁচটির এখনো যাত্রাই হয়নি
মেহেরপুর, বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া চলছে। নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দুটি বিভাগ খোলার অনুমোদন পায় এবং ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি সম্পন্ন করেছে। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির কার্যক্রমও অস্থায়ী ব্যবস্থায় শুরু হয়েছে। অর্থাৎ স্থায়ী ক্যাম্পাস প্রস্তুত না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক যাত্রা থেমে থাকছে না। এতে দ্রুত উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি হলেও ভবিষ্যৎ অবকাঠামোর প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে।
ভাড়ার পেছনে সরকারি অর্থ
অস্থায়ী ক্যাম্পাসের আর্থিক চাপও কম নয়। খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে ভ্যাট ও কর বাদে প্রায় ৮ লাখ ২১ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। বছরের পর বছর ভাড়া দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে একাধিক ভবন পরিচালনা, যাতায়াত, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বাড়তি ব্যয়। সাময়িক সমাধান তাই দীর্ঘমেয়াদে সরকারি অর্থের স্থায়ী ব্যয়ে পরিণত হচ্ছে।
কোথাও জমি আছে, ক্যাম্পাস নেই
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এর একটি উদাহরণ। ২০২০ সালে আইন পাসের পর ২০২২ সালে উপাচার্য নিয়োগ এবং ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু স্থায়ী ক্যাম্পাসের জায়গায় এখনো পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। শিক্ষার্থীদের ক্লাস চলছে ভাড়া করা ভবনে। অন্যদিকে, নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ এগোলেও প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং কয়েকটি বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম এখনো অস্থায়ী ক্যাম্পাসনির্ভর। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী প্রায় এক হাজার। ইউএফটিবিতেও শিক্ষার্থী ৯২৮ জন, শিক্ষক ৪১ জন, কর্মকর্তা ৩৬ এবং কর্মচারী ৫২ জন। ইতিমধ্যে দুটি ব্যাচ পড়াশোনা শেষ করে বেরিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য ৫০ একর জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং স্থায়ী অবকাঠামোর জন্য ৮০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্প প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন।
দায়ের জায়গা, সমাধানের পথ
এই বাস্তবতা কোনো এক বছরের সিদ্ধান্তের ফল নয়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর আইন, উপাচার্য, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ এবং শিক্ষার্থী ভর্তি—সবই এগিয়েছে; কিন্তু ক্যাম্পাস নির্মাণ পিছিয়ে থেকেছে। ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেছেন, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার অনেক আগেই হয়েছে এবং প্রায় সবগুলোরই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। এখন দ্রুত এগুলোকে নিয়মকানুনের মধ্যে আনা এবং ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে জমি, অর্থায়ন, মাস্টারপ্ল্যান ও অবকাঠামোর বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর জন্যও ন্যূনতম একাডেমিক ও গবেষণা অবকাঠামোর বাধ্যতামূলক মানদণ্ড থাকা উচিত। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা মানে শুধু একটি আইন পাস কিংবা উপাচার্য নিয়োগ নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার শিক্ষার্থীদের জন্য থাকে নিজস্ব শিক্ষাঙ্গন, গবেষণার পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ গড়ার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array