খুঁজুন
                               
, ,
           

মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে ব্যর্থতা

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ৪:৫৭ অপরাহ্ণ
মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে ব্যর্থতা

কোনোভাবে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে পারছে না বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ বেশিরভাগ দেশ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে এক অঙ্কের ঘরে রাখতে পারলেও ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। উল্টো বছরের পর বছর যেভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে সেভাবে বাড়ছে না দেশের মানুষের আয়। ফলে আয়ের সঙ্গে ব্যয় না মেলাতে পেরে বিপাকে জনসাধারণ।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) নতুন পূর্বাভাস উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে। সংস্থাটি বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গড় মূল্যস্ফীতি থাকবে বাংলাদেশে। এসময় বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হবে বলে জুলাইয়ের এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই হার দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের চেয়ে বেশি। একইসঙ্গে এডিবি সতর্ক করেছে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, জ্বালানির দাম, বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা ও দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা মূল্যস্ফীতি কমানোর পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে নিম্নমুখী ঝুঁকি এখনও ভালোভাবেই রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষে জুন মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির চাপে আসলে আয় কমেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মঈনুল ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিভিন্ন অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা- এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা সহজ নয়। ব্যাংকে সুদের হার বাড়ালে মূল্যস্ফীতি কমতে পারে, কিন্তু এতে বিনিয়োগ ও শিল্পোৎপাদন কমে যেতে পারে। আবার ডলার সরবরাহ বাড়ালে বাজার স্থিতিশীল হয়, কিন্তু রিজার্ভ কমে যায়। তাই প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে সুচিন্তিতভাবে।

মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একাধিক নীতিগত উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে হস্তক্ষেপ করে ডলারের অতিরিক্ত ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, বরং স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য কার্যকর।

দ্বিতীয়ত আমদানি ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। এতে অপ্রয়োজনীয় বা বিলাসপণ্য আমদানিকরণে নিরুৎসাহিত হলে ডলারের ওপর চাপ কমানো সম্ভব। তৃতীয়ত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর করা। এর মধ্যে রয়েছে সুদের হার বাড়ানো এবং বাজারে অর্থ সরবরাহ কমিয়ে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করা হয়। চতুর্থত ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত খাতে ঋণ সুবিধা দেওয়া।

কালের আলো/এম/এএইচ

অনিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রুল জারি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৮:১০ অপরাহ্ণ
অনিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রুল জারি

সারাদেশে অনিবন্ধিত অবস্থায় থাকা ৩৩ হাজার ৬১৪টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

রোববার (৩০ আগস্ট)এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি আহমেদ সোহেল এবং বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব, গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালকসহ (ডিজি) সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আদালতে রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. কাওসার হোসাইন।

পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৩৪ হাজার ৬১২টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে নিবন্ধন রয়েছে মাত্র ৯৯৮টির। অর্থাৎ বাকি ৩৩ হাজার ৬১৪টি বিদ্যালয়ই অনিবন্ধিত।’

কাওসার হোসাইন আরও বলেন, ‘দ্য রেজিস্ট্রেশন অব প্রাইভেট স্কুল অর্ডিন্যান্স-১৯৬২ অনুযায়ী, অনিবন্ধিত অবস্থায় কোনো বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনার সুযোগ নেই। এই আইনের ৩ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে যে, নিবন্ধন ছাড়া স্কুল পরিচালনা করলে তা বন্ধ করে দেওয়া এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।’

আইনজীবী জানান, এই বিশাল সংখ্যক বিদ্যালয় অনিবন্ধিত থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় জনস্বার্থে এই রিট আবেদনটি করা হয়।

আদালত শুনানি শেষে বিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

ঋণের নামে সাড়ে ৫ হাজার কোটি উধাও, ভাঙছে সাদ-মুসা গ্রুপের অর্থজাল

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫৯ অপরাহ্ণ
ঋণের নামে সাড়ে ৫ হাজার কোটি উধাও, ভাঙছে সাদ-মুসা গ্রুপের অর্থজাল

চট্টগ্রামের বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী সাদ-মুসা গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যাংকঋণের নামে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তদন্তে নেমে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এখন পর্যন্ত সংস্থাটির অনুসন্ধানে দেশের ১২টি ব্যাংক থেকে ৫ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া ও অর্থ সরিয়ে নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। অনুসন্ধান শেষ না হওয়ায় এই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।

তবে ঘটনাটিকে শুধু একটি শিল্পগোষ্ঠীর ঋণখেলাপির ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। দুদকের অনুসন্ধান ও ইতোমধ্যে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর অভিযোগে যে পদ্ধতির কথা উঠে এসেছে, তাতে প্রশ্ন উঠছে ব্যাংকঋণ অনুমোদন ও তদারকির কাঠামো নিয়েও। এক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়ার পর তা অন্য প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে দেওয়া, পুরনো ঋণ সমন্বয়, কাগুজে বিল-এলসির মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন এবং একই গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অর্থ ঘোরানোর অভিযোগ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি জটিল ঋণচক্রের চিত্র।

শুরু ১২০ কোটি থেকে, ঋণ ছাড়াল দুই হাজার কোটি
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে ন্যাশনাল ব্যাংকের সঙ্গে সাদ-মুসা গ্রুপের ব্যবসায়িক সম্পর্ক শুরু হয় ১২০ কোটি টাকার কম্পোজিট ঋণসীমার মাধ্যমে। কয়েক দফা বাড়িয়ে এই সীমা দাঁড়ায় ৯৫৯ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে সাদ-মুসা হোমটেক্স অ্যান্ড ক্লথিং লিমিটেডের নামে অনুমোদন করা হয় ৪১৫ কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণ। অভিযোগ রয়েছে, ঋণের একটি অংশ প্রকৃত ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার না করে অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। রেডিয়াম কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামও অনুসন্ধানে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে খোলা হিসাব ভুয়া বিল লেনদেনে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। দুদকের হিসাবে, সাদ-মুসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নামে-বেনামে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে অনুমোদিত ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাওনা ছিল ১ হাজার ১৮০ কোটি টাকার বেশি।

চারটি ঘটনায় উঠে আসছে একই কৌশল
সাদ-মুসা গ্রুপের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত যেসব মামলার তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, সেগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি অভিন্ন পদ্ধতির অভিযোগ দেখা যায়। ন্যাশনাল ব্যাংকের ৪৫৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় অভিযোগ—ঋণের অর্থ অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়েছে এবং ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মোহাম্মদ মোহসিনসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা করা হয়। আসামিদের মধ্যে ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও কর্মকর্তারাও রয়েছেন। প্রাইম ব্যাংকের চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখার ৪৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকার ঘটনায়ও অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাইয়ের ঘাটতি। ১০০ কোটি টাকার প্রকল্প ঋণের মধ্যে ৪৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালের মার্চে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। পূবালী ব্যাংকের প্রায় ৯৫ কোটি টাকার ঘটনায় আবার সামনে এসেছে কাগুজে বিল ও লোকাল এলসির ব্যবহার। এমএ রহমান ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজের নামে ঋণ নিয়ে ২৫টি লোকাল এলসির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মোহাম্মদ মোহসিন, তার স্ত্রী এবং ব্যাংকের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান আলাদা হলেও অভিযোগের কাঠামোতে মিল—ঋণ নেওয়া, অর্থের গতিপথ বদলানো এবং কাগুজে লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ সরিয়ে নেওয়া।

করোনার প্রণোদনার ৪০৪ কোটি নিয়েও অভিযোগ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অধ্যায় করোনাকালীন প্রণোদনা ঋণ। ব্যবসা টিকিয়ে রাখা ও কর্মসংস্থান ধরে রাখতে সরকার যে বিশেষ প্যাকেজ দিয়েছিল, সাদ-মুসা গ্রুপ সেই অর্থেরও অপব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ দুদকের। ২০২৫ সালের মে মাসে ৪০৪ কোটি টাকা উত্তোলন, আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে মোহাম্মদ মোহসিনসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এজাহার অনুযায়ী, ভুয়া কাগজপত্র ও অনুমোদনবিহীন প্রক্রিয়ায় ঋণ নেওয়া হয়। ব্যাংকের কর্মকর্তারা প্রকৃত আর্থিক প্রয়োজন যাচাই না করেই ঋণ অনুমোদন করেন বলে অভিযোগ। পরে অর্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর, ফ্লোর কেনা, পুরনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এখানেই প্রশ্নটি আরও বড়—যে অর্থ সংকটে থাকা প্রকৃত ব্যবসা ও শ্রমিকের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখার জন্য দেওয়া হয়েছিল, সেটি যদি পুরনো দায় মেটানো বা অন্য কাজে চলে যায়, তাহলে প্রণোদনা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়িত হলো?

ব্যাংকের ভেতরের ভূমিকা কতটা?
এই কেলেঙ্কারির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—অভিযোগ শুধু ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে নয়। বিভিন্ন মামলায় ব্যাংকের পরিচালক ও কর্মকর্তাদেরও আসামি করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের সময় গ্রাহকের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার নগদ প্রবাহ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও পারস্পরিক লেনদেন কতটা যাচাই করা হয়েছিল? একই গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্থ স্থানান্তর হয়ে থাকলে ব্যাংকের নজরদারি ব্যবস্থায় তা শনাক্ত হওয়ার কথা। অথচ অভিযোগ অনুযায়ী, একই ধরনের লেনদেন বিভিন্ন পর্যায়ে চলেছে। এতে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি কাঠামো নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

জামানত কতটা নিরাপদ?
বিএফআইইউর অনুসন্ধানেও সাদ-মুসা গ্রুপের ঋণের বিপরীতে থাকা সম্পদ, কারখানা ও শিল্পপার্কের জমি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সাদ-মুসা শিল্পপার্কে প্রায় ২০০ বিঘা জমির কথা উঠে এলেও বিপুল ঋণের তুলনায় এসব সম্পদের জামানত মূল্য যথেষ্ট কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, ঋণ খেলাপি হলে কাগজে থাকা সম্পদ আর বাস্তবে দ্রুত উদ্ধারযোগ্য অর্থ—দুটি এক বিষয় নয়। সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য, মালিকানা, দায় এবং আইনি জটিলতা ঋণ আদায়ের সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সাদ-মুসা গ্রুপের বাইরেও যে প্রশ্ন
দুদকের অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি। ফলে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার এই অঙ্কই চূড়ান্ত নয়। আরও প্রতিষ্ঠান, আরও ঋণ এবং অর্থের আরও গতিপথ সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এরই মধ্যে যে চিত্রটি স্পষ্ট, তা হলো—এটি শুধু একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নয়; একই সঙ্গে এটি ব্যাংকিং খাতে ঋণ অনুমোদন, গ্রাহক যাচাই, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের জবাবদিহির বড় পরীক্ষাও। তদন্তে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে সাদ-মুসা গ্রুপের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ঋণ অনুমোদন ব্যবস্থার দুর্বলতাও নতুন করে সামনে আসবে। আর অর্থ উদ্ধার না হলে প্রশ্নটি আরও কঠিন হবে—সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার দায় শেষ পর্যন্ত বহন করবে কে? শেষ পর্যন্ত তাই সাদ-মুসা গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির আসল গল্প শুধু ‘কত টাকা নেওয়া হয়েছে’ তা নয়; বরং কীভাবে এত টাকা নেওয়া সম্ভব হলো, কোথায় গেল সেই অর্থ এবং এতদিন তা ঠেকানো গেল না কেন—উত্তর খুঁজতে হবে এই তিন প্রশ্নের মধ্যেই।

কালের আলো/এম/এএইচ

বিইউপির পশ্চিম ক্যাম্পাসে নতুন দিগন্ত, নৈতিক মূল্যবোধে গুরুত্ব সেনাপ্রধানের

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫৪ অপরাহ্ণ
বিইউপির পশ্চিম ক্যাম্পাসে নতুন দিগন্ত, নৈতিক মূল্যবোধে গুরুত্ব সেনাপ্রধানের

উচ্চশিক্ষার পরিসর আরও বিস্তৃত করতে এবং আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ তৈরিতে নতুন অবকাঠামো যুক্ত হলো বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)–এর পশ্চিম ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয়টির পশ্চিম ক্যাম্পাসে নবনির্মিত ইউটিলিটি বিল্ডিং, ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এফএসটি) টাওয়ার এবং ফ্যাকাল্টি অব আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস (এফএএসএস) টাওয়ার উদ্বোধন করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।

রোববার (৩০ আগস্ট) মিরপুর সেনানিবাসে আয়োজিত এ উদ্বোধনকে শুধু নতুন তিনটি ভবন চালুর আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিইউপির একাডেমিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আরও আধুনিক ও সমন্বিত শিক্ষা পরিবেশ তৈরির ধারাবাহিকতায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

একাডেমিক সম্প্রসারণে নতুন অবকাঠামো
বিইউপির পশ্চিম ক্যাম্পাসে নতুন তিন ভবনের সংযোজন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের পথও সুগম করবে। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানের জন্য পৃথক টাওয়ার প্রতিষ্ঠা সংশ্লিষ্ট অনুষদগুলোর শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমকে আরও সংগঠিত করার সুযোগ তৈরি করবে। আধুনিক অবকাঠামোর সঙ্গে একাডেমিক কার্যক্রমের সমন্বয় ঘটাতে পারলে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

উদ্বোধনের পর ক্যাম্পাস পরিদর্শন
নবনির্মিত ভবনগুলোর উদ্বোধন শেষে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ক্যাম্পাসে একটি গাছের চারা রোপণ করেন। পরে তিনি বিইউপির পশ্চিম ক্যাম্পাস ও শিক্ষার্থীদের আবাসিক এলাকা ঘুরে দেখেন। ক্যাম্পাস পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আবাসন ও সামগ্রিক ক্যাম্পাস পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে একাডেমিক অবকাঠামোর সঙ্গে আবাসিক সুবিধার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি মূল্যবোধ
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান উচ্চশিক্ষার সাফল্যের একটি মৌলিক দিক সামনে আনেন। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য শুধু একাডেমিক উৎকর্ষে সীমাবদ্ধ নয়; নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সততা ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন মানবসম্পদ গড়ে তোলাই এর বড় অর্জন। তাঁর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয়ের বিষয়টিও। প্রযুক্তি ও জ্ঞাননির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার পাশাপাশি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবেও গড়ে ওঠার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি আধুনিক শিক্ষা পরিবেশ তৈরি, গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং দেশপ্রেমিক প্রজন্ম গঠনে বিইউপির ভূমিকার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরোত্তর সাফল্য ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

বই প্রকাশ ও ১৪ দলকে সম্মাননা
অনুষ্ঠানে বিইউপি উপাচার্য মেজর জেনারেল মো. মাহবুব-উল আলমের লেখা ‘এডুকেশন মাইন্ডস; এওকেনিং কনসাইন্স’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন সেনাপ্রধান। এরপর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনকারী বিইউপির ১৪টি শিক্ষার্থী দলকে পুরস্কৃত করা হয়। শিক্ষার্থীদের এসব অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সহশিক্ষা, প্রতিযোগিতা ও নেতৃত্ব বিকাশে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের চিত্রও তুলে ধরে।

‘শুধু ভবন নয়, মানুষ তৈরি করতে হবে’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল পর্ব অনুষ্ঠিত হয় বিইউপির স্বাধীনতা মিলনায়তনে। স্বাগত বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মেজর জেনারেল মো. মাহবুব-উল আলম শিক্ষা ও গবেষণায় বিইউপির অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো, গবেষণার পরিধি সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিইউপি কাজ করে যাচ্ছে। আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

অবকাঠামো থেকে সক্ষমতায় রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন ভবন নির্মাণ নিঃসন্দেহে সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে এসব অবকাঠামো কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। শুধু আধুনিক শ্রেণিকক্ষ বা গবেষণাগার থাকলেই বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষক, পর্যাপ্ত গবেষণা বরাদ্দ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উদ্ভাবনবান্ধব পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তবমুখী গবেষণার সুযোগ। নতুন অবকাঠামোর সঙ্গে এসব বিষয় সমান্তরালে এগিয়ে নিতে পারলে বিইউপির একাডেমিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ভবিষ্যতের বিইউপির ভিত্তি
বিইউপির পশ্চিম ক্যাম্পাসে নতুন তিন ভবনের উদ্বোধন তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের পাশাপাশি একটি বৃহত্তর একাডেমিক লক্ষ্যকেও সামনে আনে। শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ—এই পাঁচটি ক্ষেত্রের সমন্বিত বিকাশই ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।

অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীর কোয়ার্টারমাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ শাহীনুল হক, ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান, বিইউপি সিনেটের সদস্য, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, বিইউপির সাবেক উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। নতুন ভবনগুলো এখন বিইউপির জন্য শুধু অবকাঠামো নয়—এসব স্থাপনা কতটা কার্যকরভাবে জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা ও মূল্যবোধসম্পন্ন নেতৃত্ব তৈরির কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, সেটিই হবে পরবর্তী সময়ের বড় পরীক্ষা, এমনটিই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

কালের আলো/এমএএএমকে