খুঁজুন
                               
, ,
           

ঋণের নামে সাড়ে ৫ হাজার কোটি উধাও, ভাঙছে সাদ-মুসা গ্রুপের অর্থজাল

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫৯ অপরাহ্ণ
ঋণের নামে সাড়ে ৫ হাজার কোটি উধাও, ভাঙছে সাদ-মুসা গ্রুপের অর্থজাল

চট্টগ্রামের বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী সাদ-মুসা গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যাংকঋণের নামে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তদন্তে নেমে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এখন পর্যন্ত সংস্থাটির অনুসন্ধানে দেশের ১২টি ব্যাংক থেকে ৫ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া ও অর্থ সরিয়ে নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। অনুসন্ধান শেষ না হওয়ায় এই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।

তবে ঘটনাটিকে শুধু একটি শিল্পগোষ্ঠীর ঋণখেলাপির ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। দুদকের অনুসন্ধান ও ইতোমধ্যে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর অভিযোগে যে পদ্ধতির কথা উঠে এসেছে, তাতে প্রশ্ন উঠছে ব্যাংকঋণ অনুমোদন ও তদারকির কাঠামো নিয়েও। এক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়ার পর তা অন্য প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে দেওয়া, পুরনো ঋণ সমন্বয়, কাগুজে বিল-এলসির মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন এবং একই গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অর্থ ঘোরানোর অভিযোগ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি জটিল ঋণচক্রের চিত্র।

শুরু ১২০ কোটি থেকে, ঋণ ছাড়াল দুই হাজার কোটি
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে ন্যাশনাল ব্যাংকের সঙ্গে সাদ-মুসা গ্রুপের ব্যবসায়িক সম্পর্ক শুরু হয় ১২০ কোটি টাকার কম্পোজিট ঋণসীমার মাধ্যমে। কয়েক দফা বাড়িয়ে এই সীমা দাঁড়ায় ৯৫৯ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে সাদ-মুসা হোমটেক্স অ্যান্ড ক্লথিং লিমিটেডের নামে অনুমোদন করা হয় ৪১৫ কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণ। অভিযোগ রয়েছে, ঋণের একটি অংশ প্রকৃত ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার না করে অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। রেডিয়াম কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামও অনুসন্ধানে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে খোলা হিসাব ভুয়া বিল লেনদেনে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। দুদকের হিসাবে, সাদ-মুসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নামে-বেনামে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে অনুমোদিত ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাওনা ছিল ১ হাজার ১৮০ কোটি টাকার বেশি।

চারটি ঘটনায় উঠে আসছে একই কৌশল
সাদ-মুসা গ্রুপের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত যেসব মামলার তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, সেগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি অভিন্ন পদ্ধতির অভিযোগ দেখা যায়। ন্যাশনাল ব্যাংকের ৪৫৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় অভিযোগ—ঋণের অর্থ অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়েছে এবং ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মোহাম্মদ মোহসিনসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা করা হয়। আসামিদের মধ্যে ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও কর্মকর্তারাও রয়েছেন। প্রাইম ব্যাংকের চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখার ৪৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকার ঘটনায়ও অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাইয়ের ঘাটতি। ১০০ কোটি টাকার প্রকল্প ঋণের মধ্যে ৪৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালের মার্চে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। পূবালী ব্যাংকের প্রায় ৯৫ কোটি টাকার ঘটনায় আবার সামনে এসেছে কাগুজে বিল ও লোকাল এলসির ব্যবহার। এমএ রহমান ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজের নামে ঋণ নিয়ে ২৫টি লোকাল এলসির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মোহাম্মদ মোহসিন, তার স্ত্রী এবং ব্যাংকের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান আলাদা হলেও অভিযোগের কাঠামোতে মিল—ঋণ নেওয়া, অর্থের গতিপথ বদলানো এবং কাগুজে লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ সরিয়ে নেওয়া।

করোনার প্রণোদনার ৪০৪ কোটি নিয়েও অভিযোগ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অধ্যায় করোনাকালীন প্রণোদনা ঋণ। ব্যবসা টিকিয়ে রাখা ও কর্মসংস্থান ধরে রাখতে সরকার যে বিশেষ প্যাকেজ দিয়েছিল, সাদ-মুসা গ্রুপ সেই অর্থেরও অপব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ দুদকের। ২০২৫ সালের মে মাসে ৪০৪ কোটি টাকা উত্তোলন, আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে মোহাম্মদ মোহসিনসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এজাহার অনুযায়ী, ভুয়া কাগজপত্র ও অনুমোদনবিহীন প্রক্রিয়ায় ঋণ নেওয়া হয়। ব্যাংকের কর্মকর্তারা প্রকৃত আর্থিক প্রয়োজন যাচাই না করেই ঋণ অনুমোদন করেন বলে অভিযোগ। পরে অর্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর, ফ্লোর কেনা, পুরনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এখানেই প্রশ্নটি আরও বড়—যে অর্থ সংকটে থাকা প্রকৃত ব্যবসা ও শ্রমিকের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখার জন্য দেওয়া হয়েছিল, সেটি যদি পুরনো দায় মেটানো বা অন্য কাজে চলে যায়, তাহলে প্রণোদনা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়িত হলো?

ব্যাংকের ভেতরের ভূমিকা কতটা?
এই কেলেঙ্কারির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—অভিযোগ শুধু ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে নয়। বিভিন্ন মামলায় ব্যাংকের পরিচালক ও কর্মকর্তাদেরও আসামি করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের সময় গ্রাহকের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার নগদ প্রবাহ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও পারস্পরিক লেনদেন কতটা যাচাই করা হয়েছিল? একই গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্থ স্থানান্তর হয়ে থাকলে ব্যাংকের নজরদারি ব্যবস্থায় তা শনাক্ত হওয়ার কথা। অথচ অভিযোগ অনুযায়ী, একই ধরনের লেনদেন বিভিন্ন পর্যায়ে চলেছে। এতে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি কাঠামো নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

জামানত কতটা নিরাপদ?
বিএফআইইউর অনুসন্ধানেও সাদ-মুসা গ্রুপের ঋণের বিপরীতে থাকা সম্পদ, কারখানা ও শিল্পপার্কের জমি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সাদ-মুসা শিল্পপার্কে প্রায় ২০০ বিঘা জমির কথা উঠে এলেও বিপুল ঋণের তুলনায় এসব সম্পদের জামানত মূল্য যথেষ্ট কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, ঋণ খেলাপি হলে কাগজে থাকা সম্পদ আর বাস্তবে দ্রুত উদ্ধারযোগ্য অর্থ—দুটি এক বিষয় নয়। সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য, মালিকানা, দায় এবং আইনি জটিলতা ঋণ আদায়ের সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সাদ-মুসা গ্রুপের বাইরেও যে প্রশ্ন
দুদকের অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি। ফলে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার এই অঙ্কই চূড়ান্ত নয়। আরও প্রতিষ্ঠান, আরও ঋণ এবং অর্থের আরও গতিপথ সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এরই মধ্যে যে চিত্রটি স্পষ্ট, তা হলো—এটি শুধু একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নয়; একই সঙ্গে এটি ব্যাংকিং খাতে ঋণ অনুমোদন, গ্রাহক যাচাই, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের জবাবদিহির বড় পরীক্ষাও। তদন্তে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে সাদ-মুসা গ্রুপের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ঋণ অনুমোদন ব্যবস্থার দুর্বলতাও নতুন করে সামনে আসবে। আর অর্থ উদ্ধার না হলে প্রশ্নটি আরও কঠিন হবে—সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার দায় শেষ পর্যন্ত বহন করবে কে? শেষ পর্যন্ত তাই সাদ-মুসা গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির আসল গল্প শুধু ‘কত টাকা নেওয়া হয়েছে’ তা নয়; বরং কীভাবে এত টাকা নেওয়া সম্ভব হলো, কোথায় গেল সেই অর্থ এবং এতদিন তা ঠেকানো গেল না কেন—উত্তর খুঁজতে হবে এই তিন প্রশ্নের মধ্যেই।

কালের আলো/এম/এএইচ

অবরোধের জেরে সাজেক বন্ধ, পর্যটকদের জন্য সময় বেঁধে দিল প্রশাসন

রাঙামাটি সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০৩ পূর্বাহ্ণ
অবরোধের জেরে সাজেক বন্ধ, পর্যটকদের জন্য সময় বেঁধে দিল প্রশাসন

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেল ৪টার মধ্যে এলাকা ছেড়ে নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বুধবার সন্ধ্যায় রাঙামাটির  জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ সাজেক
জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। বর্তমানে পর্যটন এলাকায় অবস্থানরত সবাইকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাজেক ত্যাগ করে নিরাপদে গন্তব্যে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের এই নির্দেশের ফলে সাজেকে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা পর্যটকদের আপাতত সেখানে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পর্যটনকেন্দ্রটি পুনরায় চালুর বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকতে হবে।

সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা
এদিকে বুধবার বিকেলে সাজেক সড়কে আবারও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি। সংগঠন দুটি বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) থেকে এই কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়। সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা এবং সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বুধবারের মধ্যেই পর্যটকদের সাজেক ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।

জরুরি যানবাহন অবরোধের আওতামুক্ত
সংগঠন দুটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে। তবে অবরোধের সময় জরুরি ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ি, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন এবং সংবাদপত্র বহনকারী যান চলাচলের ক্ষেত্রে ছাড় থাকবে। সংবাদ সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত সাংবাদিকদের গাড়িও অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে। সাজেক সড়কে নতুন করে অবরোধের ঘোষণার পরই পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধের সিদ্ধান্ত জানাল প্রশাসন। ফলে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এলাকা ছাড়তে বলা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ থাকবে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

ভোটার তালিকায় মৃত ঘোষণা, অথচ প্রতিবছর ভোট দিচ্ছেন তিনি!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫২ পূর্বাহ্ণ
ভোটার তালিকায় মৃত ঘোষণা, অথচ প্রতিবছর ভোট দিচ্ছেন তিনি!

ভারতের ভোটার তালিকায় মৃত হিসেবে নাম উঠেছে ৫৩ বছর বয়সী কামতা প্রসাদের। অথচ তিনি বেঁচে আছেন, নিয়মিত কাজ করছেন এবং বছরের পর বছর ভোটও দিয়েছেন। জীবিত থাকা সত্ত্বেও সরকারি নথিতে মৃত হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় এবার নিজের অস্তিত্ব ও ভোটাধিকার প্রমাণ করতে সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে দিল্লির এই দর্জিকে।

ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রম ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের মধ্যে কামতা প্রসাদের ঘটনাটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ভোটার তালিকা হালনাগাদের প্রক্রিয়া নিয়ে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তার এই ভোগান্তির কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে দিল্লিতেই বাদ পড়েছেন প্রায় ৪২ লাখ ভোটার।

নাম ও পরিচয়ে ভুল, তালিকায় মৃত কামতা
কামতা প্রসাদের নাম ভোটার তালিকায় ‘কান্তা প্রসাদ’ হিসেবে লেখা হয়েছে। নতুন তালিকায় তাকে মৃত দেখানো হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের ভোটার হওয়া সত্ত্বেও নিজের পরিচয় সংশোধন এবং ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরে পেতে তাকে প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। একজন জীবিত নাগরিককে সরকারি নথিতে মৃত হিসেবে চিহ্নিত করার ঘটনা ভোটার তালিকা সংশোধনের নির্ভুলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নামের ভুল, তথ্য যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা কিংবা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে কোনো ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লে তাকে নিজের পরিচয় প্রমাণের জন্য দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।

১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়া নিয়ে বিতর্ক
ভারতে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। দিল্লিতেও বাদ পড়েছেন প্রায় ৪২ লাখ ভোটার। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ায় প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিজেপি নির্বাচনে সুবিধা পেতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে নিম্ন আয়ের মানুষ
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বিশেষভাবে সামনে এসেছে। প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাব, ঠিকানা যাচাই এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেকের পক্ষে নিজেদের ভোটার পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কার পাশাপাশি সরকারি রেশন ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক সুবিধা পাওয়া নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের সামর্থ্য সীমিত, তাদের জন্য সরকারি দপ্তরে বারবার যাতায়াত করা বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

নাম ফেরানোর সুযোগ থাকলেও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভোগান্তি
বিতর্কের মধ্যে বাদ পড়া ভোটারদের তথ্য পুনরায় যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। যাদের নাম তালিকা থেকে বাদ গেছে, তারা আবেদন করে নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে আবেদন, নথিপত্র সংগ্রহ এবং পরিচয় যাচাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনেকের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কামতা প্রসাদের ঘটনাও সেই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। জীবিত একজন নাগরিককে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে হচ্ছে, অথচ তার ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত হওয়ার কথা ছিল নির্ভুল সরকারি নথির মাধ্যমেই।

ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন
কামতা প্রসাদের ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির নাম ভুলভাবে নথিভুক্ত হওয়ার বিষয় নয়। এটি ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার সুরক্ষার প্রশ্ন সামনে এনেছে।নির্বাচন পরিচালনার জন্য ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম ভুলবশত বাদ পড়লে তার দায় ও ভোগান্তি শেষ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিককেই বহন করতে হয়। তাই তালিকা সংশোধনের পাশাপাশি বাদ পড়া ভোটারদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কামতা প্রসাদের মতো কেউ যেন জীবিত থেকেও সরকারি নথিতে মৃত হয়ে না থাকেন, তা নিশ্চিত করতে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় নির্ভুলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

লাল সিঁদুরে রাঙা মুখ, বিদায়ের অশ্রু

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:২৭ অপরাহ্ণ
লাল সিঁদুরে রাঙা মুখ, বিদায়ের অশ্রু

ঢাকের বোল, শঙ্খের ধ্বনি আর উলুধ্বনিতে চারপাশ মুখর। কারও মুখ সিঁদুরে রাঙা, কারও চোখে বিদায়ের অশ্রু। আনন্দ আর বিষাদের এমন মায়াবী মেলবন্ধনের মধ্য দিয়েই বিদায় নিলেন দেবী দুর্গা। পাঁচ দিনের পূজা-অর্চনা, উৎসব আর মিলনমেলার পর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব।

দেবীকে শেষবারের মতো প্রণাম জানাতে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভিড় করেন ভক্তরা। দশমীর আনুষ্ঠানিকতা, দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলা ঘিরে মণ্ডপগুলোতে ছিল উৎসবের আমেজ। তবে বিদায়ের মুহূর্ত ঘনিয়ে আসতেই আনন্দের আড়ালে অনুভূত হয় বিচ্ছেদের বেদনা।

  • ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে বুড়িগঙ্গার ঘাট—দেবীবরণ
  • সিঁদুর খেলা ও প্রতিমা বিসর্জনে শেষ শারদীয় দুর্গোৎসব
  • দেবী দুর্গাকে বিদায় জানিয়ে আগামী বছরের অপেক্ষায় ভক্তরা

বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে বিশেষ পূজা ও অঞ্জলি নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা। ভক্তরা ধূপ, দীপ, বেলপাতা ও নানা পূজাসামগ্রী দিয়ে দেবীর চরণে শেষ অর্ঘ্য নিবেদন করেন। প্রার্থনায় উঠে আসে পরিবার-পরিজনের মঙ্গল, সুস্বাস্থ্য, দেশ ও জাতির শান্তি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রত্যাশা।

সিঁদুরে রাঙা উৎসব, চোখে বিদায়ের জল
পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে শাস্ত্রীয় রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন হয় দর্পণ বিসর্জন ও ঘট বিসর্জন। এরপর শুরু হয় দেবীবরণ ও ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলা। বিবাহিত নারীরা দেবী দুর্গার কপাল ও চরণে সিঁদুর ছুঁইয়ে প্রণাম করেন। পান ও মিষ্টি নিবেদনের মধ্য দিয়ে জানান বিদায়ী শ্রদ্ধা।

পরে একে অপরের কপাল ও মুখে সিঁদুর মাখিয়ে আনন্দ ভাগ করে নেন তাঁরা। কারও মুখে হাসি, কারও চোখে জল—লাল সিঁদুরে রাঙা মন্দির প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে আবেগের এক অনন্য দৃশ্যপট। উৎসবের শেষ দিনের এই আচার ঘিরে নারীদের মধ্যে দেখা যায় আন্তরিকতা, শুভকামনা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির প্রকাশ। ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি তাপস কুমার পাল জানান, দশমীর পূজা ও অঞ্জলি শেষে নিয়ম অনুযায়ী দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় পূজার সমাপ্তি হয়। এরপর ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুকুরে ঘট বিসর্জন দেওয়া হয় এবং সবশেষে অনুষ্ঠিত হয় সিঁদুর খেলা।

তিনি বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সপ্তমীতে চক্ষুদানের মধ্য দিয়ে প্রতিমায় দেবীর উপস্থিতি আহ্বান করা হয়। আর দশমীতে দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে। সিঁদুর খেলা বিজয়া দশমীর একটি ঐতিহ্যবাহী আচার, যার সঙ্গে স্বামীর দীর্ঘায়ু ও পরিবারের কল্যাণ কামনার বিশ্বাস জড়িয়ে আছে।

ঢাকের তালে শোভাযাত্রা, গন্তব্য ওয়াইজঘাট
মন্দিরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে শুরু হয় বিজয়া শোভাযাত্রা। ঢাকের বাদ্য আর ভক্তদের জয়ধ্বনিতে মুখর শোভাযাত্রা বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটের দিকে এগিয়ে যায়।

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতৃত্বে শোভাযাত্রায় অংশ নেন অসংখ্য ভক্ত। নদীঘাটে পৌঁছে ধর্মীয় আচার মেনে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। জলে প্রতিমা বিলীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয় এবারের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক আয়োজন। বিসর্জনের সময় অনেক ভক্তকে দেবীর উদ্দেশে প্রণাম জানাতে এবং আগামী বছর আবার ফিরে আসার প্রার্থনা করতে দেখা যায়। তাঁদের বিশ্বাস, দেবী দুর্গা কৈলাসে ফিরে গেলেও তাঁর আশীর্বাদ ও কল্যাণের প্রত্যাশা থেকে যায় মানুষের মনে।

রাজধানীতে ২৫৮ মণ্ডপে দুর্গোৎসব
সনাতন পঞ্জিকা ও উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর রাজধানীতে ২৫৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে ঢাকার নির্ধারিত ১১টি ঘাটে ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। পাঁচ দিনের এই উৎসবকে ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপে পূজা, অঞ্জলি, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে সেই ব্যস্ততা ও আনন্দের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল।

বিদায়ের সুরে আগামী বছরের প্রতীক্ষা
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে, দুর্গাপূজা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। দেবী দুর্গার আগমন মানুষের মনে জাগায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, কল্যাণ ও ন্যায়ের প্রত্যাশা। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মণ্ডপের আলো নিভলেও ভক্তদের মনে রয়ে যায় উৎসবের স্মৃতি। সিঁদুরের রং মুছে যাবে, ঢাকের আওয়াজ থেমে যাবে, কিন্তু দেবীকে ঘিরে প্রার্থনা ও বিশ্বাস থেকে যাবে অটুট। তাই বিজয়া দশমী শুধু বিদায়ের দিন নয়, এটি আবার ফিরে পাওয়ার আশারও দিন। বিষাদমাখা কণ্ঠে ভক্তদের প্রার্থনা—আগামী বছর আবার এসো মা, শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণের বার্তা নিয়ে।

কালের আলো/জেএন/এমকে