মধ্যপ্রাচ্যে হামলার জেরে বিশ্ববাজারে তেল ১১০ ডলার
মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি এবং সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে। বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ ডলার ২১ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে ওঠে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও এক ডলারের বেশি বেড়ে ৯৯ ডলারে পৌঁছায়। বিশ্বের জ্বালানি বাজারে এই দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দামকে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে এগুলোর দামের ওঠানামা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলে।
হরমুজ প্রণালীতে হামলা, বাড়ছে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে এই নৌপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য এ পথ দিয়ে বিভিন্ন দেশে পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। জ্বালানি বাজারবিষয়ক তথ্যপ্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১৮টি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়ায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো নয়, আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোও চাপে পড়তে পারে। কারণ, তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে পরিবহন ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত ব্যয় বেড়ে গেলে তেলের চূড়ান্ত দামেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের দামে ঊর্ধ্বগতি
বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে পৌঁছালেও আগের কয়েক দিনে বাজারে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা দেখা গেছে। মঙ্গলবারও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্টের দাম ১১০ ডলারে উঠেছিল। গত সপ্তাহেও দাম এই সীমা ছাড়িয়ে যায়। পরে তা কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ থেকে ১০৭ ডলারের মধ্যে নেমে আসে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১৯ মে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ দশমিক ২৮ ডলারে পৌঁছেছিল। সাম্প্রতিক দরবৃদ্ধির ফলে বাজার আবারও ওই উচ্চমূল্যের কাছাকাছি চলে এসেছে। অন্যদিকে, অয়েলপ্রাইসডটকমের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ৮১ ডলারে দাঁড়ায়। আরেকটি বাজার প্রতিবেদনে একই সময়ে ব্রেন্টের দাম ১০৯ দশমিক ৬৮ ডলার এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ৯৮ দশমিক ৫৫ ডলার উল্লেখ করা হয়েছে। লেনদেনের সময় ও বাজারের হিসাবের পার্থক্যের কারণে এসব দামে সামান্য ব্যবধান দেখা গেছে। ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের দামের এই ঊর্ধ্বগতি থেকে বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলছে। তবে ভবিষ্যতে দাম কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে সরবরাহ পরিস্থিতি, সংঘাতের বিস্তার এবং জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক থাকে তার ওপর।
লোহিত সাগরেও জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি
হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি লোহিত সাগরেও জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এই নৌপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে জাহাজগুলোকে বিকল্প পথে চলাচল করতে হতে পারে। এতে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, তেল উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও পরিবহনব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে নির্ধারিত সময়ে আমদানিকারক দেশগুলোর কাছে জ্বালানি পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া, বিমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিকল্প নৌপথ ব্যবহারের প্রয়োজন হলে পরিবহন খরচ বাড়তে পারে। বাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে ব্যবসায়ীরা সম্ভাব্য ঘাটতির আশঙ্কায় তেলের দাম বাড়ার পূর্বাভাসও দিতে পারেন।
সৌদি আরবে হামলার আশঙ্কায় বাড়ছে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সৌদি আরবে হামলার ঘটনায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি অবকাঠামোর পাশাপাশি বিমানবন্দর ও সামরিক স্থাপনাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এতে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি। দেশটির জ্বালানি উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি অবকাঠামোতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা বা উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। তবে হামলার আশঙ্কা এবং বাস্তবে উৎপাদন বা রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা এক নয়। তেলের বাজারে দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার, জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং নৌপথের পরিস্থিতি বাজার পর্যবেক্ষকদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
তেলের দাম বাড়লে বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অপরিশোধিত তেল থেকে পেট্রল, ডিজেল, জেট ফুয়েলসহ বিভিন্ন জ্বালানি উৎপাদন করা হয়। ফলে কাঁচামালের দাম বেড়ে গেলে পরিশোধিত জ্বালানির উৎপাদন ও আমদানি ব্যয়ও বাড়তে পারে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বাড়াতে পারে। পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় বাড়তে পারে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে দাম বেশি থাকলে জ্বালানি আমদানির ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তবে দেশের বাজারে জ্বালানির দাম কতটা এবং কখন পরিবর্তিত হবে, তা নির্ভর করে আমদানি চুক্তি, সরকারি মূল্যনীতি, মজুত ও অন্যান্য স্থানীয় পরিস্থিতির ওপর।
সামনে আরও বাড়তে পারে তেলের দাম?
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে হামলা অব্যাহত থাকলে এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে তেল পরিবহনে বিঘ্ন বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে সরবরাহের ওপর চাপ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়ে এলে এবং সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা কমলে তেলের দামে নিম্নমুখী প্রবণতাও দেখা যেতে পারে। তাই বর্তমান দরবৃদ্ধি স্থায়ী হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আপাতত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের নজর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, তেলবাহী ট্যাংকারের চলাচল এবং সৌদি আরবসহ গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকারী দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোর দিকে। এসব ক্ষেত্রে নতুন কোনো বিঘ্ন তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স
কালের আলো/আরআইকে/এসএ



আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]