ইতালিতে বিক্ষোভে সহিংসতা ঠেকাতে কঠোর নিরাপত্তা আইন
ইতালিতে বিক্ষোভের নামে সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কঠোর নিরাপত্তা আইন অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন আইনে দাঙ্গা ও সহিংস বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য শাস্তি বাড়ানোর পাশাপাশি অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধের ঘটনায় তাদের অভিভাবকদের আর্থিক দায়বদ্ধতার বিধান রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচিত কিশোরদের আটক করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে পুলিশকে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) থেকে আইনটি কার্যকর হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন শহরে সহিংসতা ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে সরকার এ পদক্ষেপ নিল। বিশেষ করে ইতালির আর্থিক কেন্দ্র মিলানে তরুণদের কয়েকটি দলের বিরুদ্ধে দোকানের জানালা ভাঙচুর, লুটপাট এবং পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার পর বিক্ষোভের সময় সহিংসতা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার বলছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংসতার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতেই নতুন বিধানগুলো কার্যকর করা হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, কঠোর শাস্তি ও পুলিশের ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধের পেছনে থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধানেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
দাঙ্গা ও সহিংস বিক্ষোভে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড
নতুন নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী, অন্তত পাঁচজনের কোনো দলের অংশ হয়ে বিক্ষোভের সময় জননিরাপত্তা বিপন্ন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। অর্থাৎ, বিক্ষোভের সময় সংঘবদ্ধভাবে এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া, যা জননিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে, তার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আইনে মুখ ঢেকে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কিংবা সহিংসতার ঘটনায় কেউ আহত হলে শাস্তি বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ভাঙচুর বা অন্যান্য কর্মকাণ্ডের কারণে ক্ষয়ক্ষতি হলে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে বিক্ষোভের সময় সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতি, সংঘবদ্ধ হামলা এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে সরকার। তবে আইনের নির্দিষ্ট বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঘটনার প্রকৃতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হবে।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের ঘটনায় অভিভাবকদেরও আর্থিক দায়
নতুন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অপ্রাপ্তবয়স্কদের ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তাদের অভিভাবকদের আর্থিক দায়বদ্ধতার বিধান। কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক এসব ঘটনায় জড়িত হলে ক্ষয়ক্ষতির জন্য তার অভিভাবকদের অর্থ দিতে হতে পারে। সরকারের যুক্তি, এ ধরনের ব্যবস্থা কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে পরিবারগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে বিক্ষোভের সময় দোকানপাট, যানবাহন ও অন্যান্য সম্পত্তি ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঠেকাতে এ বিধান কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এ ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগে অভিভাবকদের দায় কীভাবে নির্ধারিত হবে, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কীভাবে হিসাব করা হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে দায় আরোপ করা হবে, তা আইনের প্রাসঙ্গিক বিধান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের আটক করার ক্ষমতা পুলিশের
নতুন আইনে পুলিশের ক্ষমতার পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। এখন ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী কোনো কিশোর অপরাধ না করলেও তাকে বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনার পক্ষে প্রমাণ থাকলে পুলিশ আটক করতে পারবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে এ ধরনের ক্ষমতা শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। এই বিধানকে কেন্দ্র করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের অধিকার, পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগ এবং জননিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা তৈরি হতে পারে। কারণ, কোনো কিশোরের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ থাকা এবং তাকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করা এক বিষয় নয়। নতুন আইনের আওতায় পুলিশের এই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে বিক্ষোভের সময় অপ্রাপ্তবয়স্কদের আটক করার ক্ষেত্রে প্রমাণ, পরিস্থিতি এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়গুলো তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
মিলানে নিরাপত্তায় ৫০০ সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা
বিক্ষোভ ঘিরে নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কায় মিলানে নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে ইতালি সরকার। শনিবারের বিক্ষোভকে সামনে রেখে ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত পুলিশের সহায়তায় ৫০০ সেনা মোতায়েন করা হবে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ইতালির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংবেদনশীল এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর কাজে সেনারা সহায়তা করবেন। পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে তাঁরা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবেন। মিলান দেশটির গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। সেখানে সহিংসতা, দোকানপাটে লুটপাট এবং পুলিশের ওপর হামলার মতো ঘটনা জনজীবন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে সম্ভাব্য বিক্ষোভকে ঘিরে আগাম নিরাপত্তা প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে সেনা মোতায়েনের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সুরক্ষা ও নজরদারি জোরদারের কথা জানিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। শহরজুড়ে পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তা নিরাপত্তা পরিকল্পনা ও বিক্ষোভের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
মেলোনির বক্তব্য, ‘ভাঙচুর ও চুরি প্রতিবাদ নয়’
নতুন নিরাপত্তা আইন ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ভাঙচুর ও চুরি প্রতিবাদ নয়, এগুলো অপরাধ।
মঙ্গলবার তিনি আরও বলেন, চাকরি খোঁজা, অপর্যাপ্ত বেতন পাওয়া এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখতে না পাওয়ার কষ্ট সরকার বোঝে। তবে এসব দুর্দশাকে কখনোই সহিংসতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। মেলোনির বক্তব্যে একদিকে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা স্বীকার করা হয়েছে, অন্যদিকে প্রতিবাদের নামে সহিংসতা ও সম্পত্তি ধ্বংসের বিরোধিতা করা হয়েছে। সরকারের অবস্থান হলো, মানুষের অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ থাকলেও সহিংস কর্মকাণ্ডকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। ২০২২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মেলোনি সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিরাপত্তা কঠোর করার পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে বিরোধী মতের সমালোচক ও অধিকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাংশ মনে করেন, শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ করে অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতার মূল কারণ দূর করা সম্ভব নয়।
কারাগারে বন্দির সংখ্যা বেড়েছে ১৭ শতাংশের বেশি
ইতালিতে নিরাপত্তা নীতি নিয়ে বিতর্কের আরেকটি বিষয় হলো কারাগারে বন্দির সংখ্যা বৃদ্ধি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে দেশটির কারাগারে বন্দির সংখ্যা ১৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এ সময়ে বন্দির সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর শাস্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কারাগারের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে অপরাধের পেছনে থাকা বেকারত্ব, দারিদ্র্য, সামাজিক বঞ্চনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো সমস্যাগুলোর সমাধানও জরুরি। অন্যদিকে, সরকার মনে করছে, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা এবং সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। নতুন আইনের মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়বে বলে তাদের প্রত্যাশা।
মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে দক্ষিণ ইতালিতে সড়ক অবরোধ
নিরাপত্তা আইন নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ চলছে। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাকচালকেরা বিভিন্ন সড়কে অবরোধ করছেন। এতে পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। পরিবহন খাতে এ অস্থিরতার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে উৎপাদন ও কৃষিপণ্যের সরবরাহেও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু পাস্তা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ করেছে। কৃষি খাতের সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে, পরিবহনব্যবস্থা দীর্ঘ সময় ব্যাহত থাকলে ফল ও সবজি পচে নষ্ট হতে পারে। পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বাজার পর্যন্ত সরবরাহের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে এবং পচনশীল পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে পরিবহনসংক্রান্ত বিক্ষোভের প্রভাব শুধু ট্রাকচালকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কৃষক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের ওপরও পড়তে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সড়কপথে পণ্য পরিবহনকারীদের জন্য নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইতালি সরকার। তবে এই সহায়তা কতটা দ্রুত কার্যকর হবে এবং পরিবহনসংকট কতটা কমাতে পারবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অর্থনৈতিক চাপ নির্বাচনের আগে মেলোনি সরকারের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
ইতালির উত্তর ও দক্ষিণ—দুই অঞ্চলের বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ পরিবারগুলো ক্রমেই আর্থিক চাপে পড়ছে। তাঁদের মতে, আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে উঠছে, যা মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। একদিকে মিলানে সহিংস বিক্ষোভ ও লুটপাটের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সরকার নিরাপত্তা আইন কঠোর করছে, অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন খাতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৭ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে এ পরিস্থিতি মেলোনি সরকারের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, পরিবহনব্যবস্থা সচল রাখা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগ মোকাবিলা—সবকিছুই এখন সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নতুন নিরাপত্তা আইন বিক্ষোভের সময় সহিংসতা ও ভাঙচুরের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে ইতালিতে চলমান অস্থিরতার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কতটা সম্ভব হবে, তা আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকট ও সাধারণ মানুষের অসন্তোষ মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপের ওপরও নির্ভর করবে। সূত্র: রয়টার্স
কালের আলো/এমএএইচ/এসএ



আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]