পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভারতকে রুবিওর আশ্বাস
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তান ও চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক নিয়ে ভারতের উদ্বেগের মধ্যে দেশটির স্বার্থ ক্ষুণ্ন না করার আশ্বাস দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেছেন, বিশ্বের অন্য কোনো দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতির বিনিময়ে গড়ে উঠবে না। পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠতা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যে তাঁর এই বক্তব্য সামনে এসেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুবিও এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের গুরুত্বের পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তাও উঠে এসেছে। রুবিওর মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে এমন পদক্ষেপ নিরুৎসাহিত করা সম্ভব, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা বা সংঘাত বাড়িয়ে তুলতে পারে।
নিক্সন-কিসিঞ্জার আমলের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা নয়
১৯৭০-এর দশকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে ছিল বলে ঐতিহাসিকভাবে আলোচনা রয়েছে। ওই সময় স্নায়ুযুদ্ধের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছিল। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নীতির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা নিয়ে বর্তমান সময়েও আলোচনা হয়। তবে রুবিও মনে করেন, ওই সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সত্তরের দশকের পর বিশ্বরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বিভিন্ন দেশের কৌশলগত অবস্থানে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে ১৯৭০-এর দশককে উদাহরণ হিসেবে টানবেন না, কারণ সেই সময়ের সঙ্গে আজকের বিশ্বের মিল নেই। সে সময় স্নায়ুযুদ্ধসহ যেসব আন্তর্জাতিক সমীকরণ ছিল, সেগুলোর অনেক কিছুই এখন আর নেই। রুবিওর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিকে অতীতের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে বিচার না করার অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে আলাদা কূটনৈতিক বাস্তবতার আলোকে দেখার ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।
আসিম মুনিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে রুবিও বলেন, অন্য কোনো দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতির বিনিময়ে হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এবং দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টি ভারতের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, সীমান্ত উত্তেজনা এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত মতপার্থক্য রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন ইসলামাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ালে নয়াদিল্লির উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। রুবিও অবশ্য তাঁর বক্তব্যে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, দুই দেশের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং সহযোগিতার বিভিন্ন উদ্যোগই প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়।
ভারত সফর ও বাণিজ্য চুক্তির প্রসঙ্গ
ভারত সফর, বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের প্রতিশ্রুতি এবং দুই দেশের যৌথ কূটনৈতিক কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে রুবিও বলেন, এসব উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যও রয়েছে। এসব পার্থক্য সামাল দিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া দুই দেশের কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রুবিওর বক্তব্যে মূলত এই বার্তা উঠে এসেছে যে, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং ওয়াশিংটন একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগে সংঘাত ঠেকানোর প্রত্যাশা
রুবিও বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি। ওয়াশিংটন ইতিবাচকভাবে নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে এমন পদক্ষেপ নিরুৎসাহিত করতে পারে, যা সম্ভাব্য সংঘাতের দিকে পরিস্থিতিকে ঠেলে দিতে পারে। তাঁর মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করা সম্ভব হলে তা ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় দুই দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে কোন নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিরুৎসাহিত করার কথা তিনি বলেছেন, সে বিষয়ে সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখে সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানোর সুযোগ তৈরি করা।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানও জটিল
এদিকে, দুই দিনের ভারত সফরে থাকা মার্কো রুবিও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের জটিলতার কথাও স্বীকার করেছেন। চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধের সমাধান নিয়ে তিনি বলেন, বিষয়গুলো বেশ জটিল। সমাধান সহজ হলে যুদ্ধটি অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত। রুবিওর এই মন্তব্যে আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা-স্বার্থ, রাজনৈতিক অবস্থান এবং যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ জটিল হয়ে উঠতে পারে। ভারত সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে একদিকে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের গুরুত্ব, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গ তাঁর আলোচনায় আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
কালের আলো/এমএস/এসএ



আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]