মোদির বাসভবনের কাছে ১৫০ বছরের মসজিদ উচ্ছেদের নোটিশ
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো রেসকোর্স মসজিদ উচ্ছেদের নোটিশ জারি করেছে দেশটির জমি ও উন্নয়ন দপ্তর। নথিভুক্ত ওয়াক্ফ সম্পত্তি এবং পৌরসভার নথিতে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকা সত্ত্বেও মসজিদটিকে সরকারি জমিতে নির্মিত ‘অবৈধ স্থাপনা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নোটিশে মসজিদ কর্তৃপক্ষকে ছয় দিনের মধ্যে প্রাঙ্গণ খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের কাছাকাছি অবস্থিত এই মসজিদকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচ্ছেদ নোটিশের পর মসজিদটি রক্ষায় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুসলিম নেতারা মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব, ওয়াক্ফ সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি এবং দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ব্যবহার বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনার অভিযোগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগরবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন জমি ও উন্নয়ন দপ্তর মসজিদ কমিটির কাছে উচ্ছেদের নোটিশ পাঠিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সরকারি জমিতে অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণে কর্তৃপক্ষ মসজিদটিকে অননুমোদিত স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করছে। নোটিশ অনুযায়ী, নির্ধারিত ছয় দিনের মধ্যে মসজিদ প্রাঙ্গণ খালি করতে হবে। তবে মসজিদ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ নির্দেশের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সরবরাহ করা তথ্যে বিস্তারিত উল্লেখ নেই। অন্যদিকে, নয়াদিল্লি পৌর পরিষদের সরকারি ওয়েবসাইটে রেসকোর্স মসজিদকে ঐতিহ্যবাহী সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে একদিকে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি এবং অন্যদিকে অবৈধ নির্মাণের অভিযোগে উচ্ছেদের উদ্যোগ—এই দুই বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে।
ওয়াক্ফ সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতির দাবি
মসজিদটি রক্ষার দাবিতে সরব হয়েছেন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) সংসদ সদস্য আসাদুদ্দিন ওয়েইসি। তিনি কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। ওয়েইসির বক্তব্য অনুযায়ী, রেসকোর্স মসজিদটি ১৯৭৭ সাল থেকে গেজেটভুক্ত ওয়াক্ফ সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃত। দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসায় মসজিদটি ওয়াক্ফ সংশোধন আইনের অধীনে সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য বলেও তিনি যুক্তি দিয়েছেন। ওয়াক্ফ সম্পত্তি সাধারণত ধর্মীয় বা জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা সম্পত্তিকে বোঝায়। এ ধরনের সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি বিধান রয়েছে। তবে কোনো স্থাপনা ওয়াক্ফ সম্পত্তি হিসেবে নথিভুক্ত থাকলেই জমির মালিকানা বা উচ্ছেদসংক্রান্ত সব বিরোধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি, জমির মালিকানা এবং প্রযোজ্য আইন গুরুত্বপূর্ণ। রেসকোর্স মসজিদের ক্ষেত্রে ওয়াক্ফ হিসেবে স্বীকৃতি এবং পৌরসভার ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলো সামনে এনে উচ্ছেদ কার্যক্রম পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হচ্ছে।
মসজিদ ও কবরস্থান রক্ষায় জামিয়াতের উদ্যোগ
মসজিদটি রক্ষার দাবিতে ভারতের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম সংগঠন জামিয়াত উলামায়ে হিন্দের একটি প্রতিনিধিদলও উদ্যোগ নিয়েছে। গত সোমবার সংগঠনটির প্রতিনিধিরা কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রতিনিধিদলটি মসজিদ এবং এর সংলগ্ন কবরস্থানকে সম্ভাব্য উচ্ছেদ বা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার অনুরোধ জানায়। মন্ত্রীর কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে তারা সরকারি ঐতিহ্য তালিকায় মসজিদটির নাম অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়টি তুলে ধরে। একই সঙ্গে মসজিদটির বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের সংযোগ পুনর্বহালের দাবিও জানানো হয়। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্ছেদের নোটিশ জারির পর মসজিদটির বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। তবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সরবরাহ করা তথ্যে পাওয়া যায়নি।
নামাজ আদায়ের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি
জামিয়াত উলামায়ে হিন্দের প্রতিনিধিরা মুসল্লিদের স্বাভাবিকভাবে মসজিদে প্রবেশ এবং নামাজ আদায়ের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, মসজিদ ও কবরস্থানের ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টির সমাধান করা প্রয়োজন। প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বিষয়টি সমাধানে সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা করার আশ্বাস দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় বা জমি ও উন্নয়ন দপ্তরের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ নোটিশ প্রত্যাহার, সময়সীমা বাড়ানো কিংবা সংযোগ পুনর্বহালের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে উচ্ছেদ নিয়ে বিতর্ক
রেসকোর্স মসজিদকে ঘিরে এই ঘটনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ভারতের বিভিন্ন স্থানে সরকারি জমি দখল ও অবৈধ নির্মাণের অভিযোগে উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে বিতর্ক চলছে। দিল্লি ও উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যে মসজিদসহ ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে ফেলার ঘটনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ সাধারণত জমির মালিকানা, নির্মাণের অনুমোদন এবং সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের বিষয়গুলোকে পদক্ষেপের কারণ হিসেবে তুলে ধরে। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় সংগঠন ও সমালোচকদের একাংশ স্থাপনাগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব, ধর্মীয় অধিকার এবং আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণের বিষয়টি সামনে আনেন। তবে প্রতিটি উচ্ছেদ বা স্থাপনা অপসারণের ঘটনা আলাদা আইনি ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে বিচার করা প্রয়োজন। রেসকোর্স মসজিদের ক্ষেত্রে এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, ওয়াক্ফ সম্পত্তি হিসেবে নথিভুক্তি ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলো উচ্ছেদসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে কীভাবে বিবেচিত হবে। মসজিদ কমিটি, মুসলিম সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতারা বিষয়টি সমাধানে সরকারের হস্তক্ষেপ চাইছেন। অন্যদিকে, উচ্ছেদ নোটিশের পেছনে জমির মালিকানা ও অনুমোদনসংক্রান্ত অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ নথি সামনে না আসা পর্যন্ত বিরোধটির আইনি অবস্থান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
কালের আলো/জিকেএম/এসএ



আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]