বিইউপির পশ্চিম ক্যাম্পাসে নতুন দিগন্ত, নৈতিক মূল্যবোধে গুরুত্ব সেনাপ্রধানের
উচ্চশিক্ষার পরিসর আরও বিস্তৃত করতে এবং আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ তৈরিতে নতুন অবকাঠামো যুক্ত হলো বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)–এর পশ্চিম ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয়টির পশ্চিম ক্যাম্পাসে নবনির্মিত ইউটিলিটি বিল্ডিং, ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এফএসটি) টাওয়ার এবং ফ্যাকাল্টি অব আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস (এফএএসএস) টাওয়ার উদ্বোধন করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
রোববার (৩০ আগস্ট) মিরপুর সেনানিবাসে আয়োজিত এ উদ্বোধনকে শুধু নতুন তিনটি ভবন চালুর আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিইউপির একাডেমিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আরও আধুনিক ও সমন্বিত শিক্ষা পরিবেশ তৈরির ধারাবাহিকতায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
একাডেমিক সম্প্রসারণে নতুন অবকাঠামো
বিইউপির পশ্চিম ক্যাম্পাসে নতুন তিন ভবনের সংযোজন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের পথও সুগম করবে। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানের জন্য পৃথক টাওয়ার প্রতিষ্ঠা সংশ্লিষ্ট অনুষদগুলোর শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমকে আরও সংগঠিত করার সুযোগ তৈরি করবে। আধুনিক অবকাঠামোর সঙ্গে একাডেমিক কার্যক্রমের সমন্বয় ঘটাতে পারলে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

উদ্বোধনের পর ক্যাম্পাস পরিদর্শন
নবনির্মিত ভবনগুলোর উদ্বোধন শেষে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ক্যাম্পাসে একটি গাছের চারা রোপণ করেন। পরে তিনি বিইউপির পশ্চিম ক্যাম্পাস ও শিক্ষার্থীদের আবাসিক এলাকা ঘুরে দেখেন। ক্যাম্পাস পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আবাসন ও সামগ্রিক ক্যাম্পাস পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে একাডেমিক অবকাঠামোর সঙ্গে আবাসিক সুবিধার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি মূল্যবোধ
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান উচ্চশিক্ষার সাফল্যের একটি মৌলিক দিক সামনে আনেন। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য শুধু একাডেমিক উৎকর্ষে সীমাবদ্ধ নয়; নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সততা ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন মানবসম্পদ গড়ে তোলাই এর বড় অর্জন। তাঁর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয়ের বিষয়টিও। প্রযুক্তি ও জ্ঞাননির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার পাশাপাশি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবেও গড়ে ওঠার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি আধুনিক শিক্ষা পরিবেশ তৈরি, গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং দেশপ্রেমিক প্রজন্ম গঠনে বিইউপির ভূমিকার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরোত্তর সাফল্য ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।
বই প্রকাশ ও ১৪ দলকে সম্মাননা
অনুষ্ঠানে বিইউপি উপাচার্য মেজর জেনারেল মো. মাহবুব-উল আলমের লেখা ‘এডুকেশন মাইন্ডস; এওকেনিং কনসাইন্স’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন সেনাপ্রধান। এরপর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনকারী বিইউপির ১৪টি শিক্ষার্থী দলকে পুরস্কৃত করা হয়। শিক্ষার্থীদের এসব অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সহশিক্ষা, প্রতিযোগিতা ও নেতৃত্ব বিকাশে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের চিত্রও তুলে ধরে।
‘শুধু ভবন নয়, মানুষ তৈরি করতে হবে’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল পর্ব অনুষ্ঠিত হয় বিইউপির স্বাধীনতা মিলনায়তনে। স্বাগত বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মেজর জেনারেল মো. মাহবুব-উল আলম শিক্ষা ও গবেষণায় বিইউপির অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো, গবেষণার পরিধি সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিইউপি কাজ করে যাচ্ছে। আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

অবকাঠামো থেকে সক্ষমতায় রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন ভবন নির্মাণ নিঃসন্দেহে সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে এসব অবকাঠামো কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। শুধু আধুনিক শ্রেণিকক্ষ বা গবেষণাগার থাকলেই বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষক, পর্যাপ্ত গবেষণা বরাদ্দ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উদ্ভাবনবান্ধব পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তবমুখী গবেষণার সুযোগ। নতুন অবকাঠামোর সঙ্গে এসব বিষয় সমান্তরালে এগিয়ে নিতে পারলে বিইউপির একাডেমিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ভবিষ্যতের বিইউপির ভিত্তি
বিইউপির পশ্চিম ক্যাম্পাসে নতুন তিন ভবনের উদ্বোধন তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের পাশাপাশি একটি বৃহত্তর একাডেমিক লক্ষ্যকেও সামনে আনে। শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ—এই পাঁচটি ক্ষেত্রের সমন্বিত বিকাশই ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।

অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীর কোয়ার্টারমাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ শাহীনুল হক, ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান, বিইউপি সিনেটের সদস্য, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, বিইউপির সাবেক উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। নতুন ভবনগুলো এখন বিইউপির জন্য শুধু অবকাঠামো নয়—এসব স্থাপনা কতটা কার্যকরভাবে জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা ও মূল্যবোধসম্পন্ন নেতৃত্ব তৈরির কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, সেটিই হবে পরবর্তী সময়ের বড় পরীক্ষা, এমনটিই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
কালের আলো/এমএএএমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array