সার নিয়ে মাঠপর্যায়ে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে মজুদের ঘাটতি। সরবরাহ ব্যবস্থার একাধিক ধাপের সময়ক্ষেপণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কৃষক কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনছেন, কোথাও আবার চাহিদামতো সার মিলছে না। বিপরীতে সরকারের তথ্য বলছে, দেশে সার মজুদের ব্যবস্থা রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ধারাবাহিকভাবে নতুন আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও চলতি বছরের নন-ইউরিয়া সারের মাসভিত্তিক বরাদ্দের তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। এরপরও মাঠে সংকট তৈরি হচ্ছে কেন? অনুসন্ধানে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসছে নন-ইউরিয়া সার আমদানির সময়সূচি ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি। একই সঙ্গে উঠে আসছে একটি প্রভাবশালী আমলা সিন্ডিকেটের অভিযোগও।
সময়মতো আমদানি শুরু
নন-ইউরিয়া সার আমদানির ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দরপত্র, মূল্যায়ন, কার্যাদেশ, এলসি, জাহাজীকরণ, খালাস ও দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন-প্রতিটি ধাপ শেষ হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগে। ফলে পিক মৌসুমের আগে আমদানি নিশ্চিত না হলে কাগজে পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও স্থানীয় বাজারে সরবরাহের চাপ তৈরি হতে পারে। এবার কৃষি মন্ত্রণালয় ৩ আগস্ট টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি আমদানির জন্য দরপ্রস্তাব আহ্বান করে।
মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্যেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এই তিন ধরনের সার আমদানির দরপ্রস্তাব আহ্বানের বিষয়টি রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২ লাখ টন টিএসপি, ৫ লাখ টন ডিএপি ও ২ লাখ ৫০ হাজার টন এমওপি সংগ্রহের কথা। অর্থাৎ মোট ৯ লাখ ৫০ হাজার টন সার। কিন্তু দরপত্রের পরবর্তী ধাপগুলোতে সময় গড়াতে থাকায় নানা প্রশ্ন উঠেছে।
দর চূড়ান্তের পরও অপেক্ষা
গত ১৮ আগস্টের পর দর মূল্যায়ন শুরু হয়। পরে এমওপি, টিএসপি ও ডিএপির জন্য নির্দিষ্ট দর প্রস্তাব করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের সম্মতিও নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনুমোদন পদ্ধতির পরিবর্তন। আগে বেসরকারিভাবে নন-ইউরিয়া সার আমদানির চূড়ান্ত অনুমোদন কৃষি মন্ত্রণালয় পর্যায়ে সম্পন্ন হতো বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এবার বিষয়টি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হচ্ছে। প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতা ও সরকারি ক্রয়ের কাঠামোর দিক থেকে প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু পিক মৌসুমের ঠিক আগে এই অতিরিক্ত ধাপের সময়ব্যয় সরবরাহ ব্যবস্থায় কী প্রভাব ফেলছে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
সরকারও আমদানি বাড়াচ্ছে
এখানে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগটিও গুরুত্বপূর্ণ। সারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এরই মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক আমদানি অনুমোদন দিয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর কমিটি ১ লাখ ১০ হাজার টন এমওপি, ডিএপি ও ইউরিয়া আমদানির তিনটি প্রস্তাব অনুমোদন করে। এর আগে আগস্টেও মোট ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার আমদানির সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছিল, যার মধ্যে ৭০ হাজার টন ইউরিয়া, ৬০ হাজার টন টিএসপি, ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিএপি এবং ১ লাখ ১৫ হাজার টন এমওপি ছিল। অর্থাৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার আমদানি বন্ধ রেখেছে-এমন চিত্র পাওয়া যায় না।
ডিএপিতেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
৫ লাখ টন ডিএপি আমদানির পরিকল্পনাটি এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ২০টি প্রতিষ্ঠানকে আমদানির জন্য চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে। মরক্কো, রাশিয়া, জর্ডান, সৌদি আরব, মিসর ও তিউনিশিয়াসহ কয়েকটি দেশ থেকে সার আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু অনুমোদনের পর জাহাজীকরণ, খালাস, পরিবহন ও বিতরণ মিলিয়ে কৃষকের হাতে সার পৌঁছাতে ৮০-৯০ দিন সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রক্রিয়া এগোলেও মাঠে সরবরাহ পেতে ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
মজুদ বনাম মাঠের বাস্তবতা
সরকারি হিসাবে ডিএপির মজুদ তিন লাখ টনের বেশি। কিন্তু বাজারে কৃষকের অভিজ্ঞতা বলছে, সরবরাহ সব জায়গায় সমান নয়। সরকার নির্ধারিত ৫০ কেজির ডিএপি বস্তার দাম ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও বিভিন্ন এলাকায় ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু মোট মজুদের পরিমাণ দিয়ে বাজারের বাস্তবতা বিচার করা কঠিন। কোথায় কত মজুদ, কোন ডিলারের কাছে কত বরাদ্দ, কত দ্রুত তা কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে-এই সরবরাহ-শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপ গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে মাসভিত্তিক নন-ইউরিয়া সারের বরাদ্দের তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে।
‘সিন্ডিকেট’এর দিকে অভিযোগের আঙুল
এই আমদানি বিলম্বকে কেন্দ্র করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একটি অংশ সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা ‘সিন্ডিকেট’-এর দিকে অভিযোগের আঙুল তুলছেন। তাদের দাবি, সাবেক কৃষি সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান, সাবেক অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ইমাম ফয়সাল এবং সাবেক যুগ্মসচিব মো. খোরশেদ আলমের প্রভাব বলয় সার আমদানির সময়সূচি ও ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলেছিল। অভিযোগ আরও গুরুতর-পরিকল্পিতভাবে সময় পিছিয়ে দিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যাতে পিক মৌসুমে সার নিয়ে চাপ তৈরি হয়।
সামনে সমাধানের পথ
আন্তর্জাতিক বাজার ও পরিবহনপথের অনিশ্চয়তার মধ্যেও সরকার ধারাবাহিকভাবে সার আমদানির অনুমোদন দিচ্ছে। ফলে এখন মূল প্রয়োজন আমদানির সিদ্ধান্তকে দ্রুত মাঠপর্যায়ের সরবরাহে রূপ দেওয়া। পাশাপাশি বেসরকারি আমদানির আটকে থাকা প্রক্রিয়াগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ অনুযায়ী, টেন্ডারের পর কার্যাদেশ ও এলসি নিয়ে বিলম্ব আমদানিকারকদের অনিশ্চয়তায় ফেলছে। এই অবস্থায় সময়ের প্রতিটি দিন গুরুত্বপূর্ণ। সারের সংকট তাই একক কোনো সিদ্ধান্তের ফল কি না, তা এখনই বলা কঠিন। তবে টেন্ডার আহ্বানের সময়, অনুমোদনের কাঠামো, আমদানির সম্ভাব্য সময়, সরকারি মজুদের অবস্থান এবং কৃষকের হাতে সরবরাহ-সবকিছু একসঙ্গে পর্যালোচনা করলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।
সার নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত কৃষি মন্ত্রণালয়ের
সার কার্যক্রম তদারকিতে ‘সার ব্যবস্থাপনা কন্ট্রোল রুম’ চালু করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সার নিয়ে কোনো ধরনের সমস্যা বা অনিয়মের ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখার উপসচিব মো. মাকছুদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। আদেশ অনুযায়ী, পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত কৃষি মন্ত্রণালয়ের ৫২৮ নম্বর কক্ষে কন্ট্রোল রুমের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এ জন্য ২৭টি দল গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি দলে একজন কর্মকর্তা, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও একজন অফিস সহায়ক রয়েছেন।
কন্ট্রোল রুমের কার্যক্রম ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই শিফটে চলবে। প্রথম শিফট সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা এবং দ্বিতীয় শিফট বেলা ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। কন্ট্রোল রুমের সার্বিক তদারকির দায়িত্ব পালন করবেন অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ)। কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে সার সরবরাহ, মজুদ, পরিবহন ও বিতরণসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা। কোথাও সার পরিবহণে অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট, অবৈধ মজুদ, কালোবাজারি বা অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array