বাংলাদেশের মেধাবী তরুণরা বিশ্বজুড়ে নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখছেন। কেউ গবেষণাগারে নতুন আবিষ্কারে যুক্ত, কেউ চিকিৎসাসেবায়, কেউ আবার গুগল, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, মেটা কিংবা অ্যাপলের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে তাদের সাফল্য বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে তৈরি হচ্ছে একটি অপ্রিয় ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন-দেশের মেধা কি শেষ পর্যন্ত দেশের কোন কাজে আসছে?
উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে পড়াশোনা শেষে বিদেশে থেকে যাওয়ার প্রবণতাও। উন্নত কর্মপরিবেশ, গবেষণার বিস্তৃত সুযোগ, উচ্চ বেতন, পেশাগত মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং স্থায়ী বসবাসের সম্ভাবনা তাদের বড় একটি অংশকে বিদেশেই ক্যারিয়ার গড়তে উৎসাহিত করছে। বিপরীতে দেশে গবেষণার সীমিত সুযোগ, দক্ষ কর্মসংস্থানের ঘাটতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়নের অভাব ফেরার সিদ্ধান্তকে কঠিন করে তুলছে।
বিদেশযাত্রা দ্বিগুণ, ব্যয়েও রেকর্ড
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৫২ হাজারে পৌঁছেছে। শিক্ষার্থীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদেশে শিক্ষার পেছনে দেশের অর্থপ্রবাহও। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষা খাতে বাংলাদেশিদের ব্যয় হয়েছে ৬৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকা-যা এই পর্যন্ত সর্বোচ্চ। অর্থাৎ পরিবার ও রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ বিনিয়োগে বিপুলসংখ্যক তরুণ আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করছেন।
কিন্তু এই বিনিয়োগের কতটা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি, গবেষণা কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফিরে আসে-তার কোনো নির্ভরযোগ্য জাতীয় হিসাব নেই। বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে কতজন দেশে ফিরছেন, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারি পরিসংখ্যান না থাকায় ব্রেন ড্রেনের প্রকৃত মাত্রা নিরূপণও কঠিন।
সুযোগ থাকলেই থেকে যান সবাই
সরকারি শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বিদেশে উচ্চশিক্ষার চিত্র তুলনামূলক ভিন্ন। শিক্ষা ছুটির নির্দিষ্ট শর্ত এবং চাকরিতে ফেরার বাধ্যবাধকতার কারণে তাদের বড় অংশ দেশে ফিরে আসেন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ শ্রেণির প্রায় ২০ শতাংশ বিদেশে থেকে যেতে পারেন। সাম্প্রতিক একটি উদাহরণও আলোচনায় এসেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। পিএইচডির জন্য বিদেশে যাওয়া ১৩২ শিক্ষকের মধ্যে ২৮ জন দেশে ফেরেননি।
সংখ্যাটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের চিত্র; তবে এটি বৃহত্তর বাস্তবতার একটি ইঙ্গিত বহন করে। অন্যদিকে, নিজ উদ্যোগে স্কলারশিপ, ব্যক্তিগত অর্থায়ন কিংবা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সুযোগ নিয়ে যারা পড়তে যান, তাদের ফেরার ক্ষেত্রে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা নেই। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই শ্রেণির ৬০ শতাংশেরও বেশি পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরেন না। বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে সেখানকার শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ায় স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তই হয়ে ওঠে তাদের কাছে অধিক যৌক্তিক।
ঘাটতি মেধাকে ধরে রাখার পরিবেশে
বাংলাদেশি তরুণদের আন্তর্জাতিক সাফল্যের তালিকাটি দীর্ঘ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আল আমিন হোসেন অ্যামাজনে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী রিচিতা খন্দকার রিফাত গুগলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আনামিকা আহমেদ মাইক্রোসফটে সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গাজী মোহাইমিন ইকবাল মেটা এবং ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির শিহাব রশিদ অ্যাপলে কাজ করছেন। তাদের সাফল্য দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশের তরুণদের মেধা ও সক্ষমতার ঘাটতি নেই। ঘাটতি রয়েছে সেই মেধাকে দেশে ধরে রাখার মতো পরিবেশে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো যে দক্ষতাকে মূল্য দিচ্ছে, দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো একই মেধার জন্য সমপর্যায়ের সুযোগ তৈরি করতে পারছে কি না-সেখানেই মূল প্রশ্ন।
ব্রেন ড্রেনের আসল মূল্য ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল লস’
ব্রেন ড্রেনের ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে অর্থের হিসাবে ধরা পড়ে না। এর প্রভাব পড়ে দীর্ঘমেয়াদে। একজন শিক্ষার্থী যখন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, অবকাঠামো ও সামাজিক বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়ে বিদেশে গিয়ে স্থায়ীভাবে অন্য দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হন, তখন তার অর্জিত দক্ষতার বড় অংশের সুফল গন্তব্য দেশ পায়। ফলে গবেষণা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চশিক্ষায় দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি তৈরি হয়। অর্থনীতির পরিভাষায় এটি ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল লস’—মানবসম্পদ তৈরিতে যে বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন অন্য অর্থনীতি ভোগ করছে।
তরুণদের না ফিরতে চাওয়ার কারণ
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদের মতে, বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া নিজে কোনো সমস্যা নয়; বরং সঠিক পরিবেশ থাকলে এটি জাতীয় সম্পদে পরিণত হতে পারে। এজন্য দেশে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, মেধার মূল্যায়ন, গবেষণার স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো জরুরি। একই সঙ্গে স্টার্টআপ, উদ্ভাবন ও গবেষণাভিত্তিক উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, নীতিগত সহায়তা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে। কারণ একজন মেধাবী তরুণ শুধু ভালো বেতনের জন্য বিদেশে থাকেন না; তিনি দেখেন তার কাজের মূল্য কতটা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কতটা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের সুযোগ কোথায় বেশি।
মেধার জন্য বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো বিশ্বের দক্ষ ও উচ্চশিক্ষিত জনশক্তিকে আকৃষ্ট করতে পরিকল্পিত নীতি গ্রহণ করেছে। তাদের কাছে বিদেশি মেধাবীরা কেবল শিক্ষার্থী নন, ভবিষ্যৎ গবেষক, উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা ও করদাতা। বাংলাদেশের তরুণরা যখন এসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারে প্রবেশ করছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের ধরে রাখতে গন্তব্য দেশগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সুযোগ বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে শুধু দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়ে এই প্রবণতা ঠেকানো কঠিন।
শুধু প্রয়োজন ‘ব্রেন সার্কুলেশন’
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে রিভার্স ব্রেন ড্রেন নিয়ে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে। বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কিছু বাংলাদেশির দেশে ফেরার আগ্রহ সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। তবে এখন পর্যন্ত এটি কোনো দৃশ্যমান জাতীয় প্রবণতায় রূপ নেয়নি।
সরকার অবশ্য ‘ব্রেন ড্রেন’ বন্ধ করে ‘ব্রেন সার্কুলেশন’-এর দিকে যেতে চায়। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া তরুণদের দেশে ফিরে কাজ করার পরিবেশ তৈরির কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানিয়েছেন, প্রবাসী বাংলাদেশি গবেষক ও একাডেমিকদের যৌথ গবেষণা ও স্বল্পমেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে দেশের গবেষণাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই নীতি বাস্তবায়নের সাফল্য নির্ভর করবে একটি মৌলিক পরিবর্তনের ওপর-বিদেশ থেকে মেধা ফেরানোর চেয়ে দেশে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মেধাবীরা নিজেরাই ফিরতে চাইবেন।
কালের আলো/এম/এএই
আপনার মতামত লিখুন
Array