পুলিশ কঠোর হলে সমালোচনা, নিষ্ক্রিয় থাকলেও প্রশ্ন—আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালনের এই বাস্তবতা তুলে ধরে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তাঁর ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্য ঘিরে আলোচনা তৈরি হওয়ার পর বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। সংস্থাটির দাবি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে অবস্থান বোঝাতে নয়, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের বার্তা দিতেই ‘রূপক’ অর্থে শব্দটি ব্যবহার করেছেন আইজিপি।
- পুলিশের ওপর ১০ মাসে ১৭৬ হামলা, নিহত ৪ সদস্য
- দায়িত্ব পালন ও আত্মরক্ষার প্রসঙ্গ সামনে আনল সদর দপ্তর
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে পুরান ঢাকার চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আইজিপি। সেখানে তিনি বলেন, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে এক পক্ষ পুলিশকে ফ্যাসিস্ট বলে, আবার নিষ্ক্রিয় থাকলে দুর্বল বলে আখ্যা দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে। আইজিপির ভাষ্য, ‘যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে আমরা সেটাই করব।’
বক্তব্যটি সামনে আসার পর এদিন রাতে পুলিশ সদর দপ্তর এক ব্যাখ্যায় জানায়, মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশের অঙ্গীকার তুলে ধরতে গিয়ে আইজিপি ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন। বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে শাস্তি দেওয়া কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
পুলিশের ওপর হামলার পরিসংখ্যান
আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এনেছে। সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে পুলিশের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় চারজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন ৩৭০ জন।
পুলিশ সদর দপ্তর বলেছে, রাষ্ট্রের প্রধান আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে অপরাধ দমন, অপরাধী গ্রেপ্তার, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের মৌলিক দায়িত্ব। এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সদস্যদের কখনো কখনো অপরাধী, সংঘবদ্ধ হামলাকারী ও আইন অমান্যকারীদের সরাসরি প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়।
সদর দপ্তরের বক্তব্যে বলা হয়েছে, দেশের প্রচলিত আইন পুলিশের দায়িত্ব পালন ও আত্মরক্ষার অধিকারের আইনি কাঠামো নির্ধারণ করে। এ ক্ষেত্রে দণ্ডবিধি-১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ এবং পুলিশ অ্যাক্ট-১৮৬১-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মানবাধিকার সমুন্নত রাখা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত
পুলিশের ব্যাখ্যায় অপরাধ দমনে দৃঢ় অবস্থানের পাশাপাশি মানবাধিকার সমুন্নত রাখা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, জনগণের জানমাল রক্ষা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ পুলিশ।
একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সম্পর্কে আইজিপির মন্তব্য নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ভাষ্য, সাংবাদিকদের সম্পর্কে ঢালাও কোনো মন্তব্য করার উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না; অসাবধানতাবশত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, আইজিপির বক্তব্য ও পরবর্তী ব্যাখ্যায় দুটি বিষয় সামনে এসেছে—অপরাধ দমনে পুলিশের কঠোর অবস্থান এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইন, মানবাধিকার ও পেশাদারত্বের গুরুত্ব। পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতাও জরুরি।
কালের আলো/এমডিএইচ/এএএন
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]