চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া একসময় ছিল সামর্থ্যবানদের বিষয়। এখন সেই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যবিত্তের মধ্যেও, এমনকি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ কেউ জটিল রোগের চিকিৎসায় দেশের বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। গুরুতর অসুস্থতার খবর পেলে অনেকে দ্বিতীয় মতামত, উন্নত রোগ নির্ণয় কিংবা অস্ত্রোপচারের নিশ্চয়তার জন্য পাড়ি দিচ্ছেন বিদেশে। সঙ্গে যাচ্ছে পরিবারের সঞ্চয়, কখনো ধার করা অর্থ; আর দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তরিক, মানবিক আচরণ এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যসেবার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের তাৎপর্য শুধু অর্থের অঙ্কে নয়। বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা এবং মানুষের আস্থার বিষয়টিও জড়িয়ে আছে।
বিদেশযাত্রার একাধিক কারণ
ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন, মালয়েশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন বাংলাদেশি রোগীরা। বিদেশে যাওয়ার পেছনে অবশ্য একাধিক কারণ রয়েছে। বিশেষায়িত চিকিৎসা, উন্নত প্রযুক্তি কিংবা নির্দিষ্ট রোগে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের জন্যও মানুষ বিদেশে যান। কিন্তু দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় আস্থার সংকট যদি সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তখন বিষয়টি স্বাস্থ্য খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
জটিল রোগেই বিদেশমুখিতা বেশি
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষণায় বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের রোগভিত্তিক একটি চিত্র পাওয়া যায়। এর মধ্যে হৃদরোগের চিকিৎসায় যাচ্ছেন ১৭ শতাংশ রোগী। কিডনি রোগে ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থোপেডিক সার্জারিতে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং লিভার ও ক্যানসারের চিকিৎসায় ১১ শতাংশ করে রোগী বিদেশে যাচ্ছেন।
এ ছাড়া নিউরোলজি, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, ইউরোলজি, নাক-কান-গলা, জেনারেল সার্জারি, গাইনোকলজি, চোখ ও দাঁতের চিকিৎসাতেও রোগীরা দেশের বাইরে যাচ্ছেন। তালিকাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসবের বড় একটি অংশ এমন রোগ, যেখানে দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয় এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রোগীর মনে সামান্য অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও তাঁরা তুলনামূলক বেশি খরচের বিনিময়ে বিদেশে চিকিৎসার নিশ্চয়তা খোঁজেন।
চিকিৎসার ব্যয়ের চাপও বড় বাস্তবতা
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের ৫ মে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ২২ শতাংশ মানুষের প্রতি মাসে স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন হয়। অথচ স্বাস্থ্যসেবার মোট ব্যয়ের ৭৯ শতাংশই মানুষকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে। গবেষকেরা বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ‘পশ্চাদ্গামী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ফলে দেশে চিকিৎসা করাতেও পরিবারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। বিদেশে গেলে এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিমানভাড়া, ভিসা, থাকা-খাওয়া, যাতায়াত ও সঙ্গীর ব্যয়। তবু অনেকে এই অতিরিক্ত ব্যয় মেনে নিচ্ছেন। এর পেছনে চিকিৎসার পাশাপাশি নিশ্চিততার প্রত্যাশাও কাজ করছে।
বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসাইন জানিয়েছেন, দেশে চিকিৎসাসেবায় কিছু উন্নতি হলেও অব্যবস্থাপনা ও মানসম্পন্ন চিকিৎসার ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পর্যটক ভিসায় বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা ব্যয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। প্রকৃত ব্যয় আরও বেশি হতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতে আরও দৃশ্যমান অগ্রগতির প্রত্যাশা
বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা আগের তুলনায় বেড়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য সরকারের কাছে নেই বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এমএ মুহিত। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে গিয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজ করছে এবং ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা ফিরছে। আগামী কয়েক মাসে স্বাস্থ্য খাতে আরও দৃশ্যমান অগ্রগতির প্রত্যাশাও জানিয়েছেন তিনি। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নকে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা। বিদেশে চিকিৎসার প্রবণতা নিয়ে সুনির্দিষ্ট চিত্র পেতে হলে রোগীর গন্তব্য, রোগের ধরন ও ব্যয়ের বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহও জরুরি। এতে কোথায় দেশের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন, কোন চিকিৎসায় বিশেষ বিনিয়োগ দরকার এবং কোন সেবাকে আরও সহজলভ্য করা উচিত—তা নির্ধারণ করা সহজ হবে।
জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি
স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ কম বরাদ্দ। জিডিপির তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ১ শতাংশেরও কম। তবে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার, দক্ষ জনবল, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। বিপিএমসিএর সাবেক সভাপতি এম এ মুবিন খান জটিল রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের জোগানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এর সঙ্গে সমান গুরুত্ব পাচ্ছে চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্ক।
প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসকদের সময়নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ এবং রোগীর প্রতি আন্তরিক ও মানবিক আচরণের ওপর জোর দিয়েছেন। কারণ একজন রোগীর কাছে চিকিৎসার মান শুধু ওষুধ, পরীক্ষা বা অস্ত্রোপচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসক তাঁর কথা শুনছেন কি না, রোগের অবস্থা বুঝিয়ে বলছেন কি না এবং চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি নিরাপদ বোধ করছেন কি না—এসবও আস্থার অংশ।
পাঁচ জায়গায় উন্নতি হলে শক্ত হবে আস্থার ভিত
বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগী বিদেশে যাবেন। কিন্তু দেশের ভেতরে যে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব, সেটির জন্যও যদি মানুষ বিদেশকে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করেন, তাহলে সেই আস্থার জায়গাটি শক্তিশালী করাই হবে স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় অগ্রাধিকার। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকার হিসাব সেই অগ্রাধিকারের গুরুত্ব স্পষ্ট করেছে। এই অর্থের প্রবাহ কমাতে হলে বিদেশমুখী মানুষকে নিরুৎসাহিত করার চেয়ে দেশের চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো বেশি কার্যকর। সঠিক রোগ নির্ণয়, দক্ষ চিকিৎসা, আধুনিক প্রযুক্তি, স্বচ্ছ ব্যয় এবং রোগীর প্রতি মানবিক আচরণ—এই পাঁচ জায়গায় উন্নতি হলে আস্থার ভিতও শক্ত হবে।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array