পুলিশ হত্যার রহস্যে জমজমাট নরডিক থ্রিলার ‘ব্লাড স্যাক্রিফাইস’
পুলিশের জরুরি নম্বরে ফোন করে এক আতঙ্কিত নারী জানান, এক ব্যক্তি ছুরি নিয়ে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান দুই পুলিশ কর্মকর্তা। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায় না। পরদিন উদ্ধার হয় ওই দুই কর্মকর্তার মরদেহ—নৃশংসভাবে শিরশ্ছেদ করা। এক সপ্তাহ পর একই কায়দায় আরও দুই পুলিশ কর্মকর্তা খুন হন।
এমন রহস্যময় ও ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নেটফ্লিক্সের নতুন নরডিক ক্রাইম থ্রিলার ‘ব্লাড স্যাক্রিফাইস’। গত ২০ আগস্ট মুক্তির পর সিরিজটি দর্শকদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। দ্য কিলিং ও ট্যাবুখ্যাত নির্মাতা ক্রিস্টোফার নায়হোমের এই সিরিজে অপরাধ তদন্তের পাশাপাশি গুরুত্ব পেয়েছে বাবা-ছেলের জটিল সম্পর্কও।
খুনি কেন পুলিশকেই টার্গেট করছে?
পরপর পুলিশ হত্যার তদন্তে নামেন গোয়েন্দা টমাস বার্গ। শুরুতে ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড মনে হলেও তদন্ত যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হয়—এর পেছনে রয়েছে বড় কোনো পরিকল্পনা।
রহস্যের জট খুলতে গিয়ে টমাসকে ফিরতে হয় তাঁর বাবা আলফ্রেডের কাছে। একসময় আলফ্রেড ছিলেন পুলিশের দক্ষ গোয়েন্দা। তবে নানা কারণে তিনি বাহিনী থেকে ছিটকে পড়েন। দীর্ঘদিনের তিক্ত সম্পর্কের কারণে বাবা-ছেলের মধ্যে দূরত্ব থাকলেও ভয়ংকর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে কাজ করতে বাধ্য হন তাঁরা।
বাবা-ছেলের সম্পর্কেই আবেগের মূল সুর
ক্রাইম থ্রিলার হলেও ‘ব্লাড স্যাক্রিফাইস’ শুধু খুনিকে খোঁজার গল্প নয়। ধীরে ধীরে টমাস ও আলফ্রেডের সম্পর্কই হয়ে ওঠে গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
টমাস নিজেকে বাবার চেয়ে আলাদা মানুষ মনে করেন। কিন্তু নিজের স্ত্রী শার্লট ও ছোট মেয়ের সঙ্গে তাঁর দূরত্বও চোখে পড়ে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—যে পেশাগত জীবন একসময় আলফ্রেডকে পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল, টমাসও কি অজান্তে একই পথে হাঁটছেন?
এই বাবা-ছেলের টানাপোড়েন সিরিজটির অপরাধকাহিনিকে আরও মানবিক ও আবেগঘন করে তুলেছে।
প্রশংসিত আবহ ও নির্মাণ
সমালোচকদের বড় একটি অংশ সিরিজটির আবহ, অভিনয় ও টানটান নির্মাণের প্রশংসা করেছেন। রটেন টমেটোজে নয়টি সমালোচনার ভিত্তিতে সিরিজটির স্কোর ৮৯ শতাংশ।
নরডিক নোয়ার ঘরানার বৈশিষ্ট্য—ঠান্ডা ও বিষণ্ণ আবহ, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট এবং ধূসর চরিত্র—সিরিজটিতে ভালোভাবেই উঠে এসেছে। মাত্র পাঁচ পর্বে গল্প শেষ হওয়াকেও অনেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। তবে কিছু সমালোচকের মতে, টমাসকে দক্ষ গোয়েন্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলেও তাঁর তদন্তের সাফল্য সবসময় ততটা জোরালো মনে হয় না।
অভিনয়ে এগিয়ে পিটার অ্যান্ডারসন
টমাস বার্গের চরিত্রে ইয়াকভ অফটেব্রো সংযত অভিনয় করেছেন। অতিরিক্ত নাটকীয়তার বদলে মুখের অভিব্যক্তি ও নীরবতার মাধ্যমে চরিত্রটির চাপ ও উদ্বেগ ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।
তবে আলফ্রেড চরিত্রে পিটার অ্যান্ডারসনের অভিনয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। রুক্ষ, জেদি ও পুরোনো ধাঁচের সাবেক গোয়েন্দা আলফ্রেডের মধ্যে একই সঙ্গে অভিজ্ঞতা, ক্ষোভ ও ভঙ্গুরতা ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। টমাসের সঙ্গে তাঁর মুখোমুখি দৃশ্যগুলোতেই সিরিজের সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগ তৈরি হয়েছে।
ভয়ের অবস্থানই সিরিজটির বড় শক্তি
‘ব্লাড স্যাক্রিফাইস’-এর অন্যতম বড় শক্তি হলো ভয়ের অবস্থান বদলে দেওয়া। এখানে পুলিশ শুধু অপরাধীর পেছনে ছুটছে না; বরং তারাও জানে, পরবর্তী ফোনকলটি হয়তো তাদের মৃত্যুর বার্তা নিয়ে আসতে পারে।
সুইডেনের ঠান্ডা ও নীরব পরিবেশের সঙ্গে রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ডের বৈপরীত্য সিরিজটিকে আরও অস্বস্তিকর করে তুলেছে। অতিপ্রাকৃত কোনো উপাদান না থাকলেও বেশ কিছু দৃশ্য হরর ঘরানার মতো আতঙ্ক তৈরি করে।
মাত্র পাঁচ পর্বের সিরিজটির প্রতিটি পর্বের দৈর্ঘ্য ৪৪ থেকে ৫৮ মিনিট। ফলে দীর্ঘ না হয়েও রহস্য, তদন্ত, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনা ধরে রাখতে পেরেছে ‘ব্লাড স্যাক্রিফাইস’।
সূত্রঃ ভ্যারাইটি ও কোলাইডার অবলম্বনে
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array