সীমান্ত পেরিয়ে মাদকের স্রোত, গন্তব্য বড় শহর
সীমান্তের ওপারে রাতের অন্ধকারে শুরু হয় যাত্রা। নদী, নৌকা কিংবা দুর্গম সীমান্তপথ পেরিয়ে মাদক ঢোকে দেশে। এরপর বদলে যায় তার চেহারা—কখনো মাছ ধরার ট্রলার, কখনো ব্যক্তিগত গাড়ি, কখনো পণ্যবাহী যান। সীমান্তের ছোট পথ থেকে মহাসড়ক ধরে সেই চালান এগিয়ে যায় বড় শহরের দিকে। কোনো কোনো চালান মাঝপথেই ধরা পড়ে, বাকিগুলো পৌঁছে যায় নির্ধারিত গন্তব্যে। এভাবেই সীমান্তের মাদক শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় দেশের সবচেয়ে বড় ভোক্তা বাজারগুলোতে। গত ১৭ আগস্ট কক্সবাজার থেকে তিন লাখ ইয়াবা নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল একটি ল্যান্ডক্রুজার প্রাডো। চট্টগ্রামে এক দিন অবস্থানের পর গাড়িটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ওঠে। রাজধানীতে পৌঁছানোর আগেই কুমিল্লায় গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে চালানটি। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত পাঁচ মাসে কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে আসা ছয়টি বড় চালান থেকে প্রায় ২৭ লাখ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি চালানের গন্তব্য ছিল ঢাকা। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বলছে, রাজধানী থেকে এসব মাদক দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
সীমান্ত থেকে শহরে, শহর থেকে সারা দেশে
মাদক চোরাচালানের এই প্রবাহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কক্সবাজার। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এই জেলা ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইস প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। গত ১১ এপ্রিল নাফ নদীসংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় এক অভিযানেই বিজিবি ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ ইয়াবা উদ্ধার করে। বিজিবির হিসাবে, এক দিনে ইয়াবা জব্দের ক্ষেত্রে এটি তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা। এরপরও থামেনি বড় চালান। উখিয়া, টেকনাফ ও রামুসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিতই উদ্ধার হচ্ছে ইয়াবা। সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ায় বড় চালানের একটি অংশ ধরা পড়ছে। কিন্তু উদ্ধার হওয়া চালানের বিপরীতে যে পরিমাণ মাদক বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, কক্সবাজার থেকে মাদক চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় যাওয়ার ঘটনা নিয়মিত পাওয়া যায়। অন্যদিকে ভারত সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলা দিয়েও দেশে প্রবেশ করছে নানা ধরনের মাদক। এসব প্রবাহের শেষ প্রান্তে তৈরি হচ্ছে বড় শহরগুলোর বাজার।
আট মহানগরে বড় বাজার
বিচারাধীন মামলার পরিসংখ্যানও মাদকের এই বিস্তারের একটি চিত্র তুলে ধরে। আইন মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশের আট মহানগরে ন্যূনতম পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য গুরুতর মাদক মামলা বিচারাধীন ৪৭ হাজার ৯৪৮টি। সারা দেশে এমন মামলার সংখ্যা ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৩৩। অর্থাৎ মোট মামলার প্রায় ২৯ শতাংশই আট মহানগরে। সবচেয়ে বেশি মামলা ঢাকা মহানগরে—২১ হাজার ৯২০টি। এরপর চট্টগ্রামে ১৫ হাজার ৪৪টি। অর্থাৎ শুধু এই দুই মহানগরেই রয়েছে ৩৬ হাজার ৯৬৪টি মামলা, যা আট মহানগরের মোট মামলার প্রায় ৭৭ শতাংশ। রাজশাহীতে ৪ হাজার ১২১, গাজীপুরে ২ হাজার ৬২৩, রংপুরে ১ হাজার ২১৮, খুলনায় ১ হাজার ১৮৭, বরিশালে ১ হাজার ২১ এবং সিলেটে ৮১৪টি গুরুতর মাদক মামলা বিচারাধীন। এই পরিসংখ্যান বলছে, মাদকের বড় বাজার শুধু সীমান্ত এলাকায় নয়। জনসংখ্যা, যোগাযোগব্যবস্থা, ভোক্তার সংখ্যা ও পরিবহন সুবিধার কারণে মহানগরগুলো হয়ে উঠছে সরবরাহ ও ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
রুটও স্পষ্ট
সীমান্ত থেকে মহানগরে মাদক পৌঁছানোর পথের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলোর চিত্রও বেশ পরিষ্কার। কক্সবাজারের বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলার সংখ্যা ১২ হাজার ৬০০—দেশে তৃতীয় সর্বোচ্চ। এরপর চট্টগ্রাম হয়ে কুমিল্লা, সেখান থেকে ঢাকা—এই রুটে একাধিক বড় চালান আটকের ঘটনা রয়েছে। গত ১০ এপ্রিল কক্সবাজার সীমান্ত থেকে আসা মাছ ধরার ট্রলারে পাঁচ লাখ ইয়াবা চট্টগ্রাম নগরে জব্দ হয়। আগস্টে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী তিন লাখ ইয়াবার চালান কুমিল্লায় আটক হয়। এর আগে জুনে একই জেলায় গাড়িতে পরিবহনের সময় আরও এক লাখ ৬০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। কুমিল্লায় বিচারাধীন গুরুতর মাদক মামলা ১০ হাজার ৪৬৪টি। নারায়ণগঞ্জেও রয়েছে ৭ হাজার ৪১১টি। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং নৌপথের সংযোগ থাকায় রাজধানীমুখী মাদক পরিবহনে জেলাটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার নজির রয়েছে। ভারত সীমান্তবর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গুরুতর মাদক মামলা ৫ হাজার ৯২৭টি, রাজশাহী জেলায় ৫ হাজার ১২৬ এবং দিনাজপুরে ৪ হাজার ১৪৮টি।
অভিযান, মামলার পরও হচ্ছে না বন্ধ
প্রশ্নটি এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তে অভিযান হচ্ছে, বড় চালান জব্দ হচ্ছে, আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছে, মামলা হচ্ছে—তারপরও সরবরাহ থামছে না কেন? মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফের ভাষ্য, প্রায় সব মাদকই বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও বেশি। ফলে সেখানে বড় চালান আটকের ঘটনাও বেশি দেখা যায়। কিন্তু একই সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে আসা বিপুল মাদকের একটি অংশ নজরদারি এড়িয়ে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। আরও বড় বাস্তবতা হলো, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে চোরাচালান হওয়া মাদকের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ আনুমানিক ৮০ শতাংশই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে অভিযান ও মামলা যতই হোক, সরবরাহব্যবস্থার মূল কাঠামো অক্ষত থাকলে বাজারে ঘাটতি তৈরি হয় না। একটি চালান ধরা পড়লে আরেকটি চালান সেই জায়গা পূরণ করে। পরিবহন রুট বদলায়, বাহন বদলায়, কৌশল বদলায়—কিন্তু প্রবাহ অব্যাহত থাকে।
ভাঙতে হবে পুরো নেটওয়ার্ক
মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সীমান্তে মাদক আটকের পাশাপাশি পুরো সরবরাহ নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা। সীমান্ত পারাপারের পর কারা পরিবহন করছে, কারা অর্থের জোগান দিচ্ছে, কারা সংরক্ষণ করছে এবং মহানগর থেকে কারা বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছে—এই পুরো চেইন শনাক্ত না হলে বড় চালান জব্দের সাফল্যও দীর্ঘমেয়াদি ফল দেবে না। মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু সীমান্তে অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সীমান্ত, পরিবহন রুট, গুদাম, আর্থিক লেনদেন এবং নগরভিত্তিক বাজার—সবকিছুকে একসঙ্গে নজরদারির আওতায় আনা। কারণ বাস্তবতা হলো, সীমান্তে মাদক ধরা পড়ছে, আদালতে মামলা চলছে; কিন্তু বাজারে মাদকের সরবরাহ থামছে না। আর যতদিন চাহিদা ও সরবরাহের এই অদৃশ্য নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকবে, ততদিন সীমান্তে যত চালানই ধরা পড়ুক, মাদকের স্রোত পুরোপুরি থামানো কঠিন।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array