খুঁজুন
                               
, ,
           

গাজায় এআই ও ইসরায়েলি সামরিক ব্যবস্থা নিয়ে তথ্যচিত্র, ভেনিসে ২৪ মিনিট করতালি

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:২৭ অপরাহ্ণ
গাজায় এআই ও ইসরায়েলি সামরিক ব্যবস্থা নিয়ে তথ্যচিত্র, ভেনিসে ২৪ মিনিট করতালি

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার এবং বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের হত্যার পেছনের সামরিক ব্যবস্থাকে অনুসন্ধান করেছে ইসরায়েলি তথ্যচিত্র ‘নাজা’। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ারের পর ছবিটি প্রায় ২৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড ধরে স্ট্যান্ডিং ওভেশন পেয়েছে, যা উৎসবটির অন্যতম দীর্ঘ করতালির ঘটনা।

৮০ মিনিটের তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছেন ইসরায়েলি নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল সোর। দুজনই ২০২৫ সালে অস্কারে সেরা তথ্যচিত্রের পুরস্কার পাওয়া নো আদার ল্যান্ড–এর পরিচালক। আগের ছবিতে তাঁরা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার চিত্র তুলে ধরেছিলেন।

তিন বছরের অনুসন্ধান

‘নাজা’ নির্মাণে প্রায় তিন বছর সময় নিয়েছেন আব্রাহাম ও সোর। তথ্যচিত্রটির জন্য তাঁরা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক ও বর্তমান সদস্যদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে সাক্ষাৎকারদাতাদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। তাঁদের মুখ ও কণ্ঠ ডিজিটালি পরিবর্তন করা হয়েছে এবং তেল আবিবের ছাদে রাতের আঁধারে কয়েকটি সাক্ষাৎকার ধারণ করা হয়েছে।

ছবিটির নাম ‘নাজা’ও তাৎপর্যপূর্ণ। ইসরায়েলি গোয়েন্দা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত এই শব্দটি কোনো বিমান হামলায় সম্ভাব্য বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

আলোচনায় এআই ব্যবস্থা ‘ল্যাভেন্ডার’

তথ্যচিত্রে গাজায় লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে এআইনির্ভর প্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। নির্মাতাদের দাবি অনুযায়ী, ‘ল্যাভেন্ডার’ নামের একটি এআইসহায়ক ব্যবস্থা টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য—যেমন ফোনকল, মানুষের চলাচল ও পারস্পরিক যোগাযোগ—বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়েছে।

ছবিতে এক সাক্ষাৎকারদাতা এই প্রক্রিয়াকে ‘কারখানার মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন। আরেকজনের ভাষ্যে, দূর থেকে সবকিছু পরিচালনা করার কারণে পুরো বিষয়টি অনেকটা ভিডিও গেমের মতো মনে হতো।

তথ্যচিত্রে সাক্ষাৎকার দেওয়া কয়েকজন ইসরায়েলি সামরিক সদস্য বেসামরিক মানুষের বাড়িঘর ধ্বংস, মানবিক আইন উপেক্ষা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সামরিক বাহিনীর মধ্যে তৈরি হওয়া ঘৃণার পরিবেশ নিয়েও কথা বলেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব বাড়িকে হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলোতেই পরিবার বসবাস করত।

নির্মাতাদের রাজনৈতিক বার্তা

নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম জানিয়েছেন, পশ্চিমা দেশগুলো যেন ইসরায়েলকে দেওয়া সমর্থন পুনর্বিবেচনা করে এবং নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে—এটাই তাঁর প্রত্যাশা। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনে মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে কাজ করা ব্যক্তিদের অবস্থান শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

আব্রাহাম ও সোর তাঁদের অনুসন্ধান নিয়ে ‘+৯৭২ ম্যাগাজিন’-এ লিখেছেন, তাঁদের মতে গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের হত্যাকে কেবল যুদ্ধের ‘দুঃখজনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি পরিকল্পিত ও হিসাব করে করা কর্মকাণ্ড—তথ্যচিত্রটির অনুসন্ধান থেকে এমন একটি চিত্র উঠে এসেছে বলে তাঁরা দাবি করেছেন।

ভেনিসে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া

‘নাজা’কে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে শেষ মুহূর্তে যুক্ত করা হয়। প্রাথমিক তালিকা প্রকাশের প্রায় এক মাস পর ছবিটি প্রতিযোগিতায় জায়গা পায়। প্রদর্শনীর পর নির্মাতাদের আবেগপ্রবণ দেখা যায় এবং দর্শকদের কেউ কেউ ফিলিস্তিনি পতাকা তুলে ধরেন।

ছবিটির নির্বাহী প্রযোজক ও অস্কারজয়ী নির্মাতা জোনাথন গ্লেজারও করতালিতে অংশ নেন। ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’–এর প্রযোজক জেমস উইলসনও ছবিটির প্রযোজনায় যুক্ত রয়েছেন।

এর আগে ভেনিসে দীর্ঘ স্ট্যান্ডিং ওভেশনের রেকর্ড ছিল ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব’–এর দখলে। ২০২৫ সালে গাজাভিত্তিক ওই ছবির প্রদর্শনীর পর নির্মাতা কাউথের বেন হানিয়া প্রায় ২২ থেকে ২৩ মিনিট করতালি পেয়েছিলেন।

এবারের উৎসবে ‘নাজা’ একমাত্র তথ্যচিত্র হিসেবে মূল প্রতিযোগিতায় জায়গা পেয়েছে। পুরস্কার ঘোষণার আগে প্রায় ২৫ মিনিটের এই অভ্যর্থনা ছবিটিকে উৎসবের অন্যতম আলোচিত চলচ্চিত্রে পরিণত করেছে।

গাজা যুদ্ধকে ঘিরে তৈরি ‘নাজা’ তাই শুধু একটি তথ্যচিত্র নয়; যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও এআইয়ের ব্যবহার, সামরিক সিদ্ধান্ত এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বিতর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রভিত্তিক দলিল হিসেবে আলোচনায় এসেছে।

সূত্র: ভ্যারাইটি ও আল-জাজিরা

কালের আলো/এসএ

পুরোনো কার্টনেই বড় উদ্যোগ, বন্ধুদের নিয়ে সমাজ বদলাতে চায় মুগ্ধ

কুড়িগ্রাম,সংবাদদাতা কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ
পুরোনো কার্টনেই বড় উদ্যোগ, বন্ধুদের নিয়ে সমাজ বদলাতে চায় মুগ্ধ

বয়স মাত্র ১০ বছর। এই বয়সেই পরিবেশ রক্ষা, সড়ক নিরাপত্তা, মাদকবিরোধী সচেতনতা ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার শিশু মেসবাহুল ইসলাম মুগ্ধ। পুরোনো কার্টন ও খাতার পাতা দিয়ে নিজ হাতে প্ল্যাকার্ড তৈরি করে রাস্তার পাশের গাছে গাছে টাঙিয়ে দিচ্ছে সে। এ কাজে সহযোগিতা করছে তার বন্ধুরাও।

ফুলবাড়ী উপজেলার শাহবাজার থেকে হাজীর বাজারগামী সড়কের দুই পাশের গাছগুলোতে এখন চোখে পড়ছে মুগ্ধের তৈরি নানা সচেতনতামূলক বার্তা। কোথাও লেখা ‘অকারণে গাছ কাটব না’, কোথাও ‘পাখি আমাদের বন্ধু’ কিংবা ‘পাখিদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ি’। আবার কোনো প্ল্যাকার্ডে রয়েছে ‘মোড়ে গতি কমান, জীবন বাঁচান’, ‘অযথা হর্ন বাজাবেন না’ ও ‘পানিতে ময়লা ফেলবেন না’—এমন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

মাত্র ১০ বছরের একটি শিশুর এমন উদ্যোগ পথচারীদের নজর কাড়ছে। প্রশংসা পাচ্ছে তার বন্ধুমহল ও স্থানীয় মানুষের কাছ থেকেও।

পুরোনো কার্টন-খাতার পাতায় সচেতনতার বার্তা
মুগ্ধ ফুলবাড়ী উপজেলার ঘোগারকুটি গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা সুজাউদ্দৌলা শাহবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং মা গৃহিণী। দুই ভাইয়ের মধ্যে মুগ্ধ দ্বিতীয়। সে উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

বাড়িতে পড়ে থাকা পুরোনো কার্টন ও খাতার পাতা দিয়েই প্ল্যাকার্ড তৈরি করে মুগ্ধ। এরপর নিজের হাতে সেগুলোতে লেখে পরিবেশ সংরক্ষণ, সড়ক নিরাপত্তা, মাদকবিরোধী সচেতনতা ও নৈতিকতার কথা। বিকেল হলেই বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। রাস্তার পাশের গাছগুলোতে সুতা দিয়ে টাঙিয়ে দেয় নিজের তৈরি প্ল্যাকার্ড।

তার উদ্যোগে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টাও রয়েছে। গাছ কাটা থেকে বিরত থাকা, পাখির নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করা, সড়কে সতর্ক থাকা কিংবা পানিতে ময়লা না ফেলার মতো বিষয়গুলো সে তুলে ধরছে সহজ ভাষায়।

বন্ধুরাও পাশে দাঁড়িয়েছে মুগ্ধের
মুগ্ধের এই উদ্যোগে একা নয়, পাশে রয়েছে তার সহপাঠীরাও। বন্ধুরা জানায়, মুগ্ধ বাড়িতে প্ল্যাকার্ড তৈরি করে বিকেলে তাদের ডেকে নেয়। কেউ মই নিয়ে আসে, কেউ নিয়ে আসে সুতা। এরপর সবাই মিলে রাস্তার পাশের গাছগুলোতে প্ল্যাকার্ড টাঙায়।

পথচারীরা প্ল্যাকার্ড দেখে প্রশংসা করলে আনন্দ পায় তারাও। ছোট্ট এই দলটির কাছে কাজটি শুধু সময় কাটানোর বিষয় নয়; বরং নিজেদের এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।

‘একজন মানুষও সচেতন হলে নিজেকে সার্থক মনে করব
মুগ্ধ জানায়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে প্ল্যাকার্ড তৈরি ও এর ব্যবহার সম্পর্কে শিখিয়েছেন। শিক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া সেই শিক্ষা থেকেই তার এ উদ্যোগের শুরু। নিজের এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির ইচ্ছা থেকেই এমন কাজ করছে সে। মুগ্ধের ভাষায়, তার এলাকায় অনেকেই মাদক সেবন করেন। আবার অনেক মানুষ পরিবেশ সম্পর্কেও সচেতন নন।

মুগ্ধ বলে, “আমার লেখা প্ল্যাকার্ড দেখে যদি একজন মানুষও মাদক ছেড়ে দেয়, একজন মানুষও যদি পরিবেশের কথা ভাবে, তাহলেই আমি নিজেকে সার্থক মনে করব। ভবিষ্যতেও আমি এ ধরনের কাজ করে যেতে চাই।” একটি শিশুর এই বক্তব্যে ফুটে উঠেছে সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধ এবং ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে বড় পরিবর্তন আনার প্রত্যাশা।

পথচারীদের চোখে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
শাহবাজার থেকে হাজীর বাজারগামী সড়কে নিয়মিত যাতায়াত করেন স্থানীয় বাসিন্দা ওবায়দুল হক। তিনি বলেন, প্রথমে রাস্তার মোড় ও গাছের পাশে সচেতনতামূলক প্ল্যাকার্ড দেখে তাঁর কৌতূহল তৈরি হয়। পরে জানতে পারেন, মাত্র ১০ বছরের একটি শিশু এগুলো তৈরি করেছে। ওবায়দুল হকের ভাষায়, বিষয়টি সত্যিই অবাক করার মতো। শিশুটির উদ্দেশ্যও অত্যন্ত মহৎ।

স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ মানুষের দৈনন্দিন চলাফেরা ও আচরণে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরির ক্ষেত্রে মুগ্ধের উদ্যোগ অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে।

ছেলের উদ্যোগে অবাক বাবা
মুগ্ধের বাবা সুজাউদ্দৌলা জানান, ছেলে যে এমন উদ্যোগ নিয়েছে, তা প্রথমে তিনি জানতেন না। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তার পাশের গাছগুলোতে প্ল্যাকার্ড দেখতে পান। পরে জানতে পারেন, সেগুলো তাঁর ছেলে তৈরি করেছে। ছেলের কাজ দেখে অবাক ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। ভবিষ্যতে এ কাজে ছেলের পাশে থাকার আশ্বাসও দিয়েছেন।

শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রশংসা
উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোবেদ আলী বলেন, মুগ্ধের এ উদ্যোগ অন্য শিক্ষার্থীদেরও ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

পরিবেশ ও সংস্কৃতিকর্মী অধ্যক্ষ নূর মোহাম্মদ মিয়া মনে করেন, শিশুদের এমন সৃজনশীল ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর প্রত্যাশা, মুগ্ধের মতো নতুন প্রজন্ম জ্ঞান, মেধা ও মানবিক চেতনা দিয়ে সমাজ ও দেশকে বদলে দিতে ভূমিকা রাখবে। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে থেকে পরিবেশ, মানুষের নিরাপত্তা ও সামাজিক সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে যাচ্ছে মুগ্ধ। পুরোনো কাগজ-কার্টনে লেখা তার ছোট ছোট বাক্য হয়তো একদিনে সমাজ বদলে দেবে না, তবে কাউকে ভাবতে শেখাতে পারে, কাউকে সচেতন করতে পারে। আর সেই সম্ভাবনাকেই সঙ্গী করে বন্ধুদের নিয়ে এগিয়ে চলেছে ১০ বছরের এই খুদে সচেতনতাকর্মী।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

লেবু চাষে সাফল্যের গল্প, মানিকগঞ্জের বৈলতলা এখন ‘লেবুর গ্রাম’

মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ
লেবু চাষে সাফল্যের গল্প, মানিকগঞ্জের বৈলতলা এখন ‘লেবুর গ্রাম’

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বৈলতলা গ্রাম। একসময় এ এলাকায় আখের চাষ হতো। কিন্তু প্রায় ৩০ বছর ধরে ধীরে ধীরে বদলে গেছে গ্রামের কৃষিচিত্র। এখন যেদিকে চোখ যায়, দেখা মেলে সারি সারি লেবুর বাগান। কাগজি, এলাচি ও কলম্বোসহ বিভিন্ন জাতের লেবু চাষ করে নিজেদের ভাগ্য বদলানোর চেষ্টা করছেন এখানকার কৃষকেরা। ব্যাপকভাবে লেবুর আবাদ হওয়ায় স্থানীয়ভাবে গ্রামটি এখন পরিচিত ‘লেবুর গ্রাম’ নামে। গ্রামের কৃষকদের কাছে লেবু চাষ এখন অন্যতম প্রধান পছন্দ। সবুজ পাতার আড়ালে ঝুলে থাকা লেবুতে ভরে আছে বাগানগুলো। সামনে রমজান মাসকে ঘিরে বাগান পরিচর্যা, সার প্রয়োগ, লেবু সংগ্রহ ও বাজারজাত করার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা।

৯০ হেক্টর জমিতে লেবুর আবাদ
সরেজমিনে বৈলতলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে লেবুর বাগান। কোথাও শ্রমিকেরা গাছ থেকে লেবু তুলছেন, কোথাও ঝুড়িতে করে বাগান থেকে লেবু এনে রাস্তার পাশে স্তূপ করা হচ্ছে। আবার কেউ ছোট-বড় ও পাকা লেবু বাছাই করছেন। বিক্রির জন্য খাঁচিতে ভরে গাড়িতে তোলা হচ্ছে লেবু।

সাটুরিয়ার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আবদুর রাজ্জাক জানান, চলতি মৌসুমে সাটুরিয়া উপজেলায় ১১০ হেক্টর জমিতে লেবুর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু বৈলতলা গ্রামেই রয়েছে ৯০ হেক্টর জমির লেবুর বাগান। তিনি বলেন, বৈলতলা লেবু চাষের জন্য বিখ্যাত। এখানকার কৃষকেরা সারা বছরই বাগান থেকে লেবু সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। এ অঞ্চলের লেবুর চাহিদা দেশের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে।

বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু, এখন বিস্তীর্ণ বাগান
বৈলতলা গ্রামের লেবুচাষি আবদুল মালেকের বয়স ৭৬ বছর। তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে লেবু চাষ করছেন। বর্তমানে তাঁর পৌনে দুই বিঘা জমিতে লেবুর বাগান রয়েছে। আবদুল মালেক বলেন, একসময় গ্রামের বাড়ির আঙিনা থেকেই লেবু চাষের সূচনা হয়েছিল। ধীরে ধীরে চাষের পরিধি বাড়তে থাকে। প্রায় ৩০ বছরের ব্যবধানে বৈলতলা পুরোপুরি লেবুর গ্রামে পরিণত হয়েছে। গ্রামের আরেক চাষি শাহ আলম (৫০) জানান, তিনি ২৫ বছর ধরে লেবু চাষ করছেন। তাঁর সাড়ে তিন বিঘা জমিতে লেবুর বাগান রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একবার লেবুর চারা রোপণের পর যথাযথ পরিচর্যা করলে ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। বছরে চারবার ব্যাপকভাবে লেবু সংগ্রহ করা সম্ভব। এ ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়েও বাগান থেকে কমবেশি লেবু তুলে বিক্রি করা যায়।

লেবু যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন বাজারে
বৈলতলার লেবু শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। এখানকার উৎপাদিত লেবু কুমিল্লার নিমসার ও রাজধানীর কারওয়ান বাজারের আড়তসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারে পাঠানো হয়। প্রতিদিন লেবুভর্তি গাড়ি গ্রামের বিভিন্ন বাগান থেকে দেশের নানা গন্তব্যে রওনা হয়। গ্রামে প্রথম দিকে লেবু চাষ শুরু করা কৃষকদের একজন খোরশেদ আলম (৬৮)। তিনি জানান, একসময় তাঁদের এলাকায় আখের চাষ হতো। প্রায় ৩০ বছর আগে তাঁরা লেবু চাষ শুরু করেন। অন্য ফসলের তুলনায় লেবু চাষে লাভ বেশি হওয়ায় পরে গ্রামের অন্য কৃষকেরাও এ চাষে আগ্রহী হন। এভাবেই বৈলতলার পরিচিতি হয়ে ওঠে ‘লেবুর গ্রাম’।

বাগান কিনেও লাভের আশা
বৈলতলার লেবুর পাইকার আজাহারের (৫৬) মতে, লেবু চাষ ও ব্যবসায় লাভের সম্ভাবনা থাকলেও তা অনেকটাই বাজারদরের ওপর নির্ভরশীল। এ বছর তিনি এক বছরের জন্য ছয় বিঘা জমির লেবুর বাগান দুই লাখ ২০ হাজার টাকায় কিনেছেন।

আজাহার জানান, শ্রমিকের মজুরি, সার ও সেচের খরচ বাদ দিয়ে প্রায় দুই লাখ টাকা লাভ হবে বলে তিনি আশা করছেন। প্রতিবছরই তিনি লেবুর বাগান কিনে পরিচর্যা করেন এবং উৎপাদিত লেবু সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। বাজারে লেবুর দাম বেশি থাকলে লাভ বাড়ে, আর দাম কমে গেলে লাভও কমে যায়।

গ্রামের অধিকাংশ মানুষ জড়িত লেবু চাষে
সাটুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন পিন্টুর বাড়িও বৈলতলা গ্রামে। তিনি নিজেও নয় বিঘা জমিতে লেবুর আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, বৈলতলা গ্রামের প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে লেবু চাষের সঙ্গে জড়িত। প্রায় ৩০ বছর আগে নিজাম উদ্দিন নামের এক সবজি ব্যবসায়ী প্রথম এ গ্রামে লেবু চাষ শুরু করেন। পরে চাষটি লাভজনক হওয়ায় অন্যরাও ধীরে ধীরে এতে যুক্ত হন। এখন প্রতিদিন গ্রাম থেকে লেবুভর্তি গাড়ি দেশের বিভিন্ন বাজারে যায়।

বিভিন্ন জাতের লেবু চাষে বাড়ছে আগ্রহ
সাটুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. তানিয়া তাবাসসুম বলেন, উপজেলার মধ্যে বৈলতলা গ্রামেই সবচেয়ে বেশি লেবুর বাগান রয়েছে। এ গ্রামের উৎপাদিত লেবুর চাহিদা দেশের বিভিন্ন এলাকায়। লাভজনক হওয়ায় দিন দিন এ অঞ্চলে লেবু চাষের প্রসার ঘটছে।

তিনি জানান, বৈলতলার কৃষকেরা এলাচি, সিডলেস, কলম্বো, কাগজি ও স্থানীয় জাতের লেবু চাষ করেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, নিয়মিত পরিচর্যা এবং বাজারে চাহিদার কারণে লেবু চাষকে ঘিরে গড়ে উঠেছে গ্রামের কৃষি অর্থনীতি। একসময় আখের ক্ষেত আর বাড়ির আঙিনায় সীমিত থাকা লেবু চাষ এখন বৈলতলার বিস্তীর্ণ জমিতে ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষকদের পরিশ্রম ও লাভের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই চাষই গ্রামটির নতুন পরিচয় তৈরি করেছে—‘লেবুর গ্রাম’ বৈলতলা

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

রেল সচিবের সরকারি সফর, সঙ্গে স্ত্রী; সফরসূচি ঘিরে নানা প্রশ্ন

পাবনা সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ
রেল সচিবের সরকারি সফর, সঙ্গে স্ত্রী; সফরসূচি ঘিরে নানা প্রশ্ন

সরকারি সফরের সূচি অনুযায়ী পাবনা ও কুষ্টিয়ায় রেলওয়ের বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শনে গিয়ে স্ত্রীকে সঙ্গে রাখার ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম। সরকারি সফরের নামে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ভ্রমণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে রেলওয়ের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে সচিবের দাবি, তিনি সরকারি সফরের অংশ হিসেবেই রেলওয়ের স্থাপনা পরিদর্শন করছেন। সরকারি সফরে সপরিবারে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। যদিও সফরে স্ত্রীকে সঙ্গে নেওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেননি সচিব।

২২ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি সফর
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের জারি করা সফরসূচি অনুযায়ী, সচিব ফাহিমুল ইসলাম ২২ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলা সফর করছেন। গত ১৭ অক্টোবর সচিবের একান্ত সচিব ও উপসচিব মো. শামীমুর রহমান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ সফরকে সরকারি সফর হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

সফরসূচিতে ঢাকা, পাবনা ও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপককে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা থেকে সড়কপথে পাকশী রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছান সচিব। পরে পাকশী রেলওয়ের ভিআইপি রেস্টহাউসে অবস্থান ও মধ্যাহ্নভোজ শেষে বিকেলে রেলওয়ের বিভিন্ন স্থাপনা এবং ঐতিহাসিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকা পরিদর্শন করেন তিনি। এ সময় তাঁর সঙ্গে স্ত্রী ঢাকা মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের অধ্যাপক ডা. তাহমিনা হোসেনসহ কয়েকজন ছিলেন।

সফরসূচিতে নাম থাকলেও উপস্থিত ছিলেন না কয়েকজন কর্মকর্তা
পরিদর্শনকালে পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) আবু হেনা মোস্তফা আলম, বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ নাজিব কায়সার এবং বিভাগীয় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট রেজওয়ান উর রহমানসহ রেলওয়ের কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

তবে সফরসূচিতে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক আহম্মদ হোসেন মাসুম, সচিবের একান্ত সচিব মো. শামীমুর রহমান এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা রেজাউল করিম সিদ্দিকীর উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তাঁদের কাউকে সেখানে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক আহম্মদ হোসেন মাসুম জানান, সচিব নিজেই নিজের মতো করে সবকিছু ঘুরে দেখতে চেয়েছেন। এ কারণে তাঁরা সফরে যোগ দেননি। সচিবের একান্ত সচিব শামীমুর রহমানও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন।

সরকারি পদ ও সম্পদের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন
সরকারি সফরে স্ত্রীকে সঙ্গে রাখার বিষয়টি সামনে আসার পর এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, সরকারি সফরের আড়ালে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকারি পদমর্যাদা ও সম্পদ ব্যবহার করা হলে তা অনিয়ম এবং সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের শামিল হতে পারে। তবে এ ঘটনায় সরকারি অর্থ ব্যয়, সফরসংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘন কিংবা সরকারি সুবিধার অপব্যবহার হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা তদন্তের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

সচিবের বক্তব্য কী
অভিযোগের বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম জানিয়েছেন, সরকারি সফরের অংশ হিসেবেই তিনি রেলওয়ের স্থাপনা পরিদর্শনে এসেছেন। সরকারি সফরে স্ত্রীকে সঙ্গে নেওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না দিলেও তাঁর দাবি, এ ধরনের সফরে সপরিবারে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সচিব জানান, আগামী নভেম্বরের শেষ দিকে ঢাকা-পাবনা রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হবে। ট্রেনটির ঈশ্বরদী জংশন স্টেশনে যাত্রাবিরতির ব্যবস্থা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

কুষ্টিয়ায় পরিদর্শন শেষে ঢাকায় ফেরার সূচি
ঘোষিত সফরসূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে পাকশী রেলওয়ে রেস্টহাউসে অবস্থানের পর শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে কুষ্টিয়া সার্কিট হাউসের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা সচিবের। সেদিন বেলা সাড়ে ১১টায় কুষ্টিয়া কোর্ট রেলওয়ে স্টেশন এলাকা এবং বিকেলে কুষ্টিয়া রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শনের সূচি রয়েছে।

কুষ্টিয়া সার্কিট হাউসে রাত যাপনের পর শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে তাঁর ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। সরকারি সফরে পরিবারের সদস্যকে সঙ্গে নেওয়ার বিষয়টি ঘিরে তৈরি হওয়া প্রশ্নের জবাবে সচিবের বক্তব্য থাকলেও, সফরের ব্যয় ও সরকারি সুবিধা ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি