খুলনার কয়রা উপজেলার একটি সেতু ভেঙে পড়েছে ছয় বছর আগে। এরপরও সেখানে নতুন সেতু নির্মাণ না হওয়ায় বাঁশের নড়বড়ে সাঁকো দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন পাঁচ গ্রামের হাজারো মানুষ। শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবী, ব্যবসায়ী ও বয়স্কদের প্রতিদিনই এই সাঁকো পার হতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন অসুস্থ ব্যক্তি ও প্রসূতিরা। জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে যাওয়ার ক্ষেত্রেও পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ। কয়রা সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর কয়রা-ওড়াতলা খালের ওপর সেতু না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চলছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে দুর্ভোগ চললেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
সেতুর অধিকাংশই খালে, ভরসা বাঁশের সাঁকো
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৩-১৪/১ নম্বর পোল্ডারের আওতায় ২ নম্বর কয়রা-ওড়াতলা খালের ওপর সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর ২০২০ সালে সেতুটি ধসে পড়ে। এরপর থেকে এলাকাটির স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। সেতু ভেঙে যাওয়ার পর স্থানীয় লোকজন নিজেদের উদ্যোগে খালের ওপর বাঁশের সাঁকো তৈরি করেন। সেই সাঁকোই এখন ২ নম্বর কয়রা, ওড়াতলা, গোবরা, হরিণখোলা ও পূর্বচকসহ আশপাশের গ্রামের মানুষের পারাপারের একমাত্র ভরসা। দীর্ঘ ছয় বছরেও স্থায়ী সেতু নির্মাণ না হওয়ায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে তাঁদের।
একটু অসাবধান হলেই খালে পড়ে যাওয়ার ভয়
ওড়াতলা গ্রামের খালপাড়ের বাসিন্দা রিপন আহম্মেদ বলেন, সেতু খালে পড়ে আছে। পাশে বাঁশের সাঁকো দিয়ে ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়, মানুষ বাজারে যায়। একটু এদিক-ওদিক হলেই খালে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। ছয় বছর ধরে এমন কষ্ট করতে হচ্ছে, কিন্তু সেতু আর নির্মাণ হয়নি।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) দেখা যায়, খালের দুই পাড়ের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করছে একটি বাঁশের সাঁকো। সেটি দিয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্কুলগামী শিশুরা ভয়ে ভয়ে সাঁকো পার হচ্ছে। বয়স্কদের কেউ কেউ অন্যের সহায়তা নিয়ে পার হচ্ছেন। পাশেই পড়ে আছে ভেঙে যাওয়া সেতুর অবশিষ্টাংশ। সেতুটির প্রায় ৯০ শতাংশ ভেঙে খালে পড়ে রয়েছে।
শিক্ষার্থী ও রোগীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি
সেতু না থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন স্কুল-কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের জন্য তাঁদের ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো ব্যবহার করতে হচ্ছে। একটু অসাবধান হলেই পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২ নম্বর কয়রা গ্রামের বাসিন্দা গফুর সানা বলেন, সাঁকো পার হতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই পিছলে পড়ে যায়। এতে তাদের বই-খাতা পানিতে পড়ে নষ্ট হয়। বর্ষাকালে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। রাতে কোনো রোগী বা প্রসূতিকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলে স্বজনদের বিপাকে পড়তে হয়। দীর্ঘদিন ধরে সেতু না থাকায় এলাকার মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। শুধু শিক্ষার্থী নয়, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও ব্যবসায়ীদেরও প্রতিদিন যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সেতুর অভাবে ভ্যান, ইজিবাইক ও পণ্যবাহী যানবাহন নিয়ে সরাসরি চলাচল করা যায় না। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেক দূর ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। এতে সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লাগছে।
বারবার দাবি জানিয়েও মেলেনি সমাধান
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেতু নির্মাণের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও বাস্তব কোনো সমাধান হয়নি। পাঁচ গ্রামের মানুষের যোগাযোগের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, একটি বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন একটি জনপদের যোগাযোগব্যবস্থা চালানো সম্ভব নয়। কয়রা সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মাসুম বিল্লাহ বলেন, সেতুর অভাবে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। সভায় বারবার বিষয়টি তুলে ধরেও সমাধান মেলেনি। দ্রুত সেতু নির্মাণ করে মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করা জরুরি।
উপজেলা প্রশাসনের আশ্বাস
কয়রা সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বলেন, ভাঙা সেতুর কারণে কয়েকটি গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এখন জরুরি ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করে সেতুটি নির্মাণ করা প্রয়োজন।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, ছয় বছর ধরে সেতু না থাকায় পাঁচ গ্রামের মানুষ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন, যা উদ্বেগজনক। বিষয়টি খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। শুধু আশ্বাস নয়, সমস্যাটির বাস্তবসম্মত সমাধানে কী করা যায়, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করবে। এতে শিক্ষার্থী, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন যাতায়াতেও স্বস্তি ফিরবে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]