ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত যত দ্রুত আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিচ্ছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে পাকিস্তানের অবস্থান। একদিকে রিয়াদের সঙ্গে গভীর সামরিক সম্পর্ক ও সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার, অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে সীমান্ত, কূটনীতি ও নিরাপত্তার বাস্তব সম্পর্ক-এই দুই সমীকরণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইসলামাবাদকে এখন এমন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, যার প্রভাব ইয়েমেনের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও প্রধান প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির ফোনালাপ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। একই রাতে আরাঘচি কথা বলেছেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গেও। একই সময়ে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সৌদি ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ফলে ইসলামাবাদের তৎপরতাকে কেবল সামরিক প্রস্তুতি হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না।
লোহিত সাগরে নতুন ঝুঁকি
ইয়েমেনের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাওয়ায় সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়ছে। হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি ভূখণ্ডে হতাহতের পাশাপাশি জ্বালানি স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ডের খবর এসেছে। একই সময়ে মোখা বন্দরসহ লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী এলাকায় হুতিদের অগ্রযাত্রা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাব আল-মান্দেব।
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলের এই প্রণালি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এর ওপর সামরিক চাপ বাড়লে শুধু সৌদি আরব নয়, ইউরোপ-এশিয়ার বাণিজ্যপথও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফলে ইয়েমেনের সংঘাত এখন আর কেবল সৌদি-হুতি দ্বন্দ্ব নয়; এটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সংকটের প্রশ্ন হয়ে উঠছে।
সৌদির পাশে থাকার চাপ
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামোও গড়ে উঠেছে। এর ফলে রিয়াদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে ইসলামাবাদের ওপর রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফও বলেছেন, ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি ভূখণ্ডে আরও ছড়িয়ে পড়লে প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হওয়ার প্রশ্ন আসতে পারে। কিন্তু এর অর্থ সরাসরি যুদ্ধে নামা নয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে, সৌদি আরবের হয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এই বক্তব্যই ইসলামাবাদের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে-নিরাপত্তা সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু যুদ্ধের সরাসরি অংশীদার হওয়ার বিষয়ে সতর্কতা থাকবে।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন?
পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে কঠিন সমীকরণটি ইরানকে ঘিরে। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, জঙ্গিবাদ দমন, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়ে তেহরানের সঙ্গে ইসলামাবাদের নিয়মিত যোগাযোগ প্রয়োজন। ফলে সৌদি আরবের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া পাকিস্তানের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই কারণেই আসিম মুনিরের সঙ্গে আরাঘচির যোগাযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মুনিরের ইরানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় এবারের ফোনালাপ আরও তাৎপর্যপূর্ণ। এটি একই সঙ্গে ইরানকে পাকিস্তানের অবস্থান বোঝানোর এবং সম্ভাব্য উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে যোগাযোগের একটি চ্যানেল ধরে রাখার প্রচেষ্টা হতে পারে।
আগের অভিজ্ঞতা এবারও পথ দেখাবে
ইয়েমেন ইস্যুতে পাকিস্তানের দ্বিধা নতুন নয়। ২০১৫ সালে সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে পাকিস্তানের কাছে সেনা, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান চেয়েছিল। পাকিস্তানের পার্লামেন্ট তখন যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন ইসলামাবাদের যুক্তি ছিল, সংঘাতে পক্ষ না নিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করাই পাকিস্তানের স্বার্থে বেশি কার্যকর।
এবার অবশ্য পরিস্থিতি আলাদা। সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ। ফলে ২০১৫ সালের মতো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকা আগের তুলনায় কঠিন। তবে সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে প্রতিরক্ষা সহায়তা, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং কূটনৈতিক তৎপরতার সমন্বিত পথ পাকিস্তানের জন্য বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।
ইসলামাবাদ কি ‘সেতু’ হতে পারে?
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ সম্ভবত তার এই দ্বৈত যোগাযোগ সক্ষমতা। সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক আস্থা এবং ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ-দুটিই ইসলামাবাদের হাতে রয়েছে। এই অবস্থান পাকিস্তানকে একটি সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়লে ইসলামাবাদ পর্দার আড়ালে বার্তা আদান-প্রদান, উত্তেজনা কমানো এবং আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব জওহর সালিমও মনে করছেন, ইসলামাবাদ হয়তো এই যোগাযোগের পথটি কাজে লাগাতে চাইছে।
ভারসাম্যই শক্তি পাকিস্তানের
ইয়েমেনের সংঘাত যদি সৌদি ভূখণ্ডে আরও বিস্তৃত হয়, পাকিস্তানের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ বাড়বে। তবে ইসলামাবাদের সামনে শুধু ‘সৌদির পক্ষে’ অথবা ‘ইরানের বিপক্ষে’-এমন সরল কোনো সমীকরণ নেই। বরং পাকিস্তান একই সঙ্গে সৌদি নিরাপত্তার প্রতি অঙ্গীকার বজায় রেখে সরাসরি যুদ্ধে না জড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। আর যদি দুই পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ কাজে লাগানো যায়, তাহলে মধ্যস্থতাই হয়ে উঠতে পারে ইসলামাবাদের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array