হলে ঠাঁই নেই, মেসেই ঠিকানা-আবাসন সংকটে চার বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে পড়াশোনা, গবেষণা ও নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার। কিন্তু দেশের চার শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়-ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীর সেই স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবাসনের দুশ্চিন্তা। কারও থাকার জায়গা নেই, কেউ গাদাগাদি করে থাকছেন গণরুমে, আবার কেউ বাড়তি খরচে মেস বা ভাড়া বাসায় দিন কাটাচ্ছেন। ফলে আবাসন সংকট এখন আর শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
ঢাবিতে ঠাঁইহীন অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী
দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৪২ হাজার ৮৮১ জন। তাদের জন্য রয়েছে ১৯টি আবাসিক হল। অথচ বৈধভাবে হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন ১৮ হাজার ৮১৭ জন। অর্থাৎ ২৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে হলের বাইরে।
যারা হলে জায়গা পেয়েছেন, তাদেরও স্বস্তি নেই। চারজনের কক্ষে আটজনের থাকা, অপরিচ্ছন্ন স্যানিটেশন, দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিযোগ।
বিশেষ করে ছাত্রী হলগুলোতে অতিরিক্ত আবাসিক চাপের কারণে ব্যক্তিগত পরিসর ও মানসিক স্বস্তির সংকট প্রকট। খাবারের মান নিয়েও শিক্ষার্থীদের অভিযোগের শেষ নেই। নিম্নমানের ভাত, পাতলা ডাল, সামান্য সবজি, ব্রয়লার মুরগি কিংবা ছোট মাছের ওপর নির্ভরশীল খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ রেজাউল করিমও শিক্ষার্থীদের খাবারে বৈচিত্র্য ও পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
চবিতে ৭৩ শতাংশই হলের বাইরে
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সংকট আরও তীব্র। প্রায় ২৮ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে হলে থাকেন মাত্র ৭ হাজার ৫০০ জন। ৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থীই আবাসিক সুবিধার বাইরে। সিট না পেয়ে শিক্ষার্থীদের ১ নম্বর ও ২ নম্বর গেট, ফতেপুর, জোবরা, হাটহাজারীসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসা বা মেস ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে মাসিক ব্যয়, যাতায়াতের ভোগান্তি ও নিরাপত্তাঝুঁকি।
ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের বড় অংশকে শাটল ট্রেনে অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে যাতায়াত করতে হয়। বাসে চলাচলের ক্ষেত্রেও নারী শিক্ষার্থীদের নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। অথচ আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি হলেও শিক্ষার্থীর অনুপাতে আবাসিক সক্ষমতা বাড়েনি।
৭৩ বছরেও রাবিতে কাটেনি সংকট
প্রতিষ্ঠার ৭৩ বছর পেরিয়েও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে হলে জায়গা পাচ্ছেন ৯ হাজার ৬৭৩ জন। ৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে ক্যাম্পাসের বাইরে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও বিশ্ববিদ্যালয়টির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধার বাইরে থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
সংকট সবচেয়ে প্রকট ছাত্রী হলগুলোতে। কোথাও একটি সিঙ্গেল বেডে দুজন করে থাকার অভিযোগ রয়েছে। ১৬০ শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র চারটি গ্যাসের চুলা ও তিনটি ওয়াশরুমের মতো সীমিত সুবিধাও আবাসিক জীবনের দুরবস্থা স্পষ্ট করে।
সমস্যার বড় কারণ শিক্ষার্থী ও একাডেমিক কার্যক্রম বৃদ্ধির সঙ্গে আবাসন সক্ষমতা না বাড়া। গত ২৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩টি নতুন বিভাগ, সাতটি অনুষদ ও চারটি ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২১ হাজার থেকে ৩০ হাজারে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে নতুন আবাসিক হল নির্মিত হয়েছে মাত্র তিনটি।
জবিতে ১৮ হাজারের জন্য এক হল
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র আরও কঠিন। প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছে মাত্র একটি আবাসিক হল-নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র হলটি ছাত্রীদের জন্য। প্রথমে ৬০০ শিক্ষার্থীর ধারণক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী থাকছেন। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ঠিকানা পুরান ঢাকার ছোট ও ব্যয়বহুল মেস। সংকীর্ণ কক্ষে গাদাগাদি করে থাকা, বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও সীমিত ব্যক্তিগত পরিসর তাদের নিত্যসঙ্গী। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব হল-সংক্রান্ত তথ্যেও নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।
একমাত্র হলটিও নানা সমস্যায় জর্জরিত। প্রতি ফ্লোরে ৯০ শিক্ষার্থীর জন্য গ্যাসের চুলা মাত্র চারটি। ১৬ তলা ভবনে চারটি লিফট থাকলেও সচল থাকে দুটি। ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর জন্য থাকা মেডিকেল সেন্টার বন্ধ থাকার অভিযোগ রয়েছে। খাবারের মান, ওয়াইফাই ও প্রশাসনিক তদারকি নিয়েও শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ রয়েছে।
শিক্ষার্থী বাড়লেও নেই আবাসন পরিকল্পনা
চার বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র এক জায়গায় এনে দেখলে সংকটের মূল কারণ স্পষ্ট হয়-একাডেমিক সম্প্রসারণ হয়েছে, আবাসিক সম্প্রসারণ হয়নি। নতুন বিভাগ ও অনুষদ চালু হয়েছে, শিক্ষার্থী বেড়েছে; কিন্তু তাদের থাকার জায়গা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা সেই অনুপাতে বাড়েনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়কে তার সক্ষমতা বিবেচনায় শিক্ষার্থী ভর্তি করতে হবে। শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি হল, লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
এই বাস্তবতায় আবাসনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত কোনো সুবিধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নিরাপদে থাকার জায়গা একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা গ্রহণের মৌলিক পূর্বশর্ত।
মেসে খরচ ও হলে ভোগান্তি
হলের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন সংকট মানে বাড়তি অর্থের চাপ। মাসিক ভাড়া, খাবার, বিদ্যুৎ-পানি ও যাতায়াত-সব মিলিয়ে পরিবারের ওপর বাড়ছে ব্যয়ের বোঝা। অনেককে ক্যাম্পাস থেকে দূরে থাকতে হওয়ায় প্রতিদিন দীর্ঘ সময় যাতায়াতেও ব্যয় হচ্ছে।
অন্যদিকে হলে থাকা শিক্ষার্থীদের লড়াইটা ভিন্ন। অতিরিক্ত জনসংখ্যা, সীমিত আসন, অপর্যাপ্ত রান্নার ব্যবস্থা, নিম্নমানের খাবার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সঙ্গে প্রতিনিয়ত মানিয়ে নিতে হচ্ছে তাদের। ফলে দুই প্রান্তের শিক্ষার্থীই ক্ষতিগ্রস্ত। কেউ অর্থনৈতিক চাপে, কেউ আবাসিক দুর্ভোগে। এর প্রভাব পড়ছে পড়াশোনায়, বিশ্রামে এবং মানসিক স্বাস্থ্যে।
সমাধান শুধু হল নির্মাণে নয়
নতুন হল নির্মাণ জরুরি। কিন্তু শুধু ভবন বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন শিক্ষার্থী সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দীর্ঘমেয়াদি আবাসন পরিকল্পনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, পুষ্টিকর খাবার ও কার্যকর চিকিৎসাসেবা।
হলে জায়গা না পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন ভাতা বা বিকল্প আবাসন ব্যবস্থাও হতে পারে অন্তর্বর্তী সমাধান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সুবিধাবঞ্চিত ছাত্রীদের জন্য ভাতার উদ্যোগ নেওয়ার খবরও এসেছে, যা সংকট মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনে।
তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত নীতি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যত শিক্ষার্থী ভর্তি হবে, তাদের থাকার সক্ষমতাও সেই অনুপাতে নিশ্চিত করতে হবে। নতুন বিভাগ খোলার আগে যেমন একাডেমিক অবকাঠামো বিবেচনা করা হয়, তেমনি আবাসন সক্ষমতাকেও পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শ্রেণিকক্ষের নাম নয়। নিরাপদে থাকা, স্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাওয়া, বিশ্রাম নেওয়া এবং নির্বিঘ্নে পড়াশোনা করার সুযোগও উচ্চশিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ দেশের চার শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজারো শিক্ষার্থীর মাথার ওপর সেই নিরাপদ ছাদই নেই।
কালের আলো/এম/এএইচ



আপনার মতামত লিখুন
Array