মোদি-শি উষ্ণতায় ভারতের পূর্ব সীমান্তে নতুন পরীক্ষা
সাত বছর পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নয়াদিল্লি সফরে ভারত-চীন সম্পর্কে নতুন করে গতি আনার বার্তা মিলেছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে দুই নেতা আলোচনা করেছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সম্পর্ক পুনর্গঠনের আগে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। ফলে পশ্চিম সীমান্তের লাদাখের পাশাপাশি এবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল-বিশেষ করে অরুণাচল প্রদেশ।
অমীমাংসিত পূর্ব সীমান্ত
২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত-চীন সম্পর্কের প্রধান সংকট হিসেবে পূর্ব লাদাখই আলোচনায় ছিল। কিন্তু সীমান্তের পূর্ব প্রান্তে বিরোধের চরিত্র আরও জটিল। চীন অরুণাচল প্রদেশের প্রায় পুরো ভূখণ্ডের ওপর দাবি করে অঞ্চলটিকে ‘জাংনান’ নামে অভিহিত করে আসছে। বিভিন্ন সময় অরুণাচলের বিভিন্ন স্থানের জন্য চীনা নামও ঘোষণা করেছে বেইজিং।
নয়াদিল্লি এসব দাবি বরাবরই প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের অবস্থান, অরুণাচল প্রদেশ দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ যতই এগোক, অরুণাচল প্রশ্নটি দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের বড় অমীমাংসিত ইস্যু হয়ে থাকছে।
উত্তর-পূর্বে একসঙ্গে বহু স্বার্থ
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গুরুত্ব শুধু সীমান্ত নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ নয়। তিব্বত, আন্তঃসীমান্ত নদী, জলবায়ু পরিবর্তন, সীমান্ত অবকাঠামো এবং মিয়ানমার হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ-সবগুলো বিষয় এ অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিশেষ করে তিব্বত মালভূমিতে চীনের অবকাঠামো নির্মাণ এবং আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে অরুণাচল সীমান্তে সড়ক, সেতু ও সামরিক স্থাপনা উন্নয়নের প্রতিযোগিতা দুই দেশের নিরাপত্তা হিসাবকে আরও কঠিন করে তুলছে।
সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত
শি-মোদি বৈঠকের আগে অবশ্য সম্পর্কের বরফ গলার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গত ২৫ আগস্ট বেইজিংয়ে ভারত-চীন সীমান্ত ইস্যু নিয়ে বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশ আট দফা ঐকমত্যে পৌঁছায়। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর বৈঠকের পর দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে পতাকা বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। অরুণাচল প্রদেশের তাকসিংকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার পটভূমিতে এই যোগাযোগকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা এবং সামরিক পর্যায়ে যোগাযোগ-দুই পথেই উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চলছে।
দিল্লির সামনে কঠিন ভারসাম্য
ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তায় দৃঢ় অবস্থান ধরে রাখা। মোদির বক্তব্যে সেই দ্বৈত নীতিই স্পষ্ট হয়েছে। সম্পর্ক উন্নয়নের দরজা খোলা, কিন্তু তার চাবি সীমান্তে শান্তি। এই অবস্থায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারতের সীমান্ত অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা, দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রের যোগাযোগ বাড়ানো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অরুণাচলেই আসল পরীক্ষা
শি জিনপিংয়ের নয়াদিল্লি সফর ভারত-চীন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে কি না, তার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হবে সীমান্তে। আর সেই পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র অরুণাচল প্রদেশ। কারণ লাদাখে উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি পূর্ব সীমান্তের ভূখণ্ডগত দাবি, আন্তঃসীমান্ত নদী, অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের প্রশ্নও সমাধানের পথে এগোতে হবে।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]