খাদ্যগুদাম প্রকল্পে শুধু সময়ই বাড়ে
খাদ্যশস্য রাখার জায়গা বাড়াতে একের পর এক প্রকল্প। বরাদ্দ হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, বাড়ছে ব্যয়, তবু বাড়ছে না কাঙ্ক্ষিত সংরক্ষণ সক্ষমতা। কোথাও তিন বছরেও কাজ এগিয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ, কোথাও এক যুগ পেরিয়েও শেষ হয়নি নির্মাণ। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া একটি প্রকল্পে মাটি খোঁড়ার পরই থেমে গেছে কাজ। পরে যৌক্তিকতা না পাওয়ায় সেটি অসমাপ্ত রেখেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি খাদ্যগুদামের সক্ষমতা বাড়ানোর নামে নেওয়া চার প্রকল্পে মোট ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অথচ প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, দফায় দফায় সংশোধন, মেয়াদ বৃদ্ধি এবং কোথাও কোথাও স্থান পরিবর্তনের কারণে এসব বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতার ঘাটতি কাটাতে গিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় কিংবা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও এখন সামনে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য এবং পরিকল্পনা কমিশন ও বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যবেক্ষণে এসব চিত্র উঠে এসেছে।
তিন বছরেও এক-চতুর্থাংশ কাজ
২০২৩ সালের জুলাইয়ে ৮৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩ জেলায় নতুন খাদ্যগুদাম নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। ১৪৫টি স্থাপনায় মোট ১৯৫টি গুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক ব্যয় ৮১৪ কোটি টাকা থাকলেও পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৫৫ কোটি টাকা। শুধু ব্যয়ই বাড়েনি, বেড়েছে সময়ও। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। আইএমইডির হিসাবে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২১ দশমিক ১১ শতাংশ। এরই মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১৭৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে মাদারীপুরের কালকিনি ও বাগেরহাট প্যাকেজে ধীরগতি দেখা গেছে। গাছ ও পুরোনো অবকাঠামো সরাতেও সময় লেগেছে। শরীয়তপুরের আঙ্গারিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ও বিরল এবং মোংলা এলএসডিতে জায়গার সংকট রয়েছে। এ ছাড়া লে-আউট জটিলতা, প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন, প্রশাসনিক অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়াতেও বিলম্ব হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. সোহেলুর রহমান খান বলেন, সময়মতো পরিচালক নিয়োগ না হওয়া, নির্ধারিত স্থানে কাজ করতে না পারা, স্থান পরিবর্তন এবং রেট শিডিউলের কারণে ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন প্রকল্প পরিচালক টেন্ডারের উদ্যোগ নিলেও কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা তিনি দাবি করেন, আগের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম এখন সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে।
এক যুগেও শেষ হয়নি ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার প্রকল্প
সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামোর সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ লাখ ৮৭ হাজার টন ধারণক্ষমতার সাতটি আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, আশুগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনার মহেশ্বরপাশা, চট্টগ্রাম ও মধুপুরে এসব সাইলো নির্মাণের কথা। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ রয়েছে ৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। চার দফা সংশোধনের পর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়েও পুরো কাজ শেষ হয়নি। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ৯৫ দশমিক ০৫ শতাংশই খরচ হয়ে গেছে। তারপরও বাকি কাজ শেষ করতে আবারও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রকল্পের মূল কার্যালয় ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ ভবনে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি।
রাজনৈতিক প্রকল্প, শেষ পর্যন্ত বাতিল
খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের নির্বাচনি এলাকা নওগাঁর মহাদেবপুরে ৩৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার চালের সাইলো নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পটি পর্যালোচনায় আসে। এরপর দেখা যায়, ভূমি অধিগ্রহণ ও মাটি খোঁড়া ছাড়া বাস্তবে আর কোনো কাজ এগোয়নি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ছিল শূন্য। প্রকল্প পরিচালক মোস্তাক আহমেদ জানান, নতুন ফিজিবিলিটি স্টাডিতে মহাদেবপুরে প্রকল্পটি নেওয়ার যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি। ফলে অসমাপ্ত অবস্থায় রেখেই প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—যে প্রকল্পের যৌক্তিকতাই শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল না, সেটির পেছনে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন কেন হয়েছিল?
মেরামতের প্রকল্পেও ধীরগতি
ক্ষতিগ্রস্ত খাদ্যগুদাম ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো মেরামতে ২৫৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি শেষ করার কথা। লক্ষ্য ছিল সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো, খাদ্যশস্যের অপচয় কমানো, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ৩২ শতাংশ হলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩ শতাংশ। প্রকল্প পরিচালক এ টি এম কাউছার হোসেন জানান, সময়মতো বাজেট বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। ঠিকাদারদের বিলও আটকে রয়েছে।
সরকারি গুদাম বনাম বেসরকারি সক্ষমতা
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সরকারি গুদামে বর্তমানে প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখ টন খাদ্যশস্য রাখা যায়। বিপরীতে বেসরকারি খাতের ধারণক্ষমতা প্রায় ১ কোটি টন। অর্থাৎ বিপুল সরকারি বিনিয়োগের পরও সংরক্ষণ সক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কৃষিবিদ কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনায় গুদাম নির্মাণ টেকসই সমাধান নয়। সহজ শর্তে ঋণ, কর অবকাশ ও ভর্তুকির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে খাদ্য সংরক্ষণে যুক্ত করা যেতে পারে। তার মতে, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়তে থাকলে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতির আশঙ্কাও তৈরি হয়। তাই ব্যয় নির্ধারণ, দরপত্র, নির্মাণকাজের মান এবং অর্থ ব্যয়ে কঠোর নজরদারি জরুরি।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারি কতটা?
খাদ্যশস্যের সরবরাহ ও মজুদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম কিংবা গাফিলতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। সম্প্রতি মানিকগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দুর্যোগ কিংবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রাখতে হবে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তবতা হলো, একদিকে খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ, অন্যদিকে সেই লক্ষ্যেই নেওয়া প্রকল্পের ধীরগতি। কোথাও ব্যয় বাড়ছে, কোথাও মেয়াদ; কোথাও আবার প্রকল্পের যৌক্তিকতাই প্রশ্নের মুখে। ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার এই চার প্রকল্প তাই শুধু গুদাম নির্মাণের হিসাব নয়—এটি সরকারি প্রকল্প পরিকল্পনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিরও পরীক্ষা। খাদ্য নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর খাতে জনগণের অর্থ খরচ করে যদি সময়মতো গুদামই না হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগের সুফল শেষ পর্যন্ত যাবে কোথায়—এ প্রশ্নের উত্তর এখন সংশ্লিষ্টদেরই দিতে হবে।
কালের আলো/এম/এএইচ



আপনার মতামত লিখুন
Array