সরকারি হাসপাতালে ওষুধ নেই, ভরসা ফার্মেসিই
বিনামূল্যে চিকিৎসার আশায় সরকারি হাসপাতালে ছুটছেন মানুষ। কিন্তু চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন হাতে হাসপাতাল থেকে বেরিয়েই অনেকের সামনে খুলছে আরেকটি খরচের দরজা—ফার্মেসি। কারণ সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা গড়ে মাত্র ২২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রয়োজনের ৭৮ শতাংশ ওষুধই রোগীকে কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। এতে সরকারি চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর স্বাস্থ্যব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) গবেষণায় সরকারি হাসপাতালের ওষুধসংকটের এই চিত্র উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের অর্থায়নে আট বিভাগের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে নয় মাস ধরে জরিপ, সাক্ষাৎকার ও নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
১০০ ওষুধে গড়ে মিলে ২২টি
গবেষণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো—সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ১০০টি ওষুধের মধ্যে গড়ে পাওয়া যায় মাত্র ২২টি। স্তরভেদে সংকট আরও প্রকট। মেডিক্যাল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় ওষুধের মজুদ মাত্র ১২ শতাংশ। জেলা হাসপাতালে ২৪ শতাংশ এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ, যে রোগী বিনামূল্যে চিকিৎসার প্রত্যাশায় সরকারি হাসপাতালে যাচ্ছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার পরও তার চিকিৎসার বড় অংশ হাসপাতালের বাইরে সম্পন্ন করতে হচ্ছে। বিশেষ করে জটিল রোগের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি রোগীর আর্থিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
একই ওষুধ, ঘুরেফিরে একই চিকিৎসা
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্র সংকটটির বাস্তব রূপ তুলে ধরে। সেখানে রোগীদের হাতে ঘুরেফিরে যাচ্ছে কয়েকটি সাধারণ ওষুধ। ৬০ বছর বয়সী সাহেরা খাতুন শরীরের দুর্বলতার কথা জানিয়ে পেয়েছেন প্যারাসিটামল, হিস্টাসিন ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ। হাসপাতাল সূত্রের ভাষ্য, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় চিকিৎসকদের অনেক সময় মজুদ থাকা ওষুধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হচ্ছে।
মেহেরপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালেও সাধারণ জ্বর, ব্যথা ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের বাইরে অনেক প্রয়োজনীয় ওষুধ রোগীকে বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। হৃদরোগ ও সংক্রমণের মতো জটিল রোগের ওষুধ না থাকায় চিকিৎসার ব্যয় বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পাবনার জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে আবার সমস্যা অন্য মাত্রার। সেখানে রোগীর চাপ বরাদ্দের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বিদ্যমান বরাদ্দে সব রোগীকে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। রোগীদের অভিযোগ, দিনের শেষভাগে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়ার সুযোগ আরও কমে যায়।
রোগ নির্ণয় যন্ত্রের ৫২ শতাংশ অব্যবহৃত
সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা শুধু ওষুধের কাউন্টারে থেমে নেই। পিপিআরসির গবেষণায় জরুরি চিকিৎসাসামগ্রীর সংকটের পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। জেলা, উপজেলা ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মিলিয়ে গবেষণার আওতাভুক্ত ২২টি প্রতিষ্ঠানে থাকা রোগ নির্ণয় যন্ত্রের ৫২ শতাংশ গত এক বছরে ব্যবহারই করা হয়নি। ফলে হাসপাতাল ভবনে যন্ত্র থাকলেও রোগীর চিকিৎসায় তার সুফল পৌঁছাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি এবং অব্যবহৃত যন্ত্র—দুই বাস্তবতা মিলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
সংকটের দায় শুধু বরাদ্দে নয়
সরকারি হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষ ওষুধসংকটের জন্য সীমিত বরাদ্দ এবং রোগীর অতিরিক্ত চাপকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করছে। বাস্তবতাও বলছে, রোগীর সংখ্যা বাড়লে নির্ধারিত বরাদ্দ দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে মাঠপর্যায়ের তথ্যের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরও কিছু বিষয়—দুর্বল ব্যবস্থাপনা, চাহিদা নিরূপণে ঘাটতি, অসম বণ্টন, নজরদারির সীমাবদ্ধতা এবং অনিয়মের অভিযোগ।
এখানে সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘কত ওষুধ প্রয়োজন’—এই হিসাবটি কতটা বাস্তব রোগীর চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি হাসপাতালে যে পরিমাণ ওষুধ বরাদ্দ হচ্ছে, সেখানে রোগীর প্রকৃত সংখ্যা ও রোগের ধরন যদি পরিবর্তিত হয়, তাহলে পুরোনো হিসাবের ভিত্তিতে সরবরাহ স্বাভাবিকভাবেই ঘাটতি তৈরি করতে পারে।
ওষুধের দামেই ফাঁকা পকেট
সরকারি হাসপাতালের ওষুধঘাটতির প্রভাব বুঝতে দেশের সামগ্রিক চিকিৎসাব্যয়ের চিত্রটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর ৬১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়। দেশের মোট জনসংখ্যার হিসাবে এই হার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
চিকিৎসা নিতে গিয়ে ৫৮ শতাংশ মানুষ ধারদেনা করেন বলে তথ্য রয়েছে। কেউ সঞ্চয় ভাঙেন, কেউ জমি বিক্রি করেন। আবার প্রায় তিন কোটি মানুষ চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পেরে চিকিৎসাসেবাই নেন না। জাতীয় স্বাস্থ্য অর্থনীতির তথ্যও একই চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৯ শতাংশ ব্যক্তির নিজস্ব পকেট থেকে আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ—৬৪ দশমিক ৬ শতাংশ—ব্যয় হয় ওষুধে। হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ১০ দশমিক ১ শতাংশ, চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং রোগ নির্ণয় পরীক্ষায় ১১ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় হয়।
হাসপাতালভিত্তিক বাস্তব চাহিদা নির্ধারণ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদের মতে, সরকারি হাসপাতালে রোগীরা প্রেসক্রিপশন পেলেও ওষুধের ঘাটতির কারণে চিকিৎসা পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে না। বিশেষায়িত চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম বেশি হওয়ায় অনেক রোগী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারছেন না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এই পরিস্থিতিতে সমাধানের কেন্দ্রে থাকতে পারে হাসপাতালভিত্তিক বাস্তব চাহিদা নির্ধারণ। চিকিৎসকরা সারা বছর কোন ধরনের ওষুধ কতটা লিখছেন, রোগীর সংখ্যা ও রোগের ধরন কী—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বার্ষিক চাহিদা নির্ধারণ করা গেলে সরবরাহ আরও বাস্তবভিত্তিক করা সম্ভব। একই সঙ্গে কোথাও অতিরিক্ত, কোথাও ঘাটতি—এমন অসম বণ্টন ঠেকাতে নিয়মিত মজুদ পর্যালোচনা ও নজরদারি প্রয়োজন।
কারণ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও ওষুধ যদি রোগীর নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে ‘বিনামূল্যের চিকিৎসা’ আর পূর্ণাঙ্গ বিনামূল্যের থাকে না। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন, হাসপাতালের ওষুধের কাউন্টার এবং রোগীর সামর্থ্য—এই তিনটির মধ্যে সমন্বয়ই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কতটা মানুষের আর্থিক সুরক্ষা দিতে পারছে।
এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array