খুঁজুন
                               
, ,
           

শিক্ষায় সমতা, ক্ষমতায়নে পতন

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ
শিক্ষায় সমতা, ক্ষমতায়নে পতন

নারী-পুরুষের সমতার পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বড় ধাক্কা এসেছে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০২৬’-এ এক বছরের ব্যবধানে ৫৫ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। ১৪৫ দেশের মধ্যে এবার বাংলাদেশের অবস্থান ৭৯তম, যেখানে ২০২৫ সালে ছিল ২৪তম। তবে অবস্থানের এই পতনের মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।

  • নারী-পুরুষ বৈষম্যের বৈশ্বিক সূচকে এক বছরে ৫৫ ধাপ পেছাল বাংলাদেশ
  • সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব তলানিতে
  • অর্থনীতিতেও বাড়ছে ব্যবধান

প্রতিবেদনটি দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের লিঙ্গসমতার চিত্র একরৈখিক নয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি অব্যাহত থাকলেও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং শ্রমবাজারে নারীর অবস্থান দুর্বল হওয়ায় সামগ্রিক স্কোরে বড় পতন ঘটেছে। এবার বাংলাদেশের স্কোর ৭১ দশমিক ২ শতাংশ। গত বছর ছিল ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট। অবশ্য ২০০৬ সালের তুলনায় বর্তমান স্কোর এখনো ৮ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।

রাজনীতিতে ধস, সংসদে নারীর উপস্থিতি তলানিতে
সামগ্রিক পতনের সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যা রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সূচকে। এই খাতে বাংলাদেশের স্কোর ৭২ দশমিক ১ শতাংশ থেকে নেমে হয়েছে ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সঙ্গে অবস্থান তৃতীয় থেকে নেমে ১২তম হয়েছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব। ২০২৪ সালে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর গঠিত নতুন সংসদে নারীরা পেয়েছেন মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ আসন।

ডব্লিউইএফের হিসাবে, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদীয় নারী প্রতিনিধিত্বের সর্বনিম্ন সমতার স্কোর। এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯তম।

মন্ত্রিসভাতেও নারীর অংশগ্রহণ সীমিত—১৯ দশমিক ০৫ শতাংশ। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতায় কিছু উন্নতি আছে। গত দুই দশকে মন্ত্রিসভায় নারী-পুরুষ সমতার স্কোর ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।

রাজনৈতিক সূচকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী সরকারপ্রধানের দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৭৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নারী সরকারপ্রধান থাকার কারণে এই উপসূচকে বাংলাদেশ ২০১৯ সাল থেকে পূর্ণ সমতার স্কোর ধরে রেখেছে এবং যৌথভাবে প্রথম অবস্থানে রয়েছে। ফলে সংসদ ও মন্ত্রিসভায় নারীর প্রতিনিধিত্বের দুর্বলতা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সামগ্রিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।

অর্থনীতিতে ব্যবধান আরও স্পষ্ট
রাজনীতির পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ। এ খাতে স্কোর ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। ১৪৫ দেশের মধ্যে অবস্থান ১৪২তম—গত বছরের ১৪১তম অবস্থান থেকে আরও এক ধাপ নিচে। শ্রমবাজারের পরিসংখ্যান ব্যবধানটির গভীরতা স্পষ্ট করে। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৩৮ দশমিক ৪১ শতাংশ, পুরুষের ৭৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ২০০৬ সালে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের সমতার স্কোর যেখানে ৬১ দশমিক ১ শতাংশ ছিল, এবার তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৪৮ শতাংশে।

আয়ের ক্ষেত্রেও বৈষম্য প্রকট। নারীর আনুমানিক বার্ষিক আয় ৪ হাজার ৬৭০ ডলার, পুরুষের ১২ হাজার ৪৪০ ডলার। এক বছরে আয়-সমতার স্কোর কমেছে ১৫ শতাংশ পয়েন্ট। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নারীর অংশ মাত্র ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ; পেশাজীবী ও কারিগরি কর্মীদের মধ্যে তা ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

কর্মসংস্থানের ধরনও বৈষম্যের আরেকটি মাত্রা তুলে ধরে। নারী কর্মীদের ৯৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, পুরুষের ক্ষেত্রে হার ৭৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। আবার কর্মজীবী নারীদের ৫৪ দশমিক ০২ শতাংশ খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত, যেখানে পুরুষের হার মাত্র ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

শিক্ষায় সাফল্য, উচ্চশিক্ষায় রয়ে গেছে ফাঁক
অর্থনীতি ও রাজনীতির বিপরীতে শিক্ষায় বাংলাদেশের চিত্র ইতিবাচক। এই খাতে সমতার স্কোর ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ—বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০০৬ সালের তুলনায় স্কোর বেড়েছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় দেশ পূর্ণ সমতা অর্জন করেছে। তবে উচ্চশিক্ষায় ব্যবধান পুরোপুরি কাটেনি। নারীর ভর্তির হার ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ, পুরুষের ২৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ। সাক্ষরতার ক্ষেত্রেও নারীরা পিছিয়ে—নারীর হার ৭৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ, পুরুষের ৮১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

স্বাস্থ্য সূচকে স্থিতির পর বাস্তব চ্যালেঞ্জ
স্বাস্থ্য ও টিকে থাকার সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৯৬ শতাংশ। স্কোর অপরিবর্তিত থাকলেও অবস্থান ১২৩তম থেকে উঠে ১২০তম হয়েছে। জন্মের সময় নারী-পুরুষের অনুপাতের সূচকে বাংলাদেশ পূর্ণ সমতা অর্জন করেছে। তবে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত আয়ুতে সামান্য ব্যবধান রয়েছে—নারীর ৬২ দশমিক ৯৮ বছর, পুরুষের ৬৩ দশমিক ১৪ বছর।

প্রতিবেদনের অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য আরও কিছু গভীর সমস্যা সামনে আনে। ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ নারীর বাল্যবিবাহ হয় এবং ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ নারী জীবদ্দশায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন। দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে সন্তান প্রসবের হার ৫৯ শতাংশ। প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা ১১৫।

দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ, কিন্তু আঞ্চলিক অগ্রগতি ধীর
সামগ্রিক র‌্যাঙ্কিংয়ে বড় পতন হলেও আঞ্চলিক তুলনায় বাংলাদেশ এখনো এগিয়ে। মালদ্বীপ ১১৯তম, নেপাল ১২০তম, ভুটান ১২১তম, শ্রীলঙ্কা ১২৯তম, ভারত ১৩১তম এবং পাকিস্তান ১৪৩তম অবস্থানে রয়েছে। তবে এই অবস্থানকে সামগ্রিক সাফল্যের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। কারণ ডব্লিউইএফের সূচক মূলত নারী-পুরুষের ব্যবধান কতটা কমেছে, তা পরিমাপ করে; নারীর জীবনমানের সামগ্রিক মূল্যায়ন নয়। বাংলাদেশের বর্তমান চিত্রে তাই একই সঙ্গে দুটি বাস্তবতা স্পষ্ট—শিক্ষায় সমতার কাছাকাছি পৌঁছানো এবং স্বাস্থ্যসূচকে স্থিতিশীলতা; বিপরীতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অর্থনৈতিক সুযোগে গভীর বৈষম্য।

ডব্লিউইএফের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান গতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় নারী-পুরুষের ব্যবধান পুরোপুরি দূর হতে আরও ১৪৯ বছর লাগতে পারে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই শুধু বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান নয়; শিক্ষা থেকে অর্জিত অগ্রগতি কীভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিল, শ্রমবাজার এবং আয়-সুযোগে নারীর বাস্তব অংশগ্রহণে রূপান্তরিত হবে, সেটিই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

এম/এএইচ

বিদায়ী সাক্ষাতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক জোরদারের বার্তা ইয়াও ওয়েনের

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৫৮ অপরাহ্ণ
বিদায়ী সাক্ষাতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক জোরদারের বার্তা ইয়াও ওয়েনের

চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎকালে তিনি এ আশাবাদ জানান।

সাক্ষাতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের ভূমিকা ও অবদানের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকালে তার কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর সফল করতেও তার ইতিবাচক অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

হুমায়ুন কবির বলেন, রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের মেয়াদকালে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের ‘২+২’ সংলাপ মেকানিজমসহ বেশ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিদায়ী রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশে তিন বছর নয় মাস দায়িত্ব পালন করা তার জন্য আনন্দ ও সম্মানের বিষয় ছিল। এ সময় তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান এবং এটিকে বাংলাদেশের জন্য গৌরবোজ্জ্বল মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় চীনের ধারাবাহিক সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলেও আশাবাদ জানান ইয়াও ওয়েন। তিনি জানান, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিভাগের মন্ত্রী চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ সফরে আগ্রহী।

সাক্ষাতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আগামী দিনে বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তিনি রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে তার দায়িত্ব পালনের জন্য ধন্যবাদ জানান এবং নতুন কর্মস্থলের জন্য শুভকামনা জানান।

কালের আলো/এমএসআইপি 

০.৩৩ থেকে ৯৭ শতাংশ (সাব) খেলাপির দৌড়ে দুই প্রান্তে ব্যাংক খাত

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৫২ অপরাহ্ণ
০.৩৩ থেকে ৯৭ শতাংশ (সাব)  খেলাপির দৌড়ে দুই প্রান্তে ব্যাংক খাত

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চিত্র এখন যেন একই মানচিত্রে আঁকা দুই বিপরীত বাস্তবতা। একদিকে এমন ব্যাংক রয়েছে, যেখানে ঋণের খুব সামান্য অংশ অনাদায়ী; অন্যদিকে কয়েকটি ব্যাংকের প্রায় পুরো ঋণপোর্টফোলিওই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত জুনের তথ্য বলছে, দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। বিতরণ করা মোট ঋণের বিপরীতে এর হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

  • ব্যাংকভেদে ঋণমানের আকাশ-পাতাল ফারাক
  • একদিকে নিয়ন্ত্রিত খেলাপি, অন্যদিকে ঋণের ৯০ শতাংশের বেশি অনাদায়ী
  • ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপিতে এখন নজর পুনরুদ্ধারে
  • মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশই ১০ ব্যাংকে

সবচেয়ে কম খেলাপি কমিউনিটি ব্যাংকে
শতকরা হারে সবচেয়ে কম খেলাপি ঋণ রয়েছে নতুন প্রজন্মের কমিউনিটি ব্যাংকে। গত জুন শেষে ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণ ছিল ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে মাত্র ৫ কোটি টাকা। ফলে মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপির হার দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ।

তবে কমিউনিটি ব্যাংকের এই হার বিশ্লেষণের সময় ঋণপোর্টফোলিওর আকারও বিবেচনায় নিতে হয়। কারণ তুলনামূলক কম ঋণ বিতরণ করা প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের অনুপাত বড় ব্যাংকের তুলনায় ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। তাই শুধু শতাংশের ভিত্তিতে ব্যাংকের সামগ্রিক ঋণমান বিচার করলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

বড় ঋণপোর্টফোলিওতেও ব্র্যাকের খেলাপি কম
কম খেলাপি ঋণের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ব্র্যাক ব্যাংকের চিত্রটি তুলনামূলকভাবে আলাদা। গত জুন শেষে ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৫ হাজার ৬২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপির হার ২ দশমিক ০৫ শতাংশ।

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং অনুমোদনের ক্ষেত্রে সুশাসন ও যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করে নিরপেক্ষভাবে ঋণ দেওয়ার কারণেই খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। সম্প্রতি ফোর্বসের বিশ্বের সেরা পারফর্মিং ৫০০ ব্যাংকের তালিকায় ব্র্যাক ব্যাংকের স্থান পাওয়াও প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক পারফরম্যান্সের আরেকটি দিক সামনে এনেছে।

পূবালীর ঋণে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া
কম খেলাপি ঋণের হারে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক। গত জুন শেষে ব্যাংকটির মোট ঋণ ছিল ৭২ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। খেলাপির হার ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ব্যাংকটির এমডি মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, ঋণ অনুমোদনে কোনো ব্যক্তি বা শীর্ষ কর্মকর্তার একক সুপারিশের ওপর নির্ভর করা হয় না। নিয়মতান্ত্রিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই ঋণ অনুমোদন করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক পরিচয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয় না।

পূবালীর বড় ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ খাদ্য ও খাদ্যসামগ্রী, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন এবং পোশাকের মতো প্রয়োজনীয় খাতে গেছে। ব্যাংকটির মতে, খাতভিত্তিক এই ঋণবণ্টন খেলাপি কম থাকার একটি কারণ।

নিয়ন্ত্রিত খেলাপির তালিকায় আরও সাত ব্যাংক
কম খেলাপি ঋণের তালিকায় এরপর রয়েছে সিটিজেনস ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক। গত জুন শেষে সিটিজেনস ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ছিল ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংকের ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং সিটি ব্যাংকের প্রায় ৩ শতাংশ। ইস্টার্ন ব্যাংকে এই হার ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বলেন, স্বাধীন ঋণ অনুমোদন ব্যবস্থা এবং ঋণের বৈচিত্র্য খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে এসএমই ও ভোক্তা ঋণের ওপর গুরুত্ব দেওয়াকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

অষ্টম থেকে ১৩তম অবস্থানে রয়েছে যমুনা ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ও সীমান্ত ব্যাংক। এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩৫, ৪ দশমিক ০৭, ৪ দশমিক ১৯, ৪ দশমিক ৩৬, ৪ দশমিক ৮২ ও ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

বিপরীত প্রান্তে একীভূত ব্যাংকগুলো
খেলাপি ঋণের হারের বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে কয়েকটি একীভূত ব্যাংকে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণের ৯৭ দশমিক ০৮ শতাংশই খেলাপি। ইউনিয়ন ব্যাংকে খেলাপির হার ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকে ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ ঋণ খেলাপি। এ ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংকের ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং এবি ব্যাংকের ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে আছে। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকেও খেলাপি ঋণের হার ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বল ঋণমানের চিত্র নয়; ব্যাংকিং খাতে ঋণ অনুমোদন, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার বড় পার্থক্যও সামনে আনে।

১০ ব্যাংকেই আটকে ৪ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা
মোট খেলাপি ঋণের কেন্দ্রীভবন সমস্যাটিকে আরও স্পষ্ট করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত জুনে মাত্র ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ পুরো ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশই রয়েছে এই ১০ প্রতিষ্ঠানে।

পরিমাণের হিসাবে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ ইসলামী ব্যাংকে—৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ এখন খেলাপি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকে, ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। সেখানে মোট ঋণের ৭৫ দশমিক ০৫ শতাংশ খেলাপি। ফলে খেলাপি ঋণের সমস্যা যে ব্যাংকভেদে ব্যাপকভাবে অসম, তা স্পষ্ট। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিপুল খেলাপি পুরো খাতের গড় হারকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করছে।

পুনরুদ্ধারই বড় পরীক্ষা
ব্যাংকভেদে খেলাপি ঋণের এই বিস্তর ব্যবধান থেকে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার—ঋণ বিতরণের পরিমাণের পাশাপাশি ঋণ অনুমোদনের মান, গ্রাহক যাচাই, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং পুনরুদ্ধার কাঠামোও ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। ফলে খেলাপি ঋণের হার কমানোই শেষ কথা নয়; বরং যেসব ঋণ ইতিমধ্যে অনাদায়ী হয়ে পড়েছে, সেগুলো কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে আদায় করা যায়, সেটিই এখন বড় পরীক্ষা। একই সঙ্গে নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ সৃষ্টি ঠেকাতে কঠোর যাচাই ও জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ খেলাপি ঋণের পাহাড় কমানো না গেলে ব্যাংকের তারল্য, মূলধন ও ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ আরও বাড়বে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতিতেই পড়বে।

কালের আলো/এম/এএইচ

মানবতাবিরোধী অপরাধ: ইনুর কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

আদালত প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:১৪ অপরাহ্ণ
মানবতাবিরোধী অপরাধ: ইনুর কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে দেওয়া কারাদণ্ডের ৫০০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ এ তথ্য জানিয়েছেন।

এর আগে গত ৫ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ তিনটি অভিযোগে ইনুকে ১০ বছর করে মোট ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেন। রায় ঘোষণার সময় তা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে উসকানি, নির্দেশনা, প্ররোচনা, সহায়তা এবং কুষ্টিয়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ১৮ জুলাই একটি বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে ইনু আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগে উসকানি দেন।

এ ছাড়া ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের সভায় তিনি উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় আন্দোলন দমনে সেনা মোতায়েন ও কারফিউ জারির মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোনের অভিযোগ

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০ জুলাই ইনু কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরি এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর কুষ্টিয়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ওই সময় কুষ্টিয়ায় গুলিতে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুত্তাকিন, মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। এ ছাড়া রাইসুল হকসহ আরও অনেকে আহত ও আটক-নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ

অভিযোগে আরও বলা হয়, আন্দোলন দমনের বিভিন্ন পর্যায়ে ইনু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার, আন্দোলনকারীদের আটক, নির্যাতন ও অন্যান্য দমনমূলক পদক্ষেপে সহায়তা করেন।

২৭ জুলাই একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। ২৯ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের সভায় উপস্থিত থেকেও আন্দোলন দমনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

মামলার একমাত্র আসামি করা হয় হাসানুল হক ইনুকে। তার বিরুদ্ধে ৩৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রের সঙ্গে ১ হাজার ৬৭৯ পৃষ্ঠার নথিপত্র এবং তিনটি অডিও ও ছয়টি ভিডিও ডকুমেন্ট উপস্থাপন করা হয়।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এবং আসামিপক্ষে সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী ছিলেন।

কালের আলো/এমএসআইপি