খুঁজুন
                               
, ,
           

শিক্ষায় সমতা, ক্ষমতায়নে পতন

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ
শিক্ষায় সমতা, ক্ষমতায়নে পতন

নারী-পুরুষের সমতার পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বড় ধাক্কা এসেছে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০২৬’-এ এক বছরের ব্যবধানে ৫৫ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। ১৪৫ দেশের মধ্যে এবার বাংলাদেশের অবস্থান ৭৯তম, যেখানে ২০২৫ সালে ছিল ২৪তম। তবে অবস্থানের এই পতনের মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।

  • নারী-পুরুষ বৈষম্যের বৈশ্বিক সূচকে এক বছরে ৫৫ ধাপ পেছাল বাংলাদেশ
  • সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব তলানিতে
  • অর্থনীতিতেও বাড়ছে ব্যবধান

প্রতিবেদনটি দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের লিঙ্গসমতার চিত্র একরৈখিক নয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি অব্যাহত থাকলেও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং শ্রমবাজারে নারীর অবস্থান দুর্বল হওয়ায় সামগ্রিক স্কোরে বড় পতন ঘটেছে। এবার বাংলাদেশের স্কোর ৭১ দশমিক ২ শতাংশ। গত বছর ছিল ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট। অবশ্য ২০০৬ সালের তুলনায় বর্তমান স্কোর এখনো ৮ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।

রাজনীতিতে ধস, সংসদে নারীর উপস্থিতি তলানিতে
সামগ্রিক পতনের সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যা রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সূচকে। এই খাতে বাংলাদেশের স্কোর ৭২ দশমিক ১ শতাংশ থেকে নেমে হয়েছে ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সঙ্গে অবস্থান তৃতীয় থেকে নেমে ১২তম হয়েছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব। ২০২৪ সালে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর গঠিত নতুন সংসদে নারীরা পেয়েছেন মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ আসন।

ডব্লিউইএফের হিসাবে, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদীয় নারী প্রতিনিধিত্বের সর্বনিম্ন সমতার স্কোর। এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯তম।

মন্ত্রিসভাতেও নারীর অংশগ্রহণ সীমিত—১৯ দশমিক ০৫ শতাংশ। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতায় কিছু উন্নতি আছে। গত দুই দশকে মন্ত্রিসভায় নারী-পুরুষ সমতার স্কোর ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।

রাজনৈতিক সূচকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী সরকারপ্রধানের দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৭৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নারী সরকারপ্রধান থাকার কারণে এই উপসূচকে বাংলাদেশ ২০১৯ সাল থেকে পূর্ণ সমতার স্কোর ধরে রেখেছে এবং যৌথভাবে প্রথম অবস্থানে রয়েছে। ফলে সংসদ ও মন্ত্রিসভায় নারীর প্রতিনিধিত্বের দুর্বলতা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সামগ্রিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।

অর্থনীতিতে ব্যবধান আরও স্পষ্ট
রাজনীতির পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ। এ খাতে স্কোর ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। ১৪৫ দেশের মধ্যে অবস্থান ১৪২তম—গত বছরের ১৪১তম অবস্থান থেকে আরও এক ধাপ নিচে। শ্রমবাজারের পরিসংখ্যান ব্যবধানটির গভীরতা স্পষ্ট করে। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৩৮ দশমিক ৪১ শতাংশ, পুরুষের ৭৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ২০০৬ সালে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের সমতার স্কোর যেখানে ৬১ দশমিক ১ শতাংশ ছিল, এবার তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৪৮ শতাংশে।

আয়ের ক্ষেত্রেও বৈষম্য প্রকট। নারীর আনুমানিক বার্ষিক আয় ৪ হাজার ৬৭০ ডলার, পুরুষের ১২ হাজার ৪৪০ ডলার। এক বছরে আয়-সমতার স্কোর কমেছে ১৫ শতাংশ পয়েন্ট। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নারীর অংশ মাত্র ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ; পেশাজীবী ও কারিগরি কর্মীদের মধ্যে তা ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

কর্মসংস্থানের ধরনও বৈষম্যের আরেকটি মাত্রা তুলে ধরে। নারী কর্মীদের ৯৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, পুরুষের ক্ষেত্রে হার ৭৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। আবার কর্মজীবী নারীদের ৫৪ দশমিক ০২ শতাংশ খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত, যেখানে পুরুষের হার মাত্র ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

শিক্ষায় সাফল্য, উচ্চশিক্ষায় রয়ে গেছে ফাঁক
অর্থনীতি ও রাজনীতির বিপরীতে শিক্ষায় বাংলাদেশের চিত্র ইতিবাচক। এই খাতে সমতার স্কোর ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ—বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০০৬ সালের তুলনায় স্কোর বেড়েছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় দেশ পূর্ণ সমতা অর্জন করেছে। তবে উচ্চশিক্ষায় ব্যবধান পুরোপুরি কাটেনি। নারীর ভর্তির হার ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ, পুরুষের ২৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ। সাক্ষরতার ক্ষেত্রেও নারীরা পিছিয়ে—নারীর হার ৭৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ, পুরুষের ৮১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

স্বাস্থ্য সূচকে স্থিতির পর বাস্তব চ্যালেঞ্জ
স্বাস্থ্য ও টিকে থাকার সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৯৬ শতাংশ। স্কোর অপরিবর্তিত থাকলেও অবস্থান ১২৩তম থেকে উঠে ১২০তম হয়েছে। জন্মের সময় নারী-পুরুষের অনুপাতের সূচকে বাংলাদেশ পূর্ণ সমতা অর্জন করেছে। তবে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত আয়ুতে সামান্য ব্যবধান রয়েছে—নারীর ৬২ দশমিক ৯৮ বছর, পুরুষের ৬৩ দশমিক ১৪ বছর।

প্রতিবেদনের অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য আরও কিছু গভীর সমস্যা সামনে আনে। ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ নারীর বাল্যবিবাহ হয় এবং ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ নারী জীবদ্দশায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন। দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে সন্তান প্রসবের হার ৫৯ শতাংশ। প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা ১১৫।

দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ, কিন্তু আঞ্চলিক অগ্রগতি ধীর
সামগ্রিক র‌্যাঙ্কিংয়ে বড় পতন হলেও আঞ্চলিক তুলনায় বাংলাদেশ এখনো এগিয়ে। মালদ্বীপ ১১৯তম, নেপাল ১২০তম, ভুটান ১২১তম, শ্রীলঙ্কা ১২৯তম, ভারত ১৩১তম এবং পাকিস্তান ১৪৩তম অবস্থানে রয়েছে। তবে এই অবস্থানকে সামগ্রিক সাফল্যের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। কারণ ডব্লিউইএফের সূচক মূলত নারী-পুরুষের ব্যবধান কতটা কমেছে, তা পরিমাপ করে; নারীর জীবনমানের সামগ্রিক মূল্যায়ন নয়। বাংলাদেশের বর্তমান চিত্রে তাই একই সঙ্গে দুটি বাস্তবতা স্পষ্ট—শিক্ষায় সমতার কাছাকাছি পৌঁছানো এবং স্বাস্থ্যসূচকে স্থিতিশীলতা; বিপরীতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অর্থনৈতিক সুযোগে গভীর বৈষম্য।

ডব্লিউইএফের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান গতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় নারী-পুরুষের ব্যবধান পুরোপুরি দূর হতে আরও ১৪৯ বছর লাগতে পারে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই শুধু বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান নয়; শিক্ষা থেকে অর্জিত অগ্রগতি কীভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিল, শ্রমবাজার এবং আয়-সুযোগে নারীর বাস্তব অংশগ্রহণে রূপান্তরিত হবে, সেটিই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

এম/এএইচ

অবরোধের জেরে সাজেক বন্ধ, পর্যটকদের জন্য সময় বেঁধে দিল প্রশাসন

রাঙামাটি সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০৩ পূর্বাহ্ণ
অবরোধের জেরে সাজেক বন্ধ, পর্যটকদের জন্য সময় বেঁধে দিল প্রশাসন

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেল ৪টার মধ্যে এলাকা ছেড়ে নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বুধবার সন্ধ্যায় রাঙামাটির  জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ সাজেক
জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। বর্তমানে পর্যটন এলাকায় অবস্থানরত সবাইকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাজেক ত্যাগ করে নিরাপদে গন্তব্যে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের এই নির্দেশের ফলে সাজেকে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা পর্যটকদের আপাতত সেখানে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পর্যটনকেন্দ্রটি পুনরায় চালুর বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকতে হবে।

সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা
এদিকে বুধবার বিকেলে সাজেক সড়কে আবারও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি। সংগঠন দুটি বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) থেকে এই কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়। সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা এবং সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বুধবারের মধ্যেই পর্যটকদের সাজেক ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।

জরুরি যানবাহন অবরোধের আওতামুক্ত
সংগঠন দুটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে। তবে অবরোধের সময় জরুরি ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ি, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন এবং সংবাদপত্র বহনকারী যান চলাচলের ক্ষেত্রে ছাড় থাকবে। সংবাদ সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত সাংবাদিকদের গাড়িও অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে। সাজেক সড়কে নতুন করে অবরোধের ঘোষণার পরই পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধের সিদ্ধান্ত জানাল প্রশাসন। ফলে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এলাকা ছাড়তে বলা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ থাকবে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

ভোটার তালিকায় মৃত ঘোষণা, অথচ প্রতিবছর ভোট দিচ্ছেন তিনি!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫২ পূর্বাহ্ণ
ভোটার তালিকায় মৃত ঘোষণা, অথচ প্রতিবছর ভোট দিচ্ছেন তিনি!

ভারতের ভোটার তালিকায় মৃত হিসেবে নাম উঠেছে ৫৩ বছর বয়সী কামতা প্রসাদের। অথচ তিনি বেঁচে আছেন, নিয়মিত কাজ করছেন এবং বছরের পর বছর ভোটও দিয়েছেন। জীবিত থাকা সত্ত্বেও সরকারি নথিতে মৃত হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় এবার নিজের অস্তিত্ব ও ভোটাধিকার প্রমাণ করতে সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে দিল্লির এই দর্জিকে।

ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রম ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের মধ্যে কামতা প্রসাদের ঘটনাটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ভোটার তালিকা হালনাগাদের প্রক্রিয়া নিয়ে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তার এই ভোগান্তির কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে দিল্লিতেই বাদ পড়েছেন প্রায় ৪২ লাখ ভোটার।

নাম ও পরিচয়ে ভুল, তালিকায় মৃত কামতা
কামতা প্রসাদের নাম ভোটার তালিকায় ‘কান্তা প্রসাদ’ হিসেবে লেখা হয়েছে। নতুন তালিকায় তাকে মৃত দেখানো হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের ভোটার হওয়া সত্ত্বেও নিজের পরিচয় সংশোধন এবং ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরে পেতে তাকে প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। একজন জীবিত নাগরিককে সরকারি নথিতে মৃত হিসেবে চিহ্নিত করার ঘটনা ভোটার তালিকা সংশোধনের নির্ভুলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নামের ভুল, তথ্য যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা কিংবা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে কোনো ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লে তাকে নিজের পরিচয় প্রমাণের জন্য দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।

১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়া নিয়ে বিতর্ক
ভারতে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। দিল্লিতেও বাদ পড়েছেন প্রায় ৪২ লাখ ভোটার। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ায় প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিজেপি নির্বাচনে সুবিধা পেতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে নিম্ন আয়ের মানুষ
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বিশেষভাবে সামনে এসেছে। প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাব, ঠিকানা যাচাই এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেকের পক্ষে নিজেদের ভোটার পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কার পাশাপাশি সরকারি রেশন ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক সুবিধা পাওয়া নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের সামর্থ্য সীমিত, তাদের জন্য সরকারি দপ্তরে বারবার যাতায়াত করা বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

নাম ফেরানোর সুযোগ থাকলেও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভোগান্তি
বিতর্কের মধ্যে বাদ পড়া ভোটারদের তথ্য পুনরায় যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। যাদের নাম তালিকা থেকে বাদ গেছে, তারা আবেদন করে নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে আবেদন, নথিপত্র সংগ্রহ এবং পরিচয় যাচাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনেকের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কামতা প্রসাদের ঘটনাও সেই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। জীবিত একজন নাগরিককে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে হচ্ছে, অথচ তার ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত হওয়ার কথা ছিল নির্ভুল সরকারি নথির মাধ্যমেই।

ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন
কামতা প্রসাদের ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির নাম ভুলভাবে নথিভুক্ত হওয়ার বিষয় নয়। এটি ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার সুরক্ষার প্রশ্ন সামনে এনেছে।নির্বাচন পরিচালনার জন্য ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম ভুলবশত বাদ পড়লে তার দায় ও ভোগান্তি শেষ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিককেই বহন করতে হয়। তাই তালিকা সংশোধনের পাশাপাশি বাদ পড়া ভোটারদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কামতা প্রসাদের মতো কেউ যেন জীবিত থেকেও সরকারি নথিতে মৃত হয়ে না থাকেন, তা নিশ্চিত করতে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় নির্ভুলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

লাল সিঁদুরে রাঙা মুখ, বিদায়ের অশ্রু

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:২৭ অপরাহ্ণ
লাল সিঁদুরে রাঙা মুখ, বিদায়ের অশ্রু

ঢাকের বোল, শঙ্খের ধ্বনি আর উলুধ্বনিতে চারপাশ মুখর। কারও মুখ সিঁদুরে রাঙা, কারও চোখে বিদায়ের অশ্রু। আনন্দ আর বিষাদের এমন মায়াবী মেলবন্ধনের মধ্য দিয়েই বিদায় নিলেন দেবী দুর্গা। পাঁচ দিনের পূজা-অর্চনা, উৎসব আর মিলনমেলার পর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব।

দেবীকে শেষবারের মতো প্রণাম জানাতে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভিড় করেন ভক্তরা। দশমীর আনুষ্ঠানিকতা, দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলা ঘিরে মণ্ডপগুলোতে ছিল উৎসবের আমেজ। তবে বিদায়ের মুহূর্ত ঘনিয়ে আসতেই আনন্দের আড়ালে অনুভূত হয় বিচ্ছেদের বেদনা।

  • ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে বুড়িগঙ্গার ঘাট—দেবীবরণ
  • সিঁদুর খেলা ও প্রতিমা বিসর্জনে শেষ শারদীয় দুর্গোৎসব
  • দেবী দুর্গাকে বিদায় জানিয়ে আগামী বছরের অপেক্ষায় ভক্তরা

বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে বিশেষ পূজা ও অঞ্জলি নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা। ভক্তরা ধূপ, দীপ, বেলপাতা ও নানা পূজাসামগ্রী দিয়ে দেবীর চরণে শেষ অর্ঘ্য নিবেদন করেন। প্রার্থনায় উঠে আসে পরিবার-পরিজনের মঙ্গল, সুস্বাস্থ্য, দেশ ও জাতির শান্তি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রত্যাশা।

সিঁদুরে রাঙা উৎসব, চোখে বিদায়ের জল
পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে শাস্ত্রীয় রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন হয় দর্পণ বিসর্জন ও ঘট বিসর্জন। এরপর শুরু হয় দেবীবরণ ও ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলা। বিবাহিত নারীরা দেবী দুর্গার কপাল ও চরণে সিঁদুর ছুঁইয়ে প্রণাম করেন। পান ও মিষ্টি নিবেদনের মধ্য দিয়ে জানান বিদায়ী শ্রদ্ধা।

পরে একে অপরের কপাল ও মুখে সিঁদুর মাখিয়ে আনন্দ ভাগ করে নেন তাঁরা। কারও মুখে হাসি, কারও চোখে জল—লাল সিঁদুরে রাঙা মন্দির প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে আবেগের এক অনন্য দৃশ্যপট। উৎসবের শেষ দিনের এই আচার ঘিরে নারীদের মধ্যে দেখা যায় আন্তরিকতা, শুভকামনা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির প্রকাশ। ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি তাপস কুমার পাল জানান, দশমীর পূজা ও অঞ্জলি শেষে নিয়ম অনুযায়ী দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় পূজার সমাপ্তি হয়। এরপর ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুকুরে ঘট বিসর্জন দেওয়া হয় এবং সবশেষে অনুষ্ঠিত হয় সিঁদুর খেলা।

তিনি বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সপ্তমীতে চক্ষুদানের মধ্য দিয়ে প্রতিমায় দেবীর উপস্থিতি আহ্বান করা হয়। আর দশমীতে দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে। সিঁদুর খেলা বিজয়া দশমীর একটি ঐতিহ্যবাহী আচার, যার সঙ্গে স্বামীর দীর্ঘায়ু ও পরিবারের কল্যাণ কামনার বিশ্বাস জড়িয়ে আছে।

ঢাকের তালে শোভাযাত্রা, গন্তব্য ওয়াইজঘাট
মন্দিরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে শুরু হয় বিজয়া শোভাযাত্রা। ঢাকের বাদ্য আর ভক্তদের জয়ধ্বনিতে মুখর শোভাযাত্রা বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটের দিকে এগিয়ে যায়।

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতৃত্বে শোভাযাত্রায় অংশ নেন অসংখ্য ভক্ত। নদীঘাটে পৌঁছে ধর্মীয় আচার মেনে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। জলে প্রতিমা বিলীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয় এবারের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক আয়োজন। বিসর্জনের সময় অনেক ভক্তকে দেবীর উদ্দেশে প্রণাম জানাতে এবং আগামী বছর আবার ফিরে আসার প্রার্থনা করতে দেখা যায়। তাঁদের বিশ্বাস, দেবী দুর্গা কৈলাসে ফিরে গেলেও তাঁর আশীর্বাদ ও কল্যাণের প্রত্যাশা থেকে যায় মানুষের মনে।

রাজধানীতে ২৫৮ মণ্ডপে দুর্গোৎসব
সনাতন পঞ্জিকা ও উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর রাজধানীতে ২৫৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে ঢাকার নির্ধারিত ১১টি ঘাটে ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। পাঁচ দিনের এই উৎসবকে ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপে পূজা, অঞ্জলি, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে সেই ব্যস্ততা ও আনন্দের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল।

বিদায়ের সুরে আগামী বছরের প্রতীক্ষা
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে, দুর্গাপূজা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। দেবী দুর্গার আগমন মানুষের মনে জাগায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, কল্যাণ ও ন্যায়ের প্রত্যাশা। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মণ্ডপের আলো নিভলেও ভক্তদের মনে রয়ে যায় উৎসবের স্মৃতি। সিঁদুরের রং মুছে যাবে, ঢাকের আওয়াজ থেমে যাবে, কিন্তু দেবীকে ঘিরে প্রার্থনা ও বিশ্বাস থেকে যাবে অটুট। তাই বিজয়া দশমী শুধু বিদায়ের দিন নয়, এটি আবার ফিরে পাওয়ার আশারও দিন। বিষাদমাখা কণ্ঠে ভক্তদের প্রার্থনা—আগামী বছর আবার এসো মা, শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণের বার্তা নিয়ে।

কালের আলো/জেএন/এমকে