জন্মনিবন্ধন নিতে গিয়ে কোনো নাগরিককে যেন ইউনিয়ন পরিষদে দিনের পর দিন ঘুরতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। তিনি বলেছেন, জনগণের সেবা করাই নির্বাচিত সরকারের প্রধান দায়িত্ব। জনগণ সরকারের কাছে যে প্রত্যাশা নিয়ে ভোট দেয়, তা পূরণে জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ের গ্র্যান্ড বলরুমে জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম উপস্থিত ছিলেন।
জন্মনিবন্ধনে ভোগান্তি বন্ধের নির্দেশ
গ্রামীণ এলাকার সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা তুলে ধরে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষ একটি জন্মনিবন্ধন সনদ পাওয়ার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে দিনের পর দিন ঘুরেও সেবা পান না। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে মানুষের সুবিধা-অসুবিধা দেখা এবং তাদের প্রত্যাশা পূরণ করাই সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কোনো নাগরিককে একটি সাধারণ সেবা পাওয়ার জন্য বারবার সরকারি দপ্তরে ঘুরতে হবে—এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম সুষ্ঠু ও নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের নিয়ে আলোচনা করা হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আগামী দিনে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব
মন্ত্রী বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে জনগণের কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করা তাঁদের দায়িত্ব। স্থানীয় সরকারের কোনো প্রতিনিধি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত এর দায় সরকারের ওপরই বর্তায়। তাই জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে জনপ্রতিনিধিদের আরও দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।
সরকারি কর্মকর্তা ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বের পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারি চাকরিজীবীরা চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ বছর দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পান। অন্যদিকে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মেয়াদ পাঁচ বছর। পাঁচ বছর পর তাঁদের আবার জনগণের মুখোমুখি হতে হয় এবং নিজেদের কাজের প্রমাণ দিয়ে পুনরায় নির্বাচিত হতে হয়।
এ কারণে জনপ্রতিনিধিদের কাজের গুরুত্ব ও জবাবদিহি অনেক বেশি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জনগণের সেবায় ব্যবহারের আহ্বান
ড. আবদুল মঈন খান বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি—সবার মূল উদ্দেশ্য জনগণের সেবা করা। পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকলেও জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে উভয়ের একই লক্ষ্য থাকা উচিত।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জনগণের সেবায় ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের হাতে যে ক্ষমতা রয়েছে, তা মানুষের সেবা করার কাজে ব্যবহার করতে হবে। জনগণের সেবা বাধাগ্রস্ত করার জন্য নয়, মানুষের প্রয়োজন পূরণ এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করা উচিত।
জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে তথ্যের অসঙ্গতি
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমকে জাতীয় প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, দেশের প্রকৃত জনসংখ্যার সঙ্গে নিবন্ধন তথ্যভান্ডারে থাকা তথ্যের বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। প্রায় ১৯ কোটি মানুষের দেশে নিবন্ধন ডাটাবেজে এর চেয়ে অনেক বেশি মানুষের তথ্য থাকা উদ্বেগের বিষয়।
এই অসঙ্গতি দূর করে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও নির্ভুল, সুশৃঙ্খল ও বিশ্বাসযোগ্য করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, শুধু কম্পিউটার বা প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই মানুষের সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রযুক্তির পেছনে থাকা মানুষকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। একটি সাধারণ জন্মসনদ পেতে কোনো নাগরিককে যেন ইউনিয়ন পরিষদে বারবার যেতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, বাংলাদেশে যেসব গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদান রয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) ফারাহ শাম্মী, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ডেলিগেশন, ঢাকার হেড অব ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ড. মিখাল ক্রেজা এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি জিলিয়ান মেলসপসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আলোচনায় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানো, সেবার মান বাড়ানো এবং নিবন্ধন তথ্যভান্ডারকে নির্ভুল করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
Array