এক বছরে মৃত্যু ৫ হাজার, নাকি ৯ হাজার? সড়ক দুর্ঘটনার তথ্যে বড় ফারাক
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর কত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, কতজন আহত হচ্ছেন—এ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের ব্যবধান। কোনো সংস্থার হিসাবে এক বছরে নিহতের সংখ্যা পাঁচ হাজারের কিছু বেশি, আবার অন্য সংস্থার হিসাবে তা ছাড়িয়ে যাচ্ছে নয় হাজার। তথ্যের এই অসামঞ্জস্যের কারণে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র নিরূপণ এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় সেন্ট্রাল ডাটাবেজ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন যুব সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা গেলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা এবং প্রাণহানি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সরকারের প্রতি এ আহ্বান জানানো হয়।
এক বছরের দুর্ঘটনার হিসাবে বড় ব্যবধান
বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫ হাজার ৪৯০ জন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, একই বছরে ৬ হাজার ৭২৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯ হাজার ১১১ জন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮১২ জন।
আরেকটি পরিসংখ্যানে ২০২৫ সালে ৭ হাজার ৫৮৪টি দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। একই বছরের দুর্ঘটনা ও হতাহতের পরিসংখ্যানে এমন পার্থক্য সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়নকে জটিল করে তুলছে।
২০২৪ সালেও মেলেনি মৃত্যুর হিসাব
২০২৪ সালের পরিসংখ্যানেও সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা গেছে। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ৫ হাজার ৩৮০ জন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে এ সংখ্যা ৮ হাজার ৫৪৩ জন। আর রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৭ হাজার ২৯৪ জন।
অর্থাৎ, একই বছরের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হিসাবেও সংস্থাভেদে কয়েক হাজার মানুষের ব্যবধান রয়েছে। দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, নথিভুক্তকরণ ও যাচাইয়ের পদ্ধতিতে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে এমন পার্থক্য তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবেও বড় পার্থক্য
দেশীয় সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক হিসাবেও বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে বড় ব্যবধান দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) *গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি ২০২৩* অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দেশীয় সরকারি হিসাবের সঙ্গে আন্তর্জাতিক এ অনুমানের পার্থক্য দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও সমন্বয়ের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও হিসাবের আওতা এক না হলে পরিসংখ্যানে পার্থক্য দেখা দিতে পারে। তাই সড়ক নিরাপত্তার প্রকৃত চিত্র বুঝতে তথ্যের উৎস ও পদ্ধতি যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কেন প্রয়োজন জাতীয় সেন্ট্রাল ডাটাবেজ
যুব সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা মনে করেন, বিচ্ছিন্ন ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিসংখ্যানের পরিবর্তে একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা জরুরি। সেখানে প্রতিটি দুর্ঘটনার স্থান, সময়, ধরন, সংশ্লিষ্ট যানবাহন, সড়কের অবস্থা এবং নিহত ও আহত ব্যক্তিদের তথ্য সংরক্ষণ করা হলে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা ও ঝুঁকির কারণ শনাক্ত করা সহজ হবে।
এ ধরনের তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে কোন ধরনের সড়কে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে, কোন যানবাহন বেশি দুর্ঘটনায় জড়িত হচ্ছে এবং কোন পরিস্থিতিতে প্রাণহানি বাড়ছে—তা বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তামূলক উদ্যোগের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যেতে পারে।
বিআরটিএ, পুলিশ ও হাসপাতালের তথ্য সমন্বয়ের প্রস্তাব
কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ কার্যকর করতে বিআরটিএ, পুলিশ, হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, দুর্ঘটনা নথিভুক্ত করার অভিন্ন মানদণ্ড প্রণয়ন এবং হতাহত ব্যক্তিদের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে তথ্যের নির্ভুলতা যাচাই, বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। দুর্ঘটনার তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরিচয় সুরক্ষিত রেখে নিয়মিত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা প্রতিবেদন প্রকাশের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
জবাবদিহি ও কার্যকর পরিকল্পনায় গুরুত্ব
যুব সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের মতে, কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা জানার মাধ্যম নয়; সড়ক নিরাপত্তায় নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কার্যকারিতা মূল্যায়নেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আহ্ছানিয়া মিশন ইয়ুথ ফোরাম ফর হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িংয়ের সমন্বয়কারী মারজানা মুনতাহা, বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশনের সদস্য মো. ইস্তিয়াক ইমন, মিশন গ্রিন বাংলাদেশের সদস্য মো. ইফরাত হোসাইন, স্বেচ্ছাসেবক সমন্বয়কারী মো. আরমান হোসাইন রায়েদ এবং বাংলাদেশ মেডিকেল স্টুডেন্ট সোসাইটির সদস্য নওশীন নাওয়ার আচল এ আহ্বান জানান। এ দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল স্টুডেন্ট সোসাইটি, লাল সবুজ সোসাইটি, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, আমরাই আগামী, ক্লাইমেট কানেক্টস ও বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই। তাই জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে একটি কার্যকর জাতীয় সেন্ট্রাল ডাটাবেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমন্বিত, জবাবদিহিমূলক ও প্রমাণভিত্তিক সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]