বিএসসির বহরে যুক্ত হচ্ছে ‘বাংলার প্রগতি’ ও ‘বাংলার নবযাত্রা’; বছরে আয় হবে ১৫০ কোটি টাকা
কালের আলো রিপোর্ট:
৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার নিজস্ব অর্থে দু’টি জাহাজ কিনছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। এ বিষয়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি নামক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। আগামী মাসেই যুক্ত হচ্ছে নতুন একটি জাহাজ। ডিসেম্বরের মধ্যে আসবে আরেকটি জাহাজ। আধুনিক বাল্ক ক্যারিয়ারের জাহাজ দু’টির নামকরণ করা হয়েছে ‘বাংলার প্রগতি’ ও ‘বাংলার নবযাত্রা’। জাহাজ দুটি কেনার বিষয়ে রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাতে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছরেই জাহাজ দু’টি বিএসসিকে হস্তান্তর করা হবে।
৫৫ থেকে ৬৬ হাজার টন ধারণক্ষমতার নতুন এই দু’টি কার্গো জাহাজ দিয়ে বছরে বিএসসির আয় হবে আনুমানিক ১৫০ কোটি টাকা। সেই সঙ্গে, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি তৈরি হবে নাবিকদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। দুই জাহাজে পালাক্রমে বছরে ১৫০ নাবিকের কর্মসংস্থান হবে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক।
- হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি নামক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর
- জাহাজ দু’টি কেনায় ব্যয় হচ্ছে ৯৩৫ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা
- দুই জাহাজে পালাক্রমে বছরে কর্মসংস্থান হবে ১৫০ নাবিকের
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নৌপরিবহন উপদেষ্টা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম বিএসসির নিজস্ব অর্থায়নে জাহাজ কেনা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে দেশের শিপিং ইন্ডাস্ট্রিতে এটি একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। নতুন দুই জাহাজ বিএসসিতে যুক্ত হলে বছরে ১৫০ কোটি টাকা আয় বাড়বে। বিএসসির নিজস্ব পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডিডব্লিউটি বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের সমুদ্র বাণিজ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হবে। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব গ্রিন শিপিংয়ের সম্মান অর্জন করবে।’

বিএসসি সূত্র জানায়, প্রতিযোগিতামূলক দরে জাহাজ কেনার এই প্রক্রিয়া শুরু হয় গত জুনে। ৩ জুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। এরপর কারিগরিভাবে দুটি প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। সে অনুযায়ী, গত আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি নামক প্রতিষ্ঠান থেকে ৯৩৫ কোটি ৭০ লক্ষ টাকায় জাহাজ দুটি কেনার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। জাহাজ দুটি থেকে বছরে বাড়তি ১৫০ কোটি টাকা আয় হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে তিনি বলেন, বিএসসির বহরে যুক্ত হতে যাওয়া জাহাজগুলোতে জ্বালানি খরচ হ্রাস ও পরিচালন দক্ষতা বেশি। প্রধান ইঞ্জিন থেকে নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গমন কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যা পরিবেশ দুষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। নকশা ও প্রযুক্তিগত সমাধানগুলো জ্বালানি সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ডসম্মত এবং আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থার নির্ধারিত সর্বশেষ পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করে।
জাহাজে উচ্চমানের ইউরোপীয় ও জাপানি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে। জার্মান লাইসেন্সে জাহাজগুলো চীনে উৎপাদন করা হয়েছে। স্পেনের পাম্প ও নরওয়ের কম্প্রেসার ব্যবহার করা হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রথম জাহাজ অক্টোবর ২০২৫ এবং দ্বিতীয় জাহাজ ডিসেম্বর ২০২৫-এ বিএসসিকে হস্তান্তর করা হবে বলেও জানানো হয় অনুষ্ঠানে।
বিএসসি জানায়, বিএসসি সরকারি অর্থায়নে আরও তিনটি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ জন্য এখন প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন করা হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তিনটি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া শেষ করতে চায় সংস্থাটি। বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, শিপইয়ার্ডে নির্মাণাধীন থাকা জাহাজই কেনা হবে সামনে। এতে খুব দ্রুত বিএসসির বহর সমৃদ্ধ হবে।
- বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব গ্রিন শিপিংয়ের সম্মান অর্জন করবে
বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন
উপদেষ্টা
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়
জানা যায়, বিএসসির বহরে বর্তমানে পাঁচটি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি তেল পরিবহনকারী ট্যাংকার এবং দুটি সাধারণ পণ্য পরিবহনের বাল্ক জাহাজ। নতুন দুটি বাল্ক জাহাজ যুক্ত হলে বিএসসির বহরে জাহাজের সংখ্যা বেড়ে সাতটিতে উন্নীত হবে। তাতে দেশের পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১০২।

এক সময় দেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক পতাকাবাহী জাহাজের মালিক ছিল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন। নব্বইয়ের দশকে বহরে ছিল ৩৪টি জাহাজ। কিন্তু পুরনো জাহাজ কেনা, অনিয়ম, আর দুর্নীতির কারণে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে এই বহর। ২০১৮ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে নতুন ৬টি জাহাজ পেয়ে লাভের ধারায় ফিরলেও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ নামে একটি জাহাজ হারায় বিএসসি। সবশেষ গত বছর অগ্নি দুর্ঘটনায় দু’টি অয়েল ট্যাংকার পরিত্যক্ত হলে বিএসসির জাহাজ কমে দাঁড়ায় ৫টিতে।
২০১৮ সালে চীন থেকে চারটি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া চললেও নানা জটিলতায় হয়নি ঋণ চুক্তি। তাই এক বছর আগে প্রথমবারের মতো নিজস্ব অর্থে জাহাজ কেনার উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এতে ব্যয় হবে ৯০০ থেকে ৯৫০ কোটি টাকা। ৫৫ থেকে ৬৬ হাজার টন ধারণক্ষমতার দু’টি বাল্ক কার্গো জাহাজ সরবরাহে দরপত্র দাখিল করেছে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান।
দেশিয় পতাকাবাহী জাহাজ কম থাকায় পণ্য পরিবহনে বছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে বাইরে। নতুন কেনা দু’টি জাহাজ দিয়ে বছরে ১৫০ কোটি টাকা আয়ের প্রত্যাশা কর্তৃপক্ষের। বর্তমানে বহরে থাকা পাঁচটি জাহাজের মধ্যে তিনটি অয়েল ট্যাংকার ও দু’টি কার্গো জাহাজ। যেগুলোর ধারণক্ষমতা ৩৯ হাজার টন। গেলো বছরে সবোর্চ্চ ২৫০ কোটি টাকা মুনাফা করে বিএসসি।
আরও জানা যায়, ১৯৭২ সালের জুনে ‘এমভি বাংলার দূত’ জাহাজ চালুর মাধ্যমে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যবসা শুরু করে বিএসসি। ১৯৮২ সাল নাগাদ জাহাজ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭, যা পরে ৩৮টিতে উন্নীত হয়। তবে ১৯৯১ সালের পর এই সংস্থার বহরে নতুন কোনো জাহাজ যুক্ত হয়নি।
অন্যদিকে বেসরকারি মালিকানায় রয়েছে ৯৫টি জাহাজ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৮টি জাহাজের মালিক কেএসআরএম গ্রুপ। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) ২৫টি ও আকিজ শিপিংয়ের ১০টি জাহাজ আছে। সংখ্যায় বিএসসির অবস্থান ষষ্ঠ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বহরে কনটেইনার থেকে শুরু করে সাধারণ পণ্যবাহী ও তেল-গ্যাস পরিবহনকারী জাহাজ রয়েছে।

বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি পণ্যের বড় অংশই সমুদ্রপথে আনা-নেওয়া করা হয়, যা প্রতিবছরই বাড়ছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১৩ কোটি টন পণ্য পরিবহন হয়। কনটেইনার, তেল পরিবহনকারী ও সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজে এসব পণ্য পরিবহন হয়। যদিও পণ্যের বড় অংশই পরিবহন হচ্ছে বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজে। কারণ, বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা কম।
কালের আলো/এমএএএমকে



আপনার মতামত লিখুন
Array