খুঁজুন
                               
, ,
           

বিএসসির বহরে যুক্ত হচ্ছে ‘বাংলার প্রগতি’ ও ‘বাংলার নবযাত্রা’; বছরে আয় হবে ১৫০ কোটি টাকা

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ১১:২৭ অপরাহ্ণ
বিএসসির বহরে যুক্ত হচ্ছে ‘বাংলার প্রগতি’ ও ‘বাংলার নবযাত্রা’; বছরে আয় হবে ১৫০ কোটি টাকা

কালের আলো রিপোর্ট:

৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার নিজস্ব অর্থে দু’টি জাহাজ কিনছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। এ বিষয়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি নামক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। আগামী মাসেই যুক্ত হচ্ছে নতুন একটি জাহাজ। ডিসেম্বরের মধ্যে আসবে আরেকটি জাহাজ। আধুনিক বাল্ক ক্যারিয়ারের জাহাজ দু’টির নামকরণ করা হয়েছে ‘বাংলার প্রগতি’ ও ‘বাংলার নবযাত্রা’। জাহাজ দুটি কেনার বিষয়ে রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাতে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছরেই জাহাজ দু’টি বিএসসিকে হস্তান্তর করা হবে।

৫৫ থেকে ৬৬ হাজার টন ধারণক্ষমতার নতুন এই দু’টি কার্গো জাহাজ দিয়ে বছরে বিএসসির আয় হবে আনুমানিক ১৫০ কোটি টাকা। সেই সঙ্গে, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি তৈরি হবে নাবিকদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। দুই জাহাজে পালাক্রমে বছরে ১৫০ নাবিকের কর্মসংস্থান হবে।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক।

  • হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি নামক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর
  • জাহাজ দু’টি কেনায় ব্যয় হচ্ছে ৯৩৫ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা
  • দুই জাহাজে পালাক্রমে বছরে কর্মসংস্থান হবে ১৫০ নাবিকের

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নৌপরিবহন উপদেষ্টা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম বিএসসির নিজস্ব অর্থায়নে জাহাজ কেনা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে দেশের শিপিং ইন্ডাস্ট্রিতে এটি একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। নতুন দুই জাহাজ বিএসসিতে যুক্ত হলে বছরে ১৫০ কোটি টাকা আয় বাড়বে। বিএসসির নিজস্ব পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডিডব্লিউটি বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের সমুদ্র বাণিজ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হবে। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব গ্রিন শিপিংয়ের সম্মান অর্জন করবে।’

বিএসসি সূত্র জানায়, প্রতিযোগিতামূলক দরে জাহাজ কেনার এই প্রক্রিয়া শুরু হয় গত জুনে। ৩ জুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। এরপর কারিগরিভাবে দুটি প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। সে অনুযায়ী, গত আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি নামক প্রতিষ্ঠান থেকে ৯৩৫ কোটি ৭০ লক্ষ টাকায় জাহাজ দুটি কেনার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। জাহাজ দুটি থেকে বছরে বাড়তি ১৫০ কোটি টাকা আয় হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে তিনি বলেন, বিএসসির বহরে যুক্ত হতে যাওয়া জাহাজগুলোতে জ্বালানি খরচ হ্রাস ও পরিচালন দক্ষতা বেশি। প্রধান ইঞ্জিন থেকে নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গমন কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যা পরিবেশ দুষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। নকশা ও প্রযুক্তিগত সমাধানগুলো জ্বালানি সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ডসম্মত এবং আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থার নির্ধারিত সর্বশেষ পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করে।

জাহাজে উচ্চমানের ইউরোপীয় ও জাপানি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে। জার্মান লাইসেন্সে জাহাজগুলো চীনে উৎপাদন করা হয়েছে। স্পেনের পাম্প ও নরওয়ের কম্প্রেসার ব্যবহার করা হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রথম জাহাজ অক্টোবর ২০২৫ এবং দ্বিতীয় জাহাজ ডিসেম্বর ২০২৫-এ বিএসসিকে হস্তান্তর করা হবে বলেও জানানো হয় অনুষ্ঠানে।

বিএসসি জানায়, বিএসসি সরকারি অর্থায়নে আরও তিনটি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ জন্য এখন প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন করা হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তিনটি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া শেষ করতে চায় সংস্থাটি। বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, শিপইয়ার্ডে নির্মাণাধীন থাকা জাহাজই কেনা হবে সামনে। এতে খুব দ্রুত বিএসসির বহর সমৃদ্ধ হবে।

  • বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব গ্রিন শিপিংয়ের সম্মান অর্জন করবে
    বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন
    উপদেষ্টা
    নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়

জানা যায়, বিএসসির বহরে বর্তমানে পাঁচটি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি তেল পরিবহনকারী ট্যাংকার এবং দুটি সাধারণ পণ্য পরিবহনের বাল্ক জাহাজ। নতুন দুটি বাল্ক জাহাজ যুক্ত হলে বিএসসির বহরে জাহাজের সংখ্যা বেড়ে সাতটিতে উন্নীত হবে। তাতে দেশের পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১০২।

এক সময় দেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক পতাকাবাহী জাহাজের মালিক ছিল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন। নব্বইয়ের দশকে বহরে ছিল ৩৪টি জাহাজ। কিন্তু পুরনো জাহাজ কেনা, অনিয়ম, আর দুর্নীতির কারণে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে এই বহর। ২০১৮ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে নতুন ৬টি জাহাজ পেয়ে লাভের ধারায় ফিরলেও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ নামে একটি জাহাজ হারায় বিএসসি। সবশেষ গত বছর অগ্নি দুর্ঘটনায় দু’টি অয়েল ট্যাংকার পরিত্যক্ত হলে বিএসসির জাহাজ কমে দাঁড়ায় ৫টিতে।

২০১৮ সালে চীন থেকে চারটি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া চললেও নানা জটিলতায় হয়নি ঋণ চুক্তি। তাই এক বছর আগে প্রথমবারের মতো নিজস্ব অর্থে জাহাজ কেনার উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এতে ব্যয় হবে ৯০০ থেকে ৯৫০ কোটি টাকা। ৫৫ থেকে ৬৬ হাজার টন ধারণক্ষমতার দু’টি বাল্ক কার্গো জাহাজ সরবরাহে দরপত্র দাখিল করেছে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান।

দেশিয় পতাকাবাহী জাহাজ কম থাকায় পণ্য পরিবহনে বছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে বাইরে। নতুন কেনা দু’টি জাহাজ দিয়ে বছরে ১৫০ কোটি টাকা আয়ের প্রত্যাশা কর্তৃপক্ষের। বর্তমানে বহরে থাকা পাঁচটি জাহাজের মধ্যে তিনটি অয়েল ট্যাংকার ও দু’টি কার্গো জাহাজ। যেগুলোর ধারণক্ষমতা ৩৯ হাজার টন। গেলো বছরে সবোর্চ্চ ২৫০ কোটি টাকা মুনাফা করে বিএসসি।

আরও জানা যায়, ১৯৭২ সালের জুনে ‘এমভি বাংলার দূত’ জাহাজ চালুর মাধ্যমে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যবসা শুরু করে বিএসসি। ১৯৮২ সাল নাগাদ জাহাজ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭, যা পরে ৩৮টিতে উন্নীত হয়। তবে ১৯৯১ সালের পর এই সংস্থার বহরে নতুন কোনো জাহাজ যুক্ত হয়নি।

অন্যদিকে বেসরকারি মালিকানায় রয়েছে ৯৫টি জাহাজ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৮টি জাহাজের মালিক কেএসআরএম গ্রুপ। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) ২৫টি ও আকিজ শিপিংয়ের ১০টি জাহাজ আছে। সংখ্যায় বিএসসির অবস্থান ষষ্ঠ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বহরে কনটেইনার থেকে শুরু করে সাধারণ পণ্যবাহী ও তেল-গ্যাস পরিবহনকারী জাহাজ রয়েছে।

বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি পণ্যের বড় অংশই সমুদ্রপথে আনা-নেওয়া করা হয়, যা প্রতিবছরই বাড়ছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১৩ কোটি টন পণ্য পরিবহন হয়। কনটেইনার, তেল পরিবহনকারী ও সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজে এসব পণ্য পরিবহন হয়। যদিও পণ্যের বড় অংশই পরিবহন হচ্ছে বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজে। কারণ, বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা কম।

কালের আলো/এমএএএমকে

পাবনা-টেকনাফ-কলমাকান্দায় পানিতে ডুবে ৬ শিশুর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৪ অপরাহ্ণ
পাবনা-টেকনাফ-কলমাকান্দায় পানিতে ডুবে ৬ শিশুর মৃত্যু

দেশের তিন জেলায় পানিতে ডুবে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) পাবনা, কক্সবাজার ও নেত্রকোনায় পৃথক এসব দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে পাবনায় তিন শিশু, কক্সবাজারের টেকনাফে দুই শিশু এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দায় এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

পাবনায় তিন শিশু

পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়নের নবীন বাজার এলাকার দাশপাড়া গ্রামে বাড়ির পাশের মাঠে জমে থাকা বর্ষার পানিতে গোসল করতে গিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলো—দাশপাড়া গ্রামের শিমুল মল্লিকের মেয়ে সুমি খাতুন (৭) এবং একই গ্রামের আশরাফুল ইসলামের ছেলে খালিদ হোসেন (৮) ও মেয়ে আফিয়া খাতুন (৬)। তারা স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থী ছিল।

স্থানীয়রা জানান, দুপুরে শিশুরা মাঠের জমে থাকা পানিতে গোসল করতে নামে। একপর্যায়ে একজন পানিতে তলিয়ে গেলে তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে বাকি দুজনও পানিতে ডুবে যায়। পরে স্থানীয়রা তিন শিশুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে পথেই তাদের মৃত্যু হয়।

টেকনাফে নাফ নদীতে দুই শিশু

কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপে নাফ নদীতে গোসল করতে নেমে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেটিঘাট এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলো—শাহপরীরদ্বীপ উত্তরপাড়া এলাকার মোহাম্মদ উল্লাহর ছেলে মোহাম্মদ নিশান (১২) ও কেফায়েত উল্লাহর ছেলে আরজিন (১০)।

তারা গোসল করতে নেমে পানিতে তলিয়ে নিখোঁজ হয়। স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে ও পরে কোস্টগার্ড সদস্যরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। প্রায় চার ঘণ্টা পর দুপুর ২টার দিকে তাদের উদ্ধার করা হয়। আরজিনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। নিশানকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

কলমাকান্দায় শিশুর মৃত্যু

নেত্রকোনার কলমাকান্দায় পুকুরের পানিতে ডুবে আব্দুল্লাহ নামে সাড়ে চার বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার উপজেলার চিনাহালা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহত আব্দুল্লাহ ওই এলাকার কাজল মিয়ার ছেলে। পরিবারের লোকজনের অজান্তে খেলতে গিয়ে সে পুকুরে পড়ে যায়। পরে স্বজনরা উদ্ধার করে কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পৃথক এসব দুর্ঘটনায় তিন এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

ব্যাংক খাতে বাড়ছে ‘নীরব’ ঝুঁকি

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:২৫ অপরাহ্ণ
ব্যাংক খাতে বাড়ছে ‘নীরব’ ঝুঁকি

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ও শ্রেণিকৃত ঋণের চাপ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; এটি ক্রমেই পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে। একদিকে বাড়ছে সমস্যাগ্রস্ত ঋণ, অন্যদিকে এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না অনেক ব্যাংক। ফলে কাগজে-কলমে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তার আড়ালে প্রকৃত ঝুঁকি আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুন ২০২৬ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ও বাস্তবে সংরক্ষিত প্রভিশনের মধ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর মোট শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।

শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মার্চ ২০২৬ শেষে ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। জুনে তা বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ এখন শ্রেণিকৃত। ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এত বড় অংশের ঋণ সমস্যাগ্রস্ত হয়ে পড়া শুধু ব্যাংকের মুনাফাকে চাপের মুখে ফেলছে না, বরং নতুন ঋণ বিতরণ, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

প্রভিশনের অর্ধেকও সংরক্ষণ হয়নি
খেলাপি বা শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দিতে ব্যাংককে আগেই অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। এর উদ্দেশ্য হলো—ঋণ শেষ পর্যন্ত আদায় না হলে যেন একবারে বড় ধাক্কা না আসে। কিন্তু এখানেই বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। বিপরীতে বাস্তবে সংরক্ষণ করা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ফলে প্রয়োজনীয় ও প্রকৃত প্রভিশনের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা। সম্ভাব্য ঋণক্ষতির যে পরিমাণ অর্থ ব্যাংকগুলোর আলাদা করে রাখার কথা, তার অর্ধেকের কিছু বেশি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে ব্যাংকগুলোর মুনাফার বড় অংশ ভবিষ্যৎ লোকসানের বিপরীতে আটকে রাখতে হবে। দুর্বল আয়, কম মূলধন ও বেশি খেলাপি ঋণের ব্যাংকগুলোর জন্য তা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বড় ঘাটতিতে বেসরকারি ব্যাংক
প্রভিশন ঘাটতির সবচেয়ে বড় অংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে। এ খাতের ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। বিপরীতে প্রকৃত প্রভিশন সংরক্ষণ হয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। ফলে বেসরকারি ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। মার্চে এই ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ৩১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। এটি মোট প্রভিশন ঘাটতির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। ফলে বেসরকারি ব্যাংক খাতেই বর্তমানে সবচেয়ে বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি এবং আয় কম, তাদের জন্য এই ঘাটতি পূরণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেও বড় চাপ
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থাও স্বস্তিদায়ক নয়। ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা। এর বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ৭৪ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। মার্চ ২০২৬ শেষে এ ঘাটতি ছিল ৭৪ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খুব বেশি না বাড়লেও ঘাটতির পরিমাণ ইতোমধ্যে বিপুল।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে শেষ পর্যন্ত সরকারি সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের দুর্বলতার বোঝা সরাসরি রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা ও জনগণের অর্থের ওপর পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

প্রকৃত ঝুঁকি আড়াল
একটি ব্যাংক যখন ঋণ দেয়, তখন সেটি ধরে নেয় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ওই অর্থ ফেরত আসবে। কিন্তু কোনো ঋণ আদায় হওয়ার সম্ভাবনা কমে গেলে ব্যাংককে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হয়। ধরা যাক, কোনো ব্যাংকের ১০০ কোটি টাকার ঋণের বড় অংশ আদায় হওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে। ভবিষ্যতে ওই অর্থ ফেরত না এলে ব্যাংক যেন হঠাৎ বড় লোকসানে না পড়ে, সে জন্য আগেই অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়।

প্রয়োজনীয় প্রভিশন না থাকলে ব্যাংকের হিসাবের খাতায় মুনাফা তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য লোকসানও জমতে থাকে। ফলে প্রভিশন ঘাটতি মূলত ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার ওপর একটি ‘স্থগিত চাপ’ তৈরি করে।

ছাড়ের নীতি সমস্যা আরও বাড়াচ্ছে
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, মূলধন ঘাটতির বড় কারণ খেলাপি ঋণ। তবে প্রকাশিত ঘাটতিও প্রকৃত চিত্রের পুরোটা তুলে ধরে না বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, অনেক ব্যাংক দেন-দরবারের মাধ্যমে মূলধন ঘাটতি শিথিল করে। একইভাবে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নানা নীতিগত ছাড় দেওয়া হচ্ছে।ব্যাংকগুলোও ঋণগ্রহীতার তথ্য যথাযথভাবে যাচাই, তদারকি ও ঝুঁকি মূল্যায়নে প্রয়োজনীয় কঠোরতা দেখাচ্ছে না।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, এক দশকের বেশি সময় ধরে এ ধরনের শিথিলতার পথ অনুসরণ করা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। বরং একসময় যে খেলাপি ঋণকে এক অঙ্কে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল, তা এখন স্বীকৃত হিসাবেই মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছেছে। স্বীকৃত নয় এমন সমস্যাগ্রস্ত ঋণ বিবেচনায় নিলে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

আমদানি-রপ্তানিতেও প্রভাব
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা কমে গেলে আমদানি-রপ্তানি লেনদেনে ঝুঁকি ও ব্যয় দুটিই বাড়তে পারে। ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এমন পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যে অনাস্থা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের রিস্ক প্রিমিয়াম এমনিতেই বিশ্বের মধ্যে উচ্চ—ব্যাংক খাতের দুর্বলতা আরও প্রকট হলে সেই ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংস্কার না হলে ছড়িয়ে পড়বে ঝুঁকি
ব্যাংক খাতের বর্তমান চিত্রের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—সমস্যাটি শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নেই। ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রভিশন ঘাটতি বলছে, সম্ভাব্য ক্ষতির একটি বড় অংশ এখনো ব্যাংকের হিসাবের বাইরে চাপ হিসেবে জমে আছে। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমে যেতে পারে, মূলধন আরও দুর্বল হতে পারে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা সংকুচিত হতে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে।

কালের আলো/এম/এএইচ

দেশের ভবিষ্যতের জন্য যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:২১ অপরাহ্ণ
দেশের ভবিষ্যতের জন্য যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী

দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে টেকসই করতে ভালো ও সৎ মানুষের রাজনীতিতে আসা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান।

তিনি বলেন, ভালো রাজনীতিবিদ তৈরি করতে না পারলে দেশের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যত স্বপ্নই দেখা হোক, তা টেকসই হবে না। মানসম্মত উন্নয়নের জন্য যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব প্রয়োজন।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সংসদ ভবনের এলডি হলে বরিশাল ডিভিশনাল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিডিজেএ) আয়োজিত ‘আগামীর বরিশাল বিভাগ: সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।

আন্দালিভ রহমান বলেন, ‘কোয়ালিটি ডেভেলপমেন্ট’ নিশ্চিত করতে হলে ভালো মানুষকে নেতৃত্বে আনতে হবে। গত ১৭ বছরে দেশে নেতৃত্বের বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। ভালো ও মেধাবী তরুণরা রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছে এবং রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এমনকি অনেক রাজনীতিবিদের সন্তানও রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী নয়।

তিনি বলেন, ভালো উপাদান থাকলেও দক্ষ বাবুর্চি ছাড়া যেমন ভালো খাবার তৈরি করা যায় না, তেমনি ভালো মানুষ নেতৃত্বে না এলে উন্নয়ন ও অগ্রগতির সুফল টেকসই করা সম্ভব নয়।

বরিশালের ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ফুটবল, রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বরিশাল ও এ অঞ্চলের মানুষ দেশের নেতৃত্ব দিয়েছে। পাকিস্তান আমল থেকে স্বাধীনতার পর পর্যন্ত এ অঞ্চল থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা উঠে এসেছেন।

তিনি বলেন, বরিশালকে সত্যিকার অর্থে স্বপ্নের নগরী ও স্বপ্নের শহরে পরিণত করতে হলে আগামী দিনে ভালো রাজনীতিবিদ তৈরি করতে হবে। এজন্য বরিশালসহ আশপাশের নির্বাচনি এলাকা ও জেলাগুলো থেকে মেধাবী তরুণ-তরুণীদের রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত করতে হবে এবং অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্যাস সরবরাহ ও শিল্পায়ন উন্নয়নের অংশ হলেও দেশের এখন প্রয়োজন মানসম্মত ও টেকসই উন্নয়ন। আর এ জন্য যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব অপরিহার্য।

তিনি বলেন, যারা বর্তমানে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছেন, তাদের দায়িত্ব হলো পরবর্তী প্রজন্মের যোগ্য ও মেধাবীদের রাজনীতিতে আসার পথ তৈরি করা। তরুণদের রাজনীতিতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি তাদের জন্য পরিবেশ সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ করতে হবে।

আন্দালিভ রহমান বলেন, আমরা হয়তো অনেক কিছু তৈরি করে যেতে পারব, কিন্তু ভালো নেতৃত্ব তৈরি করতে না পারলে সেগুলো ধরে রাখা সম্ভব হবে না। তাই ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বরিশাল থেকে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ অনেক বড় নেতা উঠে এসেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও এ অঞ্চল থেকে যোগ্য ও ভালো নেতৃত্ব সামনে আসতে হবে। দেশের মেধাবী ও শিক্ষিত তরুণদের কেউ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী বা সফটওয়্যার প্রকৌশলী হওয়ার পাশাপাশি রাজনীতিতে এসে দেশ পরিবর্তনের প্রত্যয় ব্যক্ত করলে সেটিই হবে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি