জনপ্রশাসন সচিব পদে আলোচনায় ৬ আমলার নাম
কালের আলো রিপোর্ট:
নানা বিতর্কের পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ১৩ মাসের মাথায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোখলেস উর রহমানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই তাকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে বদলি করা হয়। শূন্য হওয়া প্রশাসনের শীর্ষ এই গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসতে অনেক কর্মকর্তা জোর লবিং শুরু করেছেন। তবে সৌভাগ্যবান হিসেবে কে এই পদটিতে আসছেন তা নিয়ে বেশ জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে ৬ আমলার নাম। তাঁরা হলেন-স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী, ভূমি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব এ. এস. এম. সালেহ আহমেদ, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো.নজরুল ইসলাম, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব ড.নেয়ামত উল্লাহ ভুইয়া, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফ উদ্দিন ও সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. এহছানুল হক। যদিও এই পদে কে আসবেন এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা জাতিসংঘের অধিবেশন শেষে দেশে ফিরে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র।
জানা যায়, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত বছরের ২৮ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে মো. মোখলেস উর রহমানকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। মোখলেস উর রহমান বিসিএস প্রশাসন ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা। তিনি জনপ্রশাসন সচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রশাসনে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। পদায়ন ও পদোন্নতিতে বঞ্চিতদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ উঠে। সচিব, সংস্থাপ্রধান ও জেলা প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে। নিয়োগকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। কিন্তু তিনি দীর্ঘ সময় বহাল তবিয়তেই ছিলেন। যদিও তাঁর শেষ রক্ষা হয়নি। অবশেষে তাকে এই মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়েছে সরকার।
- গুরুত্বপূর্ণ এই পদে কে আসছেন, সে নিয়ে জল্পনা-কল্পনা প্রশাসনে
- চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূস
- জাতিসংঘের অধিবেশন শেষে দেশে ফিরলেই আসতে পারে সিদ্ধান্ত
সূত্র জানায়, মোখলেস উর রহমান’র দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এবার জনপ্রশাসন সচিব পদে সৎ, দক্ষ, যোগ্য ও জনপ্রশাসন বিষয়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিতে চায় সরকার। ‘সরকারের মেরুদণ্ড’ হিসেবে পরিচিত এই পদটিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন রকম আপস করতে চায় না সরকার। গোয়েন্দা প্রতিবেদনকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। খতিয়ে দেখা হবে সম্ভাব্যদের আমলনামা। মোখলেসকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সময়মতো পদোন্নতি ও ভালো পদায়ন পেয়েছেন এমন অনেক কর্মকর্তাকেও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
একই সূত্র জানায়, আসন্ন ত্রায়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনকে আরও গতিশীল করতে জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে দ্রুত সময়ের মধ্যেই নতুন মুখ আসছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কর্মকর্তাদের পদায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলবাজিতে পটুদের বিবেচনায় আনা হবে না। নির্বাচনের আগে এই রদবদলে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও দলবাজমুক্তদের প্রাধান্য দেওয়া হবে।
জনপ্রশাসন সচিব পদে সম্ভাব্যদের নাম আলোচনার টেবিলে
সচিবালয়ের বিভিন্ন পরিমণ্ডলে জনপ্রশাসন সচিব পদে আলোচনার টেবিলে উচ্চারিত হচ্ছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী’র নাম। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বারবার তিনি পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন। যুগ্ম সচিব থাকাকালে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তাঁর ভাগ্যে পদোন্নতি জুটেনি। এমনকি কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে অধস্তন করেও রাখা হয়েছিল তাকে। দীর্ঘ সময় বঞ্চিত থেকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রথমে তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও পরে পদোন্নতি দিয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়। এরপর তাকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিসিএস ১৩তম ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তা জনপ্রশাসনে সৎ ও দক্ষ হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন। জনপ্রশাসন সচিব হওয়ার দৌড়ে তিনি এগিয়ে থাকায় তাকে জামায়াতপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে ‘ট্যাগ’ দেওয়া হলেও তিনি মূলত নিরপেক্ষতার সঙ্গে নিজের অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন।
একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সপ্তম ব্যাচের কর্মকর্তা ভূমি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব এ. এস. এম. সালেহ আহমেদ নতুন জনপ্রশাসন সচিব হতে পারেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মাঠ প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি পদোন্নতি বঞ্চিত হন। ২০২০ সালের ১ জুলাই তিনি যুগ্ম সচিব হিসেবে অবসরে যান। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তাকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হিসেবে পদায়ন করে। ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর এই সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রশাসন নিয়ে তাঁর গভীর জানাশোনা রয়েছে। ফলে তাঁর নিয়োগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিতে নারাজ অনেকেই।
এই পদটিতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো.নজরুল ইসলামের কথাও শোনা যাচ্ছে। চলতি বছরের ২৭ মার্চ তিনি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন। এর আগে তিনি পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব ছিলেন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) ক্যাডারের একাদশ ব্যাচের এই কর্মকর্তাকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পদোন্নতি বঞ্চিত রাখা হয়। এ সময়কালে বিভিন্ন পৌরসভায় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তাকে পদায়ন করা হয়। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালে তাকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগে পদায়ন করা হয়। তিনিও জনপ্রশাসন সচিব পদে লবিইংয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।
জনপ্রশাসন সচিব পদে আলোচনায় রয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব ড.নেয়ামত উল্লাহ ভুইয়াও। চলতি বছরের বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব জামিলা শবনম সই করা এক প্রজ্ঞাপনে তাকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে তিনি ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগে যোগদান করেন। মাগুরা ও মাদারীপুরে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (ডিএম) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৫ সাল থেকে তিনি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রকল্পে এবং ঢাকায় বিশ্বব্যাংক কার্যালয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী টিমের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়াও এই পদে শোনা যাচ্ছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফ উদ্দিনের নাম। ২০২৪ সালের ২৭ মে তিনি এই পদে দায়িত্ব পালনের আগে বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) রেক্টরের (সচিব) দায়িত্ব পালন করেন।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. এহছানুল হকের নাম জনপ্রশাসন সচিব হিসেবে সচিবালয়ের সর্বত্রই আলোচনা হচ্ছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এই সচিব আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসরে গিয়েছিলেন। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ওই সময় পদোন্নতি পাননি। ২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদের একান্ত সচিব হওয়ায় পতিত আওয়ামী লীগ সরকার তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তাকে চাকরিতে ফিরিয়ে এনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের দায়িত্ব দেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে শেষতক কে নিয়োগ পাবেন এটি একান্তই নির্ভর করছে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূস’র মনোভাবের ওপর।
কালের আলো/এমএএএমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array