পাহাড় অশান্তে দায়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী ইউপিডিএফ
কালের আলো রিপোর্ট:
হঠাৎ অশান্ত হয়ে উঠেছে দেশের পাহাড়ি অঞ্চল। দিন চারেক আগে খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী একজন উপজাতি মেয়েকে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির ধর্ষণের অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই জেলা খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি। ধর্ষিতার বাবার থানায় সাধারণ ডায়েরির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সেনাবাহিনী সন্দেহভাজন শয়ন শীলকে (১৯) গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করলেও পরিকল্পিতভাবে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) পাহাড়কে অশান্ত করে তুলে।
ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে প্রচুর গুজব ছড়িয়েছে দীর্ঘ সময় পাহাড়ের ‘আপদ’ এই সন্ত্রাসী সংগঠনটি। যা পরিস্থিতিকে অবনতির দিকে টেনে নিয়েছে। ফেসবুকে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানোর পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতাও চালাতে থাকে তারা। ইউপিডিএফ’র দায়িত্বশীল বিভিন্ন নেতা টেলিফোনের মাধ্যমে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার নির্দেশনার মাধ্যমে আগুনে ঘি ঢালেন। শেষ পর্যন্ত শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) বেলা দুইটায় খাগড়াছড়ি জেলার সদর উপজেলা ও পৌরসভা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে জেলা প্রশাসন। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ১৪৪ ধারা বলবৎ থাকার কথা জানানো হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) দিকেই অভিযোগের তীর
এক পাহাড়ি কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় সহিংসতার সূচনা করে ইউপিডিএফ সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)। গত বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে খাগড়াছড়ি সদরস্থ শাপলা চত্বরে জুম্ম ছাত্র-জনতা এর ব্যানারে কথিত ধর্ষণের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন রাঙ্গামাটিতে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন এর যৌথ উদ্যোগে প্রতিবাদ সভা আয়োজিত হয়।
- পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) দিকেই অভিযোগের তীর
- প্রথম থেকেই ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে সরকার ও সেনাবাহিনী
- খাগড়াছড়িতে সকাল-সন্ধ্যা অবরোধে দুর্ভোগ, ককটেল বিস্ফোরণ; ১৪৪ ধারা
- থমথমে পাহাড়, সম্প্রীতির অটুট বন্ধনে জোর
পরদিন বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ইউপিডিএফ সমর্থিত উপজাতি ছাত্র জনতার ব্যানারে খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আধাবেলা হরতালের কর্মসূচি পালিত হয়। এদিন ইউপিডিএফ সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা খাগড়াছড়িগামী চারটি বাসের পথ রোধ করে বাসের গ্লাস ভাংচুর করে ও সড়কে গাছ ফেলে সড়ক বন্ধ করে বাসগুলো আটকে দেয়। এছাড়া তারা একটি মোটরসাইকেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। পাশাপাশি খাগড়াছড়ি সদর, গুইমারা, মানিকছড়ি, রামগড় ও দিঘিনালা উপজেলায় ইউপিডিএফ সমর্থিত উপজাতি নেতাকর্মী গাছের গুড়ি ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে ইউপিডিএফ সমর্থিত জুম্ম ছাত্র জনতার উদ্যোগে ধর্ষণ বিরোধী মহাসমাবেশ উপলক্ষ্যে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ মাঠে ১২’শ থেকে ১৩’শ লোক জমায়েত করা হয়। ওইদিন সকাল ১১টার পর সমাবেশ শুরু হলে বেলা সাড়ে ১২টার সময় সমাবেশের পাশ দিয়ে যাওয়া সেনাবাহিনীর একটি গাড়ির উপর উদ্দেশ্যমূলকভাবে আক্রমণ করে। এসময় সেনাবাহিনীর একটি পিকআপ গাড়ি ভাংচুর করা হয়। এতে ৪ জন সেনাসদস্য আহত হয়।
প্রথম থেকেই ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে সরকার ও সেনাবাহিনী
পুরো ঘটনাকার সময়ে প্রথম থেকেই সরকার, সেনাবাহিনী ও পুলিশ অত্যন্ত ধৈর্যের পরিচয় দেয়। ঘটনার অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ইউপিডিএফ পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় দেওয়ার চেষ্টা করে। সকল বাহিনী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কোন প্রতিবাদ বা কর্মসূচিতে বাধা প্রদান করেনি । কিন্তু বারবার বিভিন্ন অজুহাতে সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার অপপ্রয়াস দেখা যায়। এছাড়াও কোন কারণ ছাড়াই সেনাবাহিনীর গাড়ির উপর আক্রমণ ও সেনাসদস্যদের আহত করা হয়েছে। চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে সেনাবাহিনী কোন বল প্রয়োগ না করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।
খাগড়াছড়িতে সকাল-সন্ধ্যা অবরোধে দুর্ভোগ, ককটেল বিস্ফোরণ
চলমান পরিস্থিতিতে ইস্যু তৈরি করে পাহাড়কে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে ইউপিডিএফ। এদিন সকাল থেকেই ইউপিডিএফ এর সমর্থনে খাগড়াছড়ি জেলায় সকাল-সন্ধ্যা অবরোধ পালিত হয়। এসময় সাজেকে হাজার খানেক পর্যটক আটকা পরেন। তাদের সেনাবাহিনী সহায়তা করে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। সকাল থেকেই জেলার খাগড়াছড়ি সদর, গুইমারা, মানিকছড়ি, রামগড় ও দিঘিনালা উপজেলায় ইউপিডিএফ সমর্থিত উপজাতি নেতাকর্মী গাছের গুড়ি ফেলে ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এর ফলে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ ও অশান্তি নেমে আসে। এছাড়াও বিভিন্ন স্কুল ও হাসপাতালের রোগীদের অসনীয় দুর্ভোগ-ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। একই রকমের ঘটনা ঘটে রাঙ্গামাটিতেও।

পরবর্তীতে শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টার দিকে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা পরিষদের সামনের দোকানে বাঙালিদের দেখে ইউপিডিএফ (প্রসিত) সমর্থিত সংগঠনের অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ২৫ জন উপজাতি সন্ত্রাসী ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটায়। ঘটনার আকস্মিকতায় বাঙালিরা দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়। পরবর্তীতে বাঙালি ৬০ থেকে ৭০ জন সংঘবদ্ধ হয়ে উপজাতি সন্ত্রাসীদের ধাওয়া দিলে উপজাতি সন্ত্রাসীরা নারানখিয়া এলাকায় অবস্থান নেয় এবং পরপর ৮ থেকে ১০টি ককটেল বিস্ফোরণ করে। সন্ধ্যা পর্যন্ত পাহাড়ি-বাঙালিদের ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া চলমান ছিল। এর মধ্যে দুপুর ২টার দিকে জেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করলেও উভয় পক্ষ এটি প্রতিপালনে বিরত থাকে। পরবর্তীতে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সহায়তায় সন্ধ্যা নাগাদ পরিস্থিতি শান্ত হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ইউপিডিএফ (প্রসিত) এর প্ররোচনায় তাদের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন বিশেষ করে পিসিপি সম্পূর্ণ উস্কানিমূলকভাবে দাঙ্গা লাগানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এই ঘটনা ছাড়াও আগেও তারা একই ধরণের ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা চালিয়েছে। সম্পূর্ণ বিষয়টিকে ইউপিডিএফ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টির একটি অপপ্রয়াস বলেই অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাঙালিরা।

থমথমে পাহাড়, সম্প্রীতির অটুট বন্ধনে জোর
পাহাড়ে দুষ্কৃতকারী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কর্মকাণ্ডে ও সহিংসতা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। এখনও পাহাড়ি জনপদ থমথমে। সম্প্রীতির বন্ধন যেন নষ্ট না হয়, সেজন্য সবাইকে শান্ত থাকা উচিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এ দেশ সবার। ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। আবহমানকালের সংস্কৃতিও তাই বলে। আমরা সেই ঐতিহ্যকে হারাতে চাই না। চাই না ধর্ম ও সম্প্রদায় নিয়ে হোক কলহ। আমাদের চেতনা হোক-মানবতার, মানবিকতার ও সর্বজনীনতার। আমাদের ধরণিতল হোক কলঙ্কশূন্য। বাংলাদেশ নবচেতনায় জাগ্রত হোক, এই প্রত্যাশার কথা উচ্চারিত হচ্ছে কণ্ঠে কণ্ঠে।
কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে



আপনার মতামত লিখুন
Array