ভারতের ষড়যন্ত্রে রক্তাক্ত পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টির মূল আয়োজক ইউপিডিএফ
কালের আলো রিপোর্ট:
পাহাড়ি এক কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় রক্ত ঝরছে অশান্ত পাহাড়ে। থমথমে পাহাড়ে রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় প্রশাসনের ১৪৪ ধারা ভেঙে ‘জুম্ম-ছাত্র জনতা’র ব্যানারে অবরোধ পালনকালেই ঘটে সংঘর্ষ। খাগড়াছড়ির গুইমারায় ইউপিডিএফ’র সন্ত্রাসীদের ভারী অস্ত্রের গুলিতে নিহত হয়েছেন তিনজন। আহত হয়েছেন গুইমারা জোনের টুআইসিসহ ১২ জন সেনাসদস্য। আগুন দেওয়া হয়েছে ইউপিডিএফ (মূল বা প্রসিত) দলের খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা-গুইমারা উপজেলা সংগঠক ঝিমিত চাকমার নিয়ন্ত্রণাধীন গুইমারা রামেসু বাজারে। বাজারে আগুন দেওয়ার ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ভয়ানক হয়ে উঠেছে ক’দিন আগেও নীরব থাকা এই সবুজ উপত্যকা। এ ঘটনায় ঝিমিত চাকমা ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জেএসএস (সংস্কার) দলকে গোলাগুলির ঘটনার জন্য সরাসরি দায়ী করেছেন।
এদিকে, দুষ্কৃতকারীদের হামলায় তিনজন পাহাড়ি নিহত, ১২ জন সেনাসদস্য, গুইমারা থানার ওসিসহ তিনজন পুলিশ সদস্য এবং আরও অনেকে আহতের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গভীর দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, আগের দিন শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাতে সকল দলমতের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আলোচনায় খাগড়াছড়ি সদর এলাকায় অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণার পর পুনরায় ফেসবুকের মাধ্যমে রাত পৌনে একটায় অবরোধ আহ্বানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে সন্দেহ-সংশয়। আইন ভাঙার এমন বেআইনি নজিরের মাধ্যমে হানাহানির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে পাহাড়কে।
বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ইউপিডিএফ’র সন্ত্রাসীরা পাহাড়ের উঁচু অবস্থান থেকে সংঘর্ষরত জনতাকে গুলি করে হত্যা করলেও তাঁরা উল্টো নিহতের ব্যাপারে সেনাবাহিনীকেই দোষারোপ করার চেষ্টা করছে। যদিও সেনাবাহিনী ইউপিডিএফ’র ফাঁদে পা দেয়নি। তাঁরা ধৈর্য্যরে সঙ্গেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। ইউপিডিএফ’র স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতী অস্ত্রের এমন ব্যবহার নিশ্চিত করেছে তাঁরাই পরিকল্পিতভাবে পার্বত্য অঞ্চলে অশান্তি সৃষ্টির মূল আয়োজক। বছরের পর বছর পার্বত্য চট্টগ্রামে নীরবে সাধারণ মানুষের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে বাঁধা সৃষ্টির মাধ্যমে সবুজ পাহাড়ে ভাঁজে ভাঁজে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে এই সন্ত্রাসীরাই।
- ১৪৪ ধারা ভেঙে ‘জুম্ম-ছাত্র জনতা’র ব্যানারে অবরোধ পালনকালেই ঘটে সংঘর্ষ
- ইউপিডিএফ’র সন্ত্রাসীদের ভারী অস্ত্রের গুলিতে নিহত হয়েছেন তিনজন
- আঘাতের পরেও মারমুখী জনতাকে নিবৃত্ত করতে ফাঁকা গুলি সেনাবাহিনীর
- শান্তি ও সম্প্রীতির পাহাড়ে সন্ত্রাসবাদে মদদ প্রতিবেশী দেশের
এই সন্ত্রাসীদের দমাতে ‘শান্তির দূত’ সেনাবাহিনী কাজ করছে প্রতিনিয়ত। অন্যান্যবারের মতো এবারও গণ্ডগোল পাঁকিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টার অংশ হিসেবে প্রতিবেশী দেশ ভারত পাহাড়কেই মূল লক্ষ্যবস্তু করেছে। নানা বাহানায় তাদের ষড়যন্ত্রে এক্ষেত্রে নতুন নতুন চোরাগলি তৈরি করছে ইউপিডিএফ। রোববারের (২৮ সেপ্টেম্বর) ঘটনায় তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে জেএসএস (সংস্কার)। অন্তত ইউপিডিএফ (মূল বা প্রসিত) দলের খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা-গুইমারা উপজেলা সংগঠক ঝিমিত চাকমার বক্তব্য থেকেই এসব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
পাহাড়ি উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে উস্কানি দিচ্ছে ইউপিডিএফ
অবরোধ প্রত্যাহারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুনরায় অবরোধের ডাক পাহাড়কে অশান্তের নেপথ্য কারণ হিসেবেই মনে করছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে স্থানীয় প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করলেও ইউপিডিএফ সমর্থিত ‘জুম্ম-ছাত্র জনতা’র অবরোধ পালনকে ঘিরেই মূলত পাহাড়ের পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমাও গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে বলেছেন,-‘আজকে যেটা হলো, আমার কাছে ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক মনে হচ্ছে। ১৪৪ ধারা জারির পরও এমন ঘটনা ঘটার কথা ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী তিনজনের বেশি মানুষ জড়োই হতে পারবে না। অথচ সেখানে দল বেঁধে মানুষ মিছিল করেছে।’ রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে খাগড়াছড়িতে স্কুলছাত্রী ধর্ষণ ও পরবর্তী অবরোধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আয়োজিত বিশেষ আইনশৃঙ্খলা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপদেষ্টা বলেন, ‘পাহাড়ে শুধুমাত্র সরকারি বাহিনীর কাছেই অস্ত্র থাকবে। এর বাইরে কারও কাছে অস্ত্র থাকতে পারবে না। জানমালের ক্ষয়ক্ষতি রোধে এবং পরিস্থিতি শান্ত রাখতে প্রশাসনকে আরও কঠোর থাকতে হবে।’
জানা যায়, রোববারের (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল হতেই খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ি উচ্ছৃঙ্খল জনতা ইউপিডিএফ এর প্রত্যক্ষ উস্কানিতে টায়ার জ্বালিয়ে এবং গাছের গুড়ি দিয়ে সড়ক অবরোধ করে। সকাল আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে সেনাবাহিনীর টহল দল গুইমারার রামেসু বাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ সরানোর সময় ৫০ থেকে ৬০ জন পাহাড়ি সেনাবাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এর কিছুক্ষণ পরে আরও ২০০ থেকে ৩০০ পাহাড়ি সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে সেনাবাহিনীর টহল দলের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় সেনাবাহিনীর গুইমারা জোনের টুআইসিসহ ১২ জন সেনাসদস্য আহত হয়। বাঙালিদের ১০ থেকে ১২টি বাড়িতে আগুনও দিয়েছে পাহাড়িরা। এছাড়াও সকালে স্থানীয় রামগড় এলাকায় বিজিবি টহল দল সড়ক অবরোধ সরানোর সময় উচ্ছৃঙ্খল পাহাড়ি-জনতার সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। উচ্ছৃঙ্খল পাহাড়িদের ছুঁড়ে মারা ইটের আঘাতে বিজিবির একজন কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়।
আঘাতের পরেও মারমুখী জনতাকে নিবৃত্ত করতে ফাঁকা গুলি সেনাবাহিনীর
দু’দফায় ইট-পাটকেল নিক্ষেপের মাধ্যমে সেনাসদস্যদের আহত করলেও অত্যন্ত ধৈর্য্যরে সঙ্গে পরিস্থিতি মোকবিলার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী প্রথমে মাইকিং করে উচ্ছৃঙ্খল পাহাড়ি সমাবেশকে সরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। উচ্ছৃঙ্খল জনতা সরে না যাওয়ায় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে সেনাবাহিনী লাঠিচার্জ করে। উচ্ছৃঙ্খল জনতা এ সময়ে আরও মারমুখী হয়ে উঠে। বাধ্য হয়েই সেনা টহল দল ১০ থেকে ১৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে উচ্ছৃঙ্খল পাহাড়ি জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে।
- নিয়ম অনুযায়ী তিনজনের বেশি মানুষ জড়োই হতে পারবে না, অথচ সেখানে দল বেঁধে মানুষ মিছিল করেছে
সুপ্রদীপ চাকমা
উপদেষ্টা
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়
এরপর পুনরায় বাঙালি ও পাহাড়ি উভয়ের মধ্যেই সংঘর্ষের মাত্রা তীব্র হয়। গুইমারার রামেসু বাজারে এলাকায় বেশ কয়েকটি স্থানে ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ করা হয়। বেলা সোয়া ১টার দিকে ইউপিডিএফ এর সন্ত্রাসীরা পাহাড়ের উঁচু অবস্থান থেকে সংঘর্ষরত জনতার উপর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের মাধ্যমে ১০০ থেকে ১৫০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। এতে তিনজন নিহত হওয়ার কথা জানা গেলেও এসব হত্যাকাণ্ডে সেনাবাহিনীর ঘাড়ে দায় চাপানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অথচ সব সময় পাহাড়ে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে নিরবচ্ছিন্ন কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রেখেছে সেনাবাহিনী।
শান্তি ও সম্প্রীতির পাহাড়ে সন্ত্রাসবাদে মদদ প্রতিবেশী দেশের
পার্বত্য চট্টগ্রামে হানাহানির অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান হয়নি। পার্বত্য অঞ্চলকে লাভজনক সন্ত্রাসবাদের ‘দোকান’ হিসেবে গড়ে তুলতে মরিয়া প্রতিবেশী দেশ ভারত। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পাহাড় নিয়ে নতুন খেলায় মেতে উঠেছে দেশটি। পতিত সরকারের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে সাঙ্গপাঙ্গদের আশ্রয় দেওয়া ওই দেশটি পাহাড়কে অস্থিতিশীল করে তোলার পায়তাঁরা করছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর প্রতিবিপ্লবী কামর পাহাড়ে দাঁত বসানোর চেষ্টা করেছে বারবার। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির মাধ্যমে ইউপিডিএফসহ অন্যান্য সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে পাহাড়িদের উসকে দিচ্ছে। কিন্তু তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে উঠেছে দেশপ্রেমী বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দেশমাতৃকার সেবায় নিয়োজিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা পার্বত্য চট্টগ্রামে নানাবিধ মানবিক কর্মযজ্ঞ এবং শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। পাহাড়ে শান্তি-সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ এই সদস্যদের কাঁধে রোববারের (২৮ সেপ্টেম্বর) তিন হত্যাকাণ্ডের দায় চাপানোর অপচেষ্টার মাধ্যমেই পরিস্কার পাহাড়ে অশান্তি ও বিরোধ বাধানোর মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীই পড়শি এই দেশের প্রাইম টার্গেট।
কালের আলো/এমএসএএকে/এসআইপি


আপনার মতামত লিখুন
Array