খাগড়াছড়িতে মেডিকেল পরীক্ষায় মেলেনি ‘ধর্ষণের আলামত’, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর অপচেষ্টার নেপথ্যে ইউপিডিএফ
বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
খাগড়াছড়িতে এক মারমা কিশোরীকে কথিত দলবদ্ধ ‘ধর্ষণের’ ঘটনায় ব্যাপক সহিংসতায় অশান্ত হয়েছে পাহাড়। কিন্তু ৬দিন পর ওই কিশোরীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদনে ‘ধর্ষণের কোনো আলামত পাননি’ পরীক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়া চিকিৎসক। তিন সদস্যের এই মেডিকেল টিমের প্রতিবেদনে আলামত পরীক্ষার ১০টি সূচকের সবকটিতে স্বাভাবিক লেখা রয়েছে। অথচ কথিত এই ধর্ষণের ঘটনাকে পুঁজি করে পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর অপচেষ্টা করেছে।
মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে খাগড়াছড়ি সেনানিবাসে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়েও খাগড়াছড়িতে সাম্প্রতিক সহিংসতার জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী করেছেন সেনাবাহিনীর খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, ধর্ষণের ঘটনাকে পুঁজি করে সাধারণ পাহাড়ি নারী ও কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করছে সংগঠনটি। এসব কর্মসূচিতে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দিয়ে দেশীয় ও অটোম্যাটিক (স্বয়ংক্রিয়) অস্ত্রে ফায়ারিং (গুলি) করা হচ্ছে। একই দিন পৃথক সংবাদ সম্মেলনে প্রায় একই রকম অভিযোগ করেছেন সেনাবাহিনীর গুইমারা রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল কালাম শামসুদ্দিন রানা।
- আলামত পরীক্ষার ১০টি সূচকের সবকটিতে স্বাভাবিক
জয়া চাকমা
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ
খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতাল
এদিকে, ধর্ষণের আলামত পরীক্ষায় তিন চিকিৎসক দলটির প্রধান খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ জয়া চাকমা গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমরা মেডিকেলে রির্পোট জমা দিয়েছি। সবধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছি। কিন্তু আসলে ধর্ষণের কোনো আলামত পাইনি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের টিমে হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার মোশারফ হোসেন ও নাহিদা আকতার ছিলেন।’ স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদনের একটি কপি এসেছে কালের আলো.কম ও দৈনিক সন্ধানী বার্তার হাতে। এর আগে মামলার এজাহারে ভুক্তভোগীর বাবা জানান, ঘটনার রাতে প্রাইভেট পড়ে ফেরার পথে নিখোঁজ হয় মেয়েটি। পরে অচেতন অবস্থায় ক্ষেত থেকে উদ্ধার করার পর তাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একজনকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী।
কল্পিত এই ধর্ষণের ঘটনাকে ইস্যু করে খাগড়াছড়িতে সহিংসতা ও নৈরাজ্য শুরু করে পাহাড়ের ‘আপদ’ হিসেবে পরিচিত ইউপিডিএফ। ১৪৪ ধারা জারির পাশাপাশি অতিরিক্ত সেনা ও বিজিবি মোতায়েনের পরও তাঁরা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। রোববার ১৪৪ ধারার মধ্যেই গুইমারায় ব্যাপক সহিংসতার নেপথ্যে ছিল এই সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। সেখানে পাহাড়ি-বাঙালিদের সংঘর্ষ চলা অবস্থায় পাহাড়ের উঁচু স্থান থেকে স্বয়ক্রিয় অস্ত্রের মাধ্যমে গুলি বর্ষণ করে তিনজনকে হত্যা করে ইউপিডিএফ। মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) গুইমারায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের সময় সহিংসতার ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় জেলা প্রশাসক এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার। অন্যদিকে, খাগড়াছড়ির অশান্ত পরিস্থিতির জন্য একদিন আগে ভারত ও পলাতক ফ্যাসিস্টদের ইন্ধন রয়েছে বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
কিশোরীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদনে যা উল্লেখ রয়েছে
ধর্ষণের আলামত পরীক্ষায় তিন সদস্যের চিকিৎসক দলের নেতৃত্ব দেন খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ জয়া চাকমা। তিন পৃষ্ঠার রিপোর্টে ধর্ষণের লক্ষণ পাওয়া যায় এমন ১০টি সূচকের কোনটিতে মেলেনি আলামত। সবগুলোই স্বাভাবিক। শরীরের ভেতরে-বাইরে কোথাও ধর্ষণের চিহ্ন পায়নি চিকিৎসক দল। রিপোর্টে স্বাক্ষর করেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ জয়া চাকমা, মেডিকেল অফিসার মীর মোশারফ হোসেন ও নাহিদা আকতার।

- বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দিয়ে দেশীয় ও অটোম্যাটিক অস্ত্রে গুলি করা হচ্ছে
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান মাহমুদ
রিজিয়ন কমান্ডার, খাগড়াছড়ি
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করা এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির বিষয়টি একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করা এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির বিষয়টি একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে করেন খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, এসবের প্রমাণাদি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আছে। নানা অপপ্রচার ও উসকানির মধ্যেও সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব ও অবিচ্ছেদ্য অংশ রক্ষায় সবকিছু করবে। উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গাপূজা চলছে জানিয়ে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, সবাই যেন এই উৎসবে স্বতস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে পারে সে সুযোগটি আমরা করে দিচ্ছি। রিজিয়ন কমান্ডার ইউপিডিএফকে দেশের স্বার্থে অবরোধ প্রত্যাহার করে পরিস্থিতি শান্ত রাখার আহ্বান জানান।
- পাহাড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে দায়ী ইউপিডিএফ
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল কালাম রানা
রিজিয়ন কমান্ডার, গুইমারা
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
পৃথক এক সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনীর গুইমারা রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল কালাম রানা বলেন, ‘পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো বিশেষ করে ইউপিডিএফ আমাদের এই এলাকায় সকল ধরণের সশস্ত্র সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও পাহাড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে দায়ী। আমরা সব সময় তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান পরিচালনা করি। তাদেরকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে এই এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা আমরা সব সময় চালিয়ে যাচ্ছি। এটি অব্যাহত থাকবে।’
কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array