‘সেফ এক্সিট’ আলোচনা ও বিতর্ক তুঙ্গে
কালের আলো রিপোর্ট:
দেশের রাজনীতিতে ‘সেফ এক্সিট’ বিতর্ক শুরু হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের দেওয়া বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সূত্রপাত হয়েছে এই বিতর্কের। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘…অনেক উপদেষ্টা নিজেদের আখের গুছিয়েছেন, অথবা গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে বিট্রে (প্রতারণা) করেছেন। যখন সময় আসবে, তখন আমরা এদের নামও উন্মুক্ত করবো।’ যদিও নাহিদ কোন উপদেষ্টার নাম উচ্চারণ করেননি। তবে এরপর থেকেই ডালপালা মেলতে শুরু করে আলোচনা-সমালোচনা। আদতে কোন কোন উপদেষ্টার দিকে তীর ছুঁড়লেন এনসিপির এই শীর্ষ নেতা, এ নিয়ে শোরগোল পড়েছে রাজনীতির অন্দর-বাইরে। বিষয়টি নিয়ে ‘চুপ’ থাকতে পারেননি উপদেষ্টাদের অনেকেই। একের পর এক উপদেষ্টারা এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। তারা সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা কোন এক্সিট খুঁজছেন না। বাকি জীবন তাঁরা দেশেই থাকবেন।
তবে ‘সেফ এক্সিট’ প্রশ্নে এনসিপি নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি বা দুঃখিতও হয়নি। তবে এই একটি বক্তব্যে রীতিমতো তোলপাড় চলছে রাজনীতিতে। পর্দার আড়ালে কী কিছু ঘটতে যাচ্ছে, এ নিয়ে বিস্তর কানাঘুষা। মূলধারার গণমাধ্যমে নানা সংবাদ ও বিশ্লেষণ উঠে আসছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে বয়ানের কোন শেষ নেই। সঙ্গে গুজব ও গুঞ্জন তো আছেই। নাহিদের বক্তব্যের সমালোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরও এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমেরও এই প্রসঙ্গে বক্তব্য যেন আরও এক কাঠি সরেস! সম্প্রতি নওগাঁয় এক সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, ‘কিছু উপদেষ্টার মাঝে আমরা এই আচরণ দেখতে পাচ্ছি যে, তারা এখন কোনোভাবে দায়সারা দায়িত্বটা পালন করে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এক্সিট নিতে পারলেই হলো। দেশে থাকুন আর দেশের বাইরে থাকুন। এই দায়সারা দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অভ্যুত্থান-পরবর্তী একটা সরকার কাজ করতে পারে না।’
সারজিস আরও বলেন, ‘কোথায় সেফ এক্সিট নেবে? পৃথিবীতে সেফ এক্সিট নেওয়ার একটাই জায়গা, সেটা হচ্ছে মৃত্যু। এ ছাড়া কোনো সেফ এক্সিট নাই। আপনি পৃথিবীর যে প্রান্তেই যান, সেখানে বাংলাদেশের মানুষ আপনাকে ধরবে।’ সেফ এক্সিট ইস্যুতে নাহিদকে সমর্থন করে সারজিস বক্তব্য দিলেও তিনি খোলাসা করেননি কোন কোন উপদেষ্টা এটি খুঁজছেন।
প্রথম প্রতিবাদ পরিবেশ উপদেষ্টার, কথা বলতে শুরু করেছেন অন্য উপদেষ্টারাও
এনসিপির শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলাম দলটির দায়িত্ব নেওয়ার আগে উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন। তিনি সামলেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব। এখনও ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছে মাহফুজ আলম ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া। নিজের এক সময়ের ‘কলিগ’দের নিয়ে নাহিদ যে সন্দেহের তীর ছুঁড়েছেন সেই প্রসঙ্গে প্রথম প্রতিবাদ বা নিজের অবস্থান খোলাসা করেন বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। সব সময় সোজা সাপ্টা কথায় বিশ্বাস করেন উপদেষ্টা। ইনিয়ে-বিনিয়ে কথা বলাটা তাঁর ধাঁচে নেই। পরিবেশ আন্দোলনে দেশের পথিকৃৎ এই সংগঠক ও লড়াকু নেতা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে নানাভাবে হয়রানির মুখে পড়েছেন। ওই সময় গুম করা হয়েছিল তাঁর স্বামীকেও। কিন্তু ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান থেকে তিনি সরে আসেননি। তাই স্বভাবতই ‘সেফ এক্সিট’ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘বাকি জীবনও বাংলাদেশেই কাটিয়ে যাব আপনাদের সাথে ইনশাআল্লাহ।’
গত বুধবার (৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘আমি একদম কোনো এক্সিট খুঁজছি না। দেশেই ছিলাম, এর আগেও বহু ঝড়-ঝঞ্ঝা এসেছে, ওই সব ঝড়-ঝঞ্ঝা প্রতিহত করে দেশে থেকেছি। বাকি জীবনও বাংলাদেশেই কাটিয়ে যাব আপনাদের সাথে ইনশাআল্লাহ।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আসলে তাকে (নাহিদ ইসলাম) তার বক্তব্যকে সাবস্টেন্সিয়েট (অভিযোগের সপক্ষে তথ্য উপস্থাপন) করতে হবে, তার বক্তব্য আমার সাবস্টেন্সিয়েট করার বিষয় নয়, আমার খণ্ডানোরও বিষয় নয়। তথ্য-প্রমাণ, উপাত্ত… মানে বক্তব্যটা স্পেসিফিক হলে হয়তো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কথা বলা হতো। এটা হয়তো তাদের ধারণা, তারা মনে করে তাদের বক্তব্য হিসেবে বলেছে। এখানে সরকারের অবস্থান নেওয়ার তো কোনো সুযোগ নেই। সরকারের বক্তব্য দেওয়ার কোনো কিছু নেই।’
সম্প্রতি ঢাকার একটি হোটেলে আইন উপদেষ্টা ড.আসিফ নজরুল বলেন, ‘এখন সেফ এক্সিট নিয়ে নানা কথাবার্তা হচ্ছে। আমরা উপদেষ্টারা খুব নিশ্চিতভাবে জানি যে, আমাদের কারও কোনো সেফ এক্সিটের প্রয়োজন নাই।’ ‘তবে, বাংলাদেশের জাতি হিসেবে আমাদের সেফ এক্সিটের প্রয়োজন আছে। কারণ একটা ভয়াবহ, অসুস্থ, আত্মবিধ্বংসী রাষ্ট্রকাঠামো থেকে আমাদের সেফ এক্সিট প্রয়োজন, এই জাতির।’
গত বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) এক ফেসবুক পোস্টে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান ‘সেফ এক্সিট’ প্রশ্নে আক্ষেপ করেছেন। সরকারের রেল ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেওয়া এ উপদেষ্টা ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, ‘বিষয়টি উত্থাপনকারী, প্রাক্তন উপদেষ্টা ও বর্তমান এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন ও জুলাই আন্দোলনের অগ্র-সেনা হিসেবে শ্রদ্ধার পাত্র। তাই তার বক্তব্যের ওপর আমার মন্তব্য করা শোভন নয়। তাছাড়া আমি রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো মন্তব্য করি না। নিজের সীমিত সামর্থ্যের সবটুকু ব্যবহার করে জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালন করছি। শিক্ষকতার সূত্রে, ইতোপূর্বে যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার নিশ্চিত সুযোগ গ্রহণ করিনি। আজ ৭২+ বছর বয়সে আমাকে যদি সেফ এক্সিটের কথা ভাবতে হয় তা হবে গভীর দুঃখের বিষয়।’
গত শনিবার (১১ অক্টোবর) দুপুরে রাঙ্গামাটিতে এক ‘সম্প্রীতি সমাবেশ’ শেষে ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ‘নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে আমরা চলে যাব। সেফ এক্সিট বলতে আমি কিছু বুঝি না। আমার কোনো সেকেন্ড হোম নেই, এমনকি ঢাকাতেও নিজের বাড়ি নেই। বর্তমানে আমি সরকারি বাড়িতে এবং চট্টগ্রামে ভাড়া বাসায় থাকি। আমি এই দেশের মানুষ। এই দেশ আমার, এখানেই আমি থাকব।’ সর্বশেষ রোববার (১২ অক্টোবর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘আমার ছেলে-মেয়ে সবাই দেশে, আমি একা বিদেশে গিয়ে কী করব?’
‘সেফ এক্সিট’ বিতর্ক কি জুলাই সনদের ট্র্যাক থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিচ্ছে’
‘সেফ এক্সিট’ ইস্যুটি জুলাই সনদ থেকে মনযোগ সরিয়ে দিচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও উপস্থাপক জিল্লুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সেফ এক্সিট বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় তুলেছে। নাম না বলায় অভিযোগ গুরুভার রাজনৈতিকভাবে টিকে আছে। আইনি অর্থে ঝুলে আছে। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ান হাসান সরাসরি বলেছেন— এ ধরনের দাবি যিনি করেছেন, তাকেই প্রমাণ দিতে হবে তিনি নিজে কোনো এক্সিট খুঁজছেন না, বাংলাদেশেই থাকবেন। প্রায় একই রকমের কথা বলেছেন সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমিন মুরশিদও। উত্তরাঞ্চল এনসিপি সংগঠক সারজিস আলম আরো কড়া ভাষায় সেফ এক্সিট প্রসঙ্গ রাজনৈতিক মাঠে ছুড়ে দিয়েছেন। সরকারের দায়বদ্ধতার রাজনীতিতে এই কথাগুলো অবধারিতভাবে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে যখন নির্বাচন ফেব্রুয়ারির ক্যালেন্ডারে ধরা। এখন প্রশ্ন—সেফ এক্সিট বিতর্ক কি জুলাই সনদের ট্র্যাক থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিচ্ছে? বাস্তবে তাই।’
নিজের ইউনিউব চ্যানেলে দেওয়া এক ভিডিওতে এসব কথা বলেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ন্যায়, পুনর্মিলন ও সংস্কারের যে তিন কোণা রূপরেখা গত এক বছরে গড়ে উঠেছিল, তার কেন্দ্রে ছিল স্বচ্ছতা এবং অংশগ্রহণ। উপদেষ্টাদের নৈতিক অধিকার আসে রাজপথে রক্ত-ঘামে অর্জিত প্রত্যাশা রক্ষার দায় থেকে। এখানে কোনো পলিটিক্যাল ইনসাইডার খেলা চললে তা অবিশ্বাস তৈরি করবে। তাই দুইদিকেই সমান সতর্কতা দরকার। অভিযোগকারীকে তথ্য প্রমাণ হাজির করতে হবে। অভিযুক্তকে স্বচ্ছতা দেখাতে হবে। নইলে সেফ এক্সিট নিয়ে ন্যারেটিভ যেভাবে মেরুকরণ ঘটায়, তাতে গণভোটের প্রশ্নপত্রের ভাষাই নয়, ভোটারের আস্থা-সাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই প্রেক্ষাপটে কমিশনের কাজ শুধু টেকনিক্যাল ডিজাইন নয়, বিশ্বাসের অবকাঠামো বানানো।’
জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চের নাটক আবারও জমে উঠতে শুরু করেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে এখন সবচেয়ে বড় অচল অবস্থা তৈরি হয়েছে গণভোটের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে। একথা কেউ অস্বীকার করবেন না। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পাঁচ দফা সংলাপ শেষ হলো। কবে কিভাবে কোন আইনি রাস্তায় গণভোট হবে— এ নিয়ে দলগুলোর অনড় অবস্থান অটুট রয়ে গেল। বিএনপি বলছে— জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোট, যেন অর্থ-প্রশাসনিক ব্যয় কমে এবং ক্যালেন্ডার পেছায় না। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি চাইছে নির্বাচনের আগে, যাতে সনদের আইন স্পষ্ট হয়। সংসদের গঠন, ক্ষমতা, ও পরিধি নিয়ে ব্যর্থ না থাকে। কমিশন নিজেও ইঙ্গিত দিয়েছে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে অধ্যাদেশ বা অর্ডিনেন্স জারি করে গণভোট আয়োজন— এটাই বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে। এমনকি দ্বৈত ক্ষমতা প্রথম অধিবেশনে পরবর্তী সংসদের গাঠনিক কনস্টিটিউয়েন্ট ক্ষমতা নির্ধারণ নিয়েও ভাবনা চলছে।’
কালের আলো/এমএএইচ/এমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array