দৃঢ় ও অবিচল সশস্ত্র বাহিনী সমুন্নত রেখেছে দেশের গৌরব
এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো:
পরাধীনতার বৃত্ত ভেঙে স্বাধীনতার আলোয় আলোকিত হতে চেয়েছিল বীরের জাতি বাঙালি। স্বাধীনতাপ্রিয় বাঙালি জাতির সুদীর্ঘ বছরের মুক্তির সংগ্রাম নানা বাঁক ও পথ পেরিয়ে অবশেষে খুঁজে পেয়েছিল সাফল্যের মোহন ঠিকানা। মহান স্বাধীনতার চিরভাস্বর সূর্য উদয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালেই ২১ নভেম্বর সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। প্রবল প্রদীপ্ত আন্দোলনের জোয়ারে সেই সময় দেশপ্রেমী সশস্ত্র বাহিনীর হৃদয়েও আঁকা হয় একটি লাল-সবুজ পতাকা। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের ছবি। দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর অকুতোভয় সদস্যরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যৌথভাবে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণের সূচনা করেন। শুধু তাই নয়, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সৈনিকরা অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করে হাজারো মুক্তিযোদ্ধাকে। আত্মসমর্পণে বাধ্য হয় হানাদাররা। ৯ মাসের গণযুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর উড়েছিল বিজয় নিশান। অভ্যুদয় ঘটেছিল বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের।
সেই থেকে ২১ নভেম্বর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে এক বিশেষ গৌরবময় দিন। মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অসামান্য আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাঁথা বাঙালি জাতি চিরদিন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গেই স্মরণ করে। মুক্তিযুদ্ধের সুমহান চেতনায় প্রতিবছর ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। এবারও যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করা হবে স্বাধীনতার জন্য আত্মদানকারী সশস্ত্র বাহিনীর বীর সন্তানদের। মুক্তিযুদ্ধের রোমাঞ্চকর ও চাঞ্চল্যময় দিনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে- ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি সেনারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। প্রথম ইস্ট বেঙ্গল যশোর সেনানিবাস, দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল জয়দেবপুর, তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল সৈয়দপুর, চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল কুমিল্লা ও অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল চট্টগ্রাম বিদ্রোহ করে এবং সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। এই পর্যায়ে সুসংহত ও সমন্বিত যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় ত্বরান্বিত করার প্রয়াসে গঠন করা হয় এস ফোর্স, জেড ফোর্স ও কে ফোর্স নামে সেনাবাহিনীর নিয়মিত তিনটি ব্রিগেড। যুদ্ধে গোলন্দাজ সহায়তা প্রদানের জন্য মুক্তিযোদ্ধার সময় গঠিত হয় রওশন আরা ব্যাটারি ও স্বতন্ত্র রকেট ব্যাটারি। নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সারাদেশজুড়ে কিলো ফ্লাইট ও অপারেশন জ্যাকপটের মতো অপারেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী দেশের আপামর জনসাধারণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিজয় লাভ করে।
- সশস্ত্র বাহিনীর অকুতোভয় সদস্যরা দখলদারদের বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণের সূচনা করেন
- সশস্ত্র বাহিনীর সূর্য সন্তানেরা দেশের প্রতিটি সঙ্কটে শেষ ভরসা
- শান্তির অনন্য দূত বাংলাদেশ, বিশ্ব শান্তিরক্ষায় দেশটির নাম আজ সর্বজনবিদিত
সশস্ত্র বাহিনীর সূর্য সন্তানেরা দেশের প্রতিটি সঙ্কটে শেষ ভরসা। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনেও প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে দেশপ্রেমী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন সেদিনের মহাসঙ্কট ও সন্ধিক্ষণে দৃঢ়তা ও শুদ্ধতার সর্বোচ্চ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দেশপ্রেমের শ্বাশ্বস প্রেরণা ও অবিনাশী চেতনায় তাদের সেদিনের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন স্বয়ং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূসও। বুধবার (১৯ নভেম্বর) মিরপুর সেনানিবাসে ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে ডিএসসিএসসি-২০২৫-এর গ্র্যাজুয়েশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি সৌভাগ্যবান দেশ যে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী তাদের প্রধানদের নেতৃত্বে দেশের মানুষের পক্ষে প্রতিশ্রুত ছিল। যার কারণে বিগত শাসনের অবসান দ্রুত হয়েছে।’ এছাড়া চলতি বছরের সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষ্যে দেওয়া এক বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণ-অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা, শিল্প-কারখানায় নিরাপত্তা প্রদানসহ দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্র উদ্ধারসহ সব কার্যক্রমে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা প্রদানের জন্য আমি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ জানাই।’
‘আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডত্ব রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর দেশপ্রেমিক সদস্যগণ অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে চলেছেন। বিশ্ব শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও প্রশংসনীয় করেছে। আমি আশা করি ভবিষ্যতেও এই ভূমিকা অব্যাহত থাকবে। দেশের সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্বিপাকের সময় সশস্ত্র বাহিনীর বলিষ্ঠ ভূমিকা এই বাহিনীকে জাতির আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে’-সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে এমনটিই বলেছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও।
বাস্তবিক অর্থেই সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এর বলিষ্ঠ ও প্রজ্ঞাময় নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনী শক্তিশালী ও পেশাদার এক বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি জাতির যেকোন সঙ্কটে সশস্ত্র বাহিনীর সকল সদস্য সর্বদা প্রস্তুত। বিভিন্ন সময়ে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সংযোজিত হয়েছে অত্যাধুনিক সাজোয়া যান ও গোলন্দাজ কোরে মাঝারি ও দূরপাল্লার এমএলআরএস রেজিমেন্ট। আকাশ বিধ্বংসী ভি-শোরাড ও সর্বাধুনিক অরলিকন গান ও মিসাইল সিস্টেম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আকাশ প্রতিরক্ষায় সূচিত হয়েছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। অত্যাধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও সিগন্যাল সরঞ্জামাদি ছাড়াও বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র, হেলিকপ্টার, ইউএসবি, মডার্ন ইনফ্রেন্টি গেজেট, ট্যাংক এমবিটি ২০০০, এমএলআরএস, এপিসি, এসপি গান, এফএম ৯০ মিসাইলসহ আরও নানাববিধ অস্ত্র সরঞ্জামাদি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সংযুক্ত হয়েছে।
বীর বাঙালির রক্তস্নাত স্বাধীনতার মূল্যবোধে জাগ্রত নৌবাহিনী আজ একটি সক্ষম, সুশৃঙ্খল ও মানসম্পন্ন বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। নৌবাহিনীতে অনেক আগেই সংযোজিত হয়েছে দুটি আধুনিক সাবমেরিন, বানৌজা নবযাত্রা ও জয়যাত্রা। আধুনিক প্রযুক্তি সম্বলিত বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধ জাহাজ, ফ্রিগেট, কর্ভেট, নার্জ প্যাট্রল ক্রাফট, পেট্রোল ক্রাফট ও বিশেষ নৌ কমান্ডো দল সোয়াডস। এছাড়া সমুদ্রে জরুরি উদ্ধার ও টহল পরিচালনার জন্য নৌ বহরে অন্তভূর্ক্ত হয়েছে মেরিটাইম প্যাট্রল এয়ারক্রাফট ও হেলিকপ্টার সুবিধা সম্বলিত নেভাল এভিয়েশন। নিজস্ব প্রযুক্তির ড্রোন, জাহাজসমূহের আধুনিক ইলেকট্রনিক্স সিস্টেম, যোগাযোগ সরঞ্জামাদি, সাইবার নিরাপত্তা এবং আধুনিক নৌ প্রযুক্তি সংযোজন ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
স্বাধীনতা অর্জনের পর পরই অত্যাধুনিক সুপারসনিক মিগ-২১ যুদ্ধবিমানসহ হেলিকপ্টার ও পরিবহন বিমান, এয়ার ডিফেন্স রাডার ইত্যাদি বিমান বাহিনীতে সংযোজন করা হয়। এরই মাধ্যমে এই দেশে একটি আধুনিক বিমানবাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। বিভিন্ন সময়ে বিমানবাহিনীতে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, পরিবহন বিমান, হেলিকপ্টার, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজিত হয়েছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অত্যাধুনিক মাল্টিরোল কমবেট এয়ারক্রাফট (এমআরসিএ), অ্যাটাক হেলিকপ্টার, মিডিয়াম রেঞ্জ সারফেস টু এয়ার মিসাইল (এমএসএএম) ও লং রেঞ্জ রাডারস অন্তর্ভূক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় ও অবিচল সশস্ত্র বাহিনী প্রতিটি দুর্যোগে-দুর্বিপাকে-সঙ্কটে সবার আগে এগিয়ে এসে সমুন্নত রেখেছে দেশের গৌরব।
শান্তির অনন্য দূত বাংলাদেশ। বিশ্ব শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের নাম আজ সর্বজনবিদিত। বাংলাদেশ আজ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ১২২টি দেশের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হবার বিরল গৌরব অর্জন করেছে। গত তিন দশকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের ৪০টি দেশের ৫৫টি শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ গ্রহণ করেছে। শান্তিরক্ষা মিশনে চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি মোকাবিলায় যোগ্য করে তোলার লক্ষ্যে শান্তিরক্ষা মিশনে মোতায়েনের আগে সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং বা বিপসট আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শান্তিরক্ষী প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। শান্তিরক্ষা মিশনে মোতায়েনের পূর্বে সশস্ত্র বাহিনীর শান্তিরক্ষীরা প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ে বাস্তবধর্মী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী শান্তিরক্ষীদের অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জামাদিতে সজ্জিত করে মিশন এলাকায় মোতায়েন করা হয়। অত্যাধুনিক সরঞ্জামাদিতে সজ্জিত বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর শান্তরক্ষীদের দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আভিযানিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর শান্তিরক্ষীরা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আস্থার প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা এবং আন্তরিকতার ভূয়সী প্রশংসা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌছে দিয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
কালের আলো/এমএএএমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array