বঙ্গোপসাগরে যুদ্ধ জয়ের শক্তি দেখালো বাংলাদেশ নৌবাহিনী
কালের আলো রিপোর্ট:
বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করেছে বহি:শত্রুর জাহাজ। চোখের পলকে ছুটে এসেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কমান্ডোরা। আকাশ পথে দ্রুত যোগ দিলো আভিযানিক হেলিকপ্টারও। ঝাঁপিয়ে পড়লো সমুদ্র সীমাকে শত্রুমুক্ত করতে। শত্রুপক্ষের টার্গেট লক্ষ্য করে নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ থেকে নিক্ষেপ করা হচ্ছে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র। নৌবাহিনীর আক্রমণে রীতিমতো কেঁপে উঠলো বঙ্গোপসাগর। কোণঠাসার পর পর্যুদস্ত শত্রু জাহাজ। ধ্বংস করা হলো নির্ভুল নিশানায়। রবিবার (৩০ নভেম্বর) নৌবাহিনীর বার্ষিক এই সমুদ্র মহড়ার মনোমুগ্ধকর এসব দৃশ্য কেড়েছে নজর। এর মাধ্যমে নিজেদের দেশাত্মবোধ, পেশাগত মান ও দক্ষতার মাধ্যমে যুদ্ধ জয়ের শক্তি দেখালো ‘শান্তিতে সংগ্রামে সমুদ্রে দুর্জয়’- মন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাদেশ নৌবাহিনী। আরও একবার বিশ্ব দরবারে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ ঘোষণা দিলো এক নিরাপদ জলসীমার।
নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান এর আমন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড.আসিফ নজরুল, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান চৌধুরী এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদ থেকে সমাপনী দিবসের মহড়া অবলোকন করেন। মহড়ায় ফুটিয়ে তোলা হয় সোয়াট ইউনিটের দক্ষতা, সার্চ এন্ড রেসকিউ অপারেশন এবং জাহাজ বিধ্বংসী মিসাইলের সক্ষমতা। সুবিশাল সমুদ্রের নিরাপত্তা বিধান, সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সমুদ্র সম্পদের হেফাজত করতে নিরলসভাবে কাজ করা বাংলাদেশ নৌবাহিনী এদিন আবারও জানান দিয়েছে তাঁরা প্রস্তুত দিন-রাত ২৪ ঘন্টা কিংবা ৩৬৫ দিনই।
জানা যায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব অপরিসীম। আর এই বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তায় নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালন করে চলেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। নৌবাহিনী তাঁর রণকৌশল, পেশাগত দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে যেকোনো মূল্যে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সমূদ্রসীমা রক্ষায় নিবেদিত প্রাণ ভূমিকা পালন করছে। বহি:শক্তির বৈরী মনোভাব, কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা, আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক বিষয়সমূহ বিবেচনা করে বিভিন্ন ধাপে কৌশল নিরূপণের মাধ্যমে প্রতি বছরের মতো এবারও আয়োজন করা হয় মহড়ার। এছাড়া শান্তিকালীন সময়ে নৌবাহিনীর দায়িত্ব যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষণ প্রদান করতে মহড়ায় বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়। বার্ষিক এই মহড়ার মাধ্যমে দেশপ্রেমে আপোসহীন প্রতিটি নৌ সদস্যের মনোবল বেড়েছে আরও বহুগু।

- নৌবাহিনী প্রধানের আমন্ত্রণে সমাপনী দিবসের মনোমুগ্ধকর মহড়া অবলোকন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের চার উপদেষ্টা
- শত্রুপক্ষের টার্গেট লক্ষ্য করে নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ থেকে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ
- মহড়ায় ফুটিয়ে তোলা হয় সোয়াট ইউনিটের দক্ষতা, সার্চ এন্ড রেসকিউ অপারেশন এবং জাহাজ বিধ্বংসী মিসাইলের সক্ষমতা
- আরও একবার বিশ্ব দরবারে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ ঘোষণা দিলো এক নিরাপদ জলসীমার
চূড়ান্ত দিনের মহড়া কার্যত ছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শক্তিমত্তা প্রদর্শনের অনবদ্য এক আয়োজন। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে ক্ষেপনাস্ত্র উৎক্ষেপণ, শোল্ডার লঞ্চড সারফেস টু এয়ার মিসাইল ফায়ারিং, এ্যান্টি এয়ার র্যাপিড ওপেন ফায়ারিং, রকেট ডেপথ্ চার্জ ফায়ারিং, ইউএভি অপারেশন, নৌকমান্ডোদের মহড়া হেলিকপ্টার ভিজিট বোর্ড সার্চ এন্ড সিজার ও নৌ যুদ্ধের বিভিন্ন রণকৌশল ছিল উল্লেখযোগ্য। ৫ দিনব্যাপী আয়োজিত মহড়ায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ফ্রিগেট, করভেট, ওপিভি, মাইন সুইপার, পেট্রোলক্রাফ্ট, মিসাইল বোটসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জাহাজ এবং নৌবাহিনীর মেরিটাইম পেট্রোল এয়ারক্রাফট, হেলিকপ্টার এবং বিশেষায়িত ফোর্স সোয়াডস্ প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। এছাড়াও বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এবং কোস্টগার্ডসহ সংশ্লিষ্ট মেরিটাইম সংস্থাসমূহ এই মহড়ায় অংশ নেয়। বিভিন্ন ধাপে পরিচালিত এই মহড়ার নৌ বহরের বিভিন্ন রণকৌশল অনুশীলন, সমুদ্র এলাকায় পর্যবেক্ষণ, লজিষ্টিক অপারেশন, উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত নৌ স্থাপনাসমূহের প্রতিরক্ষা অন্তর্ভূক্ত ছিল মহড়ায়, জানায় আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।

নৌবাহিনীর এই বার্ষিক মহড়ায় মূলত প্রাধান্য পায় সমুদ্র এলাকায় দেশের সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ, সমুদ্র সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ, সমুদ্র পথের নিরাপত্তা বিধানসহ চোরাচালানরোধ, জলদস্যুতা দমন, উপকূলীয় এলাকায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সমুদ্র এলাকায় প্রহরা নিশ্চিতকরণ। সফলতার সঙ্গে মহড়া শেষ করায় অন্তর্বর্তী সরকারের চার উপদেষ্টা অংশগ্রহণকারী সকল কর্মকর্তা ও নাবিকদের অভিনন্দন জানান। নৌ সদস্যদের পেশাগত মান, দক্ষতা ও কর্মনিষ্ঠা এবং দেশের সমুদ্রসীমা রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সক্রিয় ভূমিকারও প্রশংসা করেন অতিথিরা। তাঁরা মনে করেন, এই মহড়া নৌবাহিনীর সদস্যদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, উন্নত প্রশিক্ষণ, কর্মস্পৃহা ও গভীর আত্মবিশ্বাস এবং সর্বোপরি দেশপ্রেমের প্রতিফলন।
সাধারণত মাতৃভূমির সুরক্ষা ও অন্য দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য একটি দেশের সামরিক শক্তি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক শক্তি পর্যবেক্ষণ করে চলতি বছরের এপ্রিলে একটি তালিকা প্রকাশ করেছে সামরিক শক্তি পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার। গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের সূচকে বিশ্বের শীর্ষ সামরিক শক্তির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এবার তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৩৫তম। এশিয়ার দেশগুলোর সামরিক শক্তির তালিকায় দেশটির অবস্থান ১৭তম। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এমন অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ও যুদ্ধ কৌশলে আরও এগিয়ে যাবে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী, এমন অভিমত বিশ্লেষকদের।

কালের আলো/এমএএএমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array