খুঁজুন
                               
মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১ বৈশাখ, ১৪৩৩
           

চিরবিদায় লড়াকু যোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদি

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১১:১৩ অপরাহ্ণ
চিরবিদায় লড়াকু যোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদি

কালের আলো রিপোর্ট:

জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের আলোচিত তরুণ রাজনীতিক, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি আর নেই। গত শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) রাজধানীর বিজয়নগরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাত পৌনে ১০টা দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ইনকিলাব মঞ্চের ফেসবুক পেজে ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে। সিঙ্গাপুরে অপারেশন শেষে তার মৃত্যুর সংবাদ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ও ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের (এনএইচএ) সদস্য সচিব ডা. মো. আব্দুল আহাদও।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টায় অপারেশনের জন্য হাদির পরিবার সম্মতি দেয়। তখন তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হয়। অপারেশন শেষ হওয়ার পর আর আপডেট পাইনি। এরপর সরাসরি মৃত্যু ঘোষণার সংবাদ পাই। হাদির মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. মো. আব্দুল আহাদ বলেন, মৃত্যুর সংবাদটা কেবলই পেলাম। সরকারের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো যাবে।

আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্যের কারণে লড়াকু যোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদি আলোচিত ছিলেন। এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গেলে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে হাদিকে গুলি করা হয়। গুলিটি তার মাথায় লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে সময় তিনি গভীর কোমায় ছিলেন এবং তার জিসিএস স্কোর ছিল ৩। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। গত বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছিল, গুলিবিদ্ধ ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। সেই ঘোষণার পর থেকে তাঁর জীবন নিয়ে মানুষের মধ্যে শঙ্কা বাড়তে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে দোয়া ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

হত্যাচেষ্টার এই ঘটনার পরপরই দেশে ব্যাপক উদ্বেগ
ওসমান হাদিকে দিনে-দুপরে গুলি করে হত্যাচেষ্টার এই ঘটনার পরপরই দেশে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ঘটনাটিকে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন, নির্বাচনের পথে গুপ্ত হামলা, নাশকতা বাড়তে পারে। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা হাদিকে গুলিবর্ষনকারী হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতাকে শনাক্ত করে। ওই আসামি ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে আলোচনা রয়েছে।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার এক মাস আগেই হত্যার হুমকি পাওয়ার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন শরিফ ওসমান হাদি। গত নভেম্বরে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছিলেন, দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০টি নম্বর থেকে তাঁকে ফোন ও মেসেজ পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ওই পোস্টে তিনি লেখেন, আওয়ামী লীগের ‘খুনি’ সমর্থকেরা তাঁকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখছে। তবে জীবননাশের আশঙ্কা সত্ত্বেও ‘ইনসাফের লড়াই’ থেকে পিছিয়ে যাবেন না।

ঝালকাঠির নলছিটি থেকে উঠে আসা শরিফ ওসমান হাদিকে শুরুতে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে দেখা যায়নি। মাদ্রাসার শিক্ষক বাবার সন্তান হাদি নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে তিনি বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করে আলোচনায় আসেন হাদি। ইনকিলাব মঞ্চ প্রতিষ্ঠার পর জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং জুলাই ঘোষণাপত্র ঘোষণার দাবিতে শাহবাগে ধারাবাহিক সমাবেশ আয়োজন করেন হাদি। বিভিন্ন টেলিভিশনের টক শোতেও নিয়মিত আমন্ত্রণ পেতে থাকেন। প্রথমে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হলেও পরে আহ্বায়কের দায়িত্ব নেন। দ্রুত তাঁর একটি সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে উঠে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের অক্টোবরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেন তিনি। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবিতেও ছিলেন সরব। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে জাতীয় সরকার গঠনের পক্ষেও প্রকাশ্যে মত দেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভাঙার ঘটনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর হাদি জাতীয় নাগরিক কমিটিতে যোগ দিলেও পরে নতুন দল এনসিপিতে যোগ দেননি। বরং ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে কয়েক মাস ধরে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। ফজরের নামাজের পর মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ভোট চাওয়া, বাতাসা-মুড়ি নিয়ে প্রচার, ভোটারদের কাছ থেকে অনুদান গ্রহণ ও ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ—সবই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরতেন। ওসমান হাদিকে হত্যার এই ঘটনাকে নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘পলাতক শক্তির’ সহিংসতার একটা সতর্ক বার্তা হিসেবে দেখছে সরকার।

ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৪ জনকে আটক ও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও র‌্যাব। তাঁদের মধ্যে প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সালের বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০) ও মা মোসা. হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভিন সামিয়া ও শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু রয়েছেন। গ্রেপ্তার অন্যরা হচ্ছেন- মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল, মো. কবির, আব্দুল হান্নান, মো. হিরন, মো. রাজ্জাক, ফয়সালের বান্ধবী মারিয়া আক্তার এবং হালুয়াঘাট সীমান্তে মানব পাচারকারী হিসেবে পরিচিত সিমিরন দিও ও সঞ্জয় চিসিম।

বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির শোক প্রকাশ
সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন গুলিবিদ্ধ ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে বিএনপি। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক বার্তায় এ শোক প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে আমরা গভীর শোকাহত।’

আপসহীন জুলাই যোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তিনি এ শোক প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে জামায়াতের আমির বলেন, ‘শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন একজন সাহসী জুলাই যোদ্ধা ও সাচ্চা দেশপ্রেমিক। তিনি অন্যায়ের কাছে কখনও মাথা নত করেননি। তার কণ্ঠ ছিল সব আধিপত্যবাদী শক্তি ও অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। তিনি ছিলেন আপসহীন এক যোদ্ধা। দুনিয়ার কোনো লোভ-লালসা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওসমান হাদি মানবিক নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। ন্যায়, সত্য ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার শাহাদাতে জাতি একজন নির্ভীক কণ্ঠস্বর ও আদর্শবাদী যোদ্ধাকে হারাল। তার মৃত্যুতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা সহজে পূরণ হবার নয়। তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর নতুন প্রজন্মকে ধারণ করতে হবে এবং দল-মত নির্বিশেষে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে।’ ডা. শফিকুর রহমান মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বলেন, ‘আমি মহান আল্লাহর দরবারে তার রুহের মাগফিরাত ও শাহাদাত কামনা করছি। তার মাসুম বাচ্চাসহ স্ত্রী, শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন, সহযোদ্ধা ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা যেন তাদের সবাইকে এই বিরাট শোক সইবার তাওফিক দান করেন সেই দোয়া করি।’

ওসমান হাদির মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাতে হাদির মৃত্যুর পর এক প্রিস বিজ্ঞপ্তিতে এ শোক বার্তা জানান এনসিপির মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন। শোক বার্তায় বলা হয়, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত জাতীয় নাগরিক কমিটির অন্যতম সদস্য ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। আমাদের এই সহযোদ্ধার অকালপ্রয়াণে এনসিপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা গভীরভাবে শোকাহত। আমরা মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

কালের আলো/এমএএইচ/এইচএন

বৈশাখী শোভাযাত্রা দেখলেন ইইউ-নরও‌য়ের রাষ্ট্রদূতসহ বিদেশি কূটনীতিকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ
বৈশাখী শোভাযাত্রা দেখলেন ইইউ-নরও‌য়ের রাষ্ট্রদূতসহ বিদেশি কূটনীতিকরা

বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের অন‌্যতম আকর্ষণ বৈশাখী শোভাযাত্রা উপভোগ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকরা। তাদের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও নরওয়ের রাষ্ট্রদূত ছিলেন।

মঙ্গলবার (১৪ এ‌প্রিল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাজু ভাস্কর্য ও টিএসসি প্রাঙ্গণের সামনে দাঁ‌ড়িয়ে বৈশাখী শোভাযাত্রা দেখেছেন বিদেশি কূটনীতিকরা।

ইইউর রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার ও নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যাকন অ্যারাল্ড গুলব্রানসেন সস্ত্রীক এ‌সে‌ছেন বৈশাখী শোভাযাত্রা দেখ‌তে। এ ছাড়া, শোভাযাত্রা দেখ‌তে এ‌সে‌ছেন ভারত, ইউরোপ, মধ‌্যপ্রাচ‌্য ও দ‌ক্ষিণ-পূর্ব এ‌শিয়া মিশনের কয়েকজন কূটনীতিক‌। তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ব‌বিদ‌্যালয় প্রশাসন।

ইইউর রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার ও নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যাকন অ্যারাল্ড গুলব্রানসেনকে শোভাযাত্রা বেশ উপভোগ করতে দেখা গেছে। দুই রাষ্ট্রদূতই তাদের মোবাইল ফোনে শোভাযাযাত্রার ছ‌বি তোলাসহ সেল‌ফি‌ তুল‌ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহকারী প্রক্টর শেহরীন আমিন ভূঁইয়া (মোনামি) বিদেশি কূটনীতিকদের দেখভালের দা‌য়িত্বে ছিলেন। তি‌নি বলেন, শোভাযাত্রা অনুষ্ঠান দেখতে বি‌ভিন্ন দেশের কূটনী‌তিকরা এসেছেন। দুইজন রাষ্ট্রদূত এসেছেন, আরও অ‌নেক মিশনের কূটনী‌তিকরা এসেছে; তা‌রা সস্ত্রীক এসেছেন।

আজ সকাল ৯টার পর ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ প্রতিপাদ্য নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ বের হয়। উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে এই শোভাযাত্রা বের হয়।

শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদের ৩ নম্বর গেট থেকে শুরু করে শাহবাগ থানার সামনে গিয়ে ইউটার্ন নেয়। সেখান থেকে রাজু ভাস্কর্য ও টিএসসি প্রাঙ্গণ ডান পাশে রেখে দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমির সামনে দিয়ে আবার চারুকলা অনুষদে এসে শেষ হয়।

জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরোধিতা শুরু করে।

২০২৫ সালে চারুকলার শোভাযাত্রার নাম থেকে মঙ্গল শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। নতুন নাম হয় বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা। এবার এ শোভাযাত্রার নাম দেওয়া হয় বৈশাখী শোভাযাত্রা।

বৈশাখের প্রথম প্রভাতে রমনা বটমূলে বঙ্গব্দ ১৪৩৩ কে বরণ করে নেওয়ার মধ‌্য দিয়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

রমনা বটমূলে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ ও শান্তি-কল্যাণ-স্বস্তির আকাঙ্ক্ষা ছায়ানটের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ
রমনা বটমূলে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ ও শান্তি-কল্যাণ-স্বস্তির আকাঙ্ক্ষা ছায়ানটের

রাজধানীর রমনা বটমূলে শেষ হয়েছে ছায়ানটের বর্ষবরণ ১৪৩৩-এর অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সম্পর্কিত সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে পারস্য অঞ্চলসহ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শান্তি, কল্যাণ ও স্বস্তির আকাঙ্ক্ষাও ছিল ছায়ানটের আয়োজনে।

মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনে সকাল ৮টা ২০ মিনিটে ছায়ানটের শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে এবারের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শেষ হয়।

অনুষ্ঠান শেষের আগে ছায়ানটের নির্বাহী সভাপতি ড. সারওয়ার আলী বক্তব্যে বলেন, সমাজে দিন দিন বাড়ছে অসহিষ্ণুতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সৃষ্টি হচ্ছে নানা প্রতিবন্ধকতা। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে নতুন বছরের শুরুতে শান্তি, নিরাপত্তা ও সহনশীলতার প্রত্যাশা সকলের।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সম্পর্কিত সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে পারস্য অঞ্চলসহ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান সংঘাত ও নিপীড়ন বিশ্বজুড়ে এক ধরনের আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।

এর প্রভাব পড়ছে দেশের ভেতরেও, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশে অনেকেই নিজেদের অনিরাপদ বোধ করছেন। মতপ্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া এবং সামাজিক সহনশীলতার অবক্ষয় একটি সুস্থ সমাজের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ শান্তি, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন বছর হোক ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মুক্তচিন্তার বিকাশের প্রতীক। যেখানে মানুষ নির্ভয়ে গান গাইতে পারবে, মত প্রকাশ করতে পারবে এবং নিরাপদ জীবনযাপন নিশ্চিত হবে। শুভ নববর্ষ।

এর আগে সূর্যোদয়ের পরপর শুরু হয় বর্ষবরণের ছায়ানটের অনুষ্ঠান। এবারের বার্তা, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’—সেখানেই বাঙালির জয়। ছায়ানটের ৫৯তম অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছে সকালের স্নিগ্ধ প্রকৃতি এবং মানব ও দেশপ্রেমের গানের পাশাপাশি লোকজনজীবনের সুর দিয়ে। সব মিলিয়ে বাঙালি সমাজকে বিগত বছরের সব ‘প্রতিকূলতা, আবর্জনা’ দূর করে নতুন বছরে ‘আরও মানবমুখী’ হওয়ার প্রত্যয়। সময় যত গড়িয়েছে, বেলা যত বেড়েছে ততই ভিড় বাড়তে দেখা গেছে অনুষ্ঠানস্থলে।

এদিন নতুন বছরকে বরণ করতে আয়োজনের কমতি ছিল না রমনার বটমূলে। বাঙালি সংস্কৃতিকে লালন করে ঐতিহ্যগতভাবে বর্ষবরণের আয়োজন করে আসছে ছায়ানট। নতুন বছরকে তাই বরণ করে নেওয়া হয় সুরের মূর্ছনায়।

মঙ্গলবার সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে সম্মেলক কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগ্নে’ গানের মাধ্যমে শুরু হয় ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। এর পরপরই পরিবেশিত হয় ‘এ কী সুগন্ধহিল্লোল বহিল’ ও ‘তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো আমার দখিন-হাতে’ গান দুটি। এরপর একের পর এক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন সাঁইয়ের গান, লোকগানের পাশাপাশি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অজয় ভট্টাচার্য, আবদুল লতিফ, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের গান পরিবেশন করা হয়।

এবারের অনুষ্ঠানে বিশেষ সংযোজন ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রখ্যাত গণসংগীতজ্ঞ সলিল চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ এবং প্রয়াত বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, গীতিকার, সুরকার ও চিত্রশিল্পী মতলুব আলীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের গান। মোট ২২টি গান পরিবেশিত হয় প্রায় দুই ঘণ্টার এ অনুষ্ঠানে। এর মধ্যে ৮টি ছিল সম্মেলক গান, আর একক কণ্ঠের গান ছিল ১৪টি। পাঠ ছিল দুটি। ছায়ানটের শিশু বিভাগের শিক্ষার্থীসহ সব বিভাগের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশিষ্ট শিল্পী মিলিয়ে প্রায় ২০০ শিল্পী অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

এদিকে ভোর থেকেই রমনায় বৈশাখী সাজে হাজির হন শিশু, নারী ও পুরুষ। সবারই প্রত্যাশা—বিগত বছরের সব গ্লানি মুছে নতুনের আবহে শুরু হোক বছরটি। বিভেদ ভুলে সাম্য আর ঐক্যের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় সবার।

জানা গেছে, বরাবরের মতোই সংস্কৃতিবিরোধী অপশক্তিকে তুচ্ছ করে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে বাঙালি তার সর্ববৃহৎ উৎসব নতুন বছর বরণে ভয়কে জয় করার প্রত্যয় নিয়ে বাংলা নতুন বছরের ভোরে কণ্ঠ ছেড়ে গান গেয়েছে ছায়ানট। এবার মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধবাজরা হাজার হাজার বছরের পারস্য সভ্যতার ধ্বংসযজ্ঞে মত্ত-বিশ্ব জনজীবন যখন বিপর্যয়ের মুখে, তখন শান্তি, কল্যাণ ও স্বস্তির আকাঙ্ক্ষাও ছিল ছায়ানটের আয়োজনে।

দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংস্থা ছায়ানট ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার এই বটমূলে পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে। সে বছর রমনার বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনে নববর্ষ বরণের প্রভাতি অনুষ্ঠানের প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল ভয়ের পরিবেশ থেকে বের হয়ে এসে সংগীতের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয়কে তুলে ধরা। পয়লা বৈশাখের এ অনুষ্ঠান কালক্রমে দেশের সব ধর্ম, বর্ণের মানুষের কাছে এক অভিন্ন উৎসবে পরিণত হয়েছে। এবারও ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করা হলো রমনার এই বটমূল থেকেই।

১৯৬৭ সালে শুরু হওয়া এ উৎসব ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বছর ছাড়া প্রতিটি পহেলা বৈশাখে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়েছে সুরের মূর্ছনা আর কথামালায়। কোভিডের দুই বছর এ আয়োজন হয় ভার্চু্যয়ালি। ২০০১ সালে ছায়ানটের বৈশাখ বরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়। তাতে ১০ জন নিহত হন। এরপর থেকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে প্রতিবছর বর্ষবরণের এ আয়োজন চলছে।

বর্ষবরণের আয়োজন ঘিরে পুরো রমনা পার্ক এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়। বসানো হয় ডিএমপি ও র‍্যাবের কন্ট্রোল রুম। প্রবেশপথ ও বাহিরপথ আলাদা করা হয়।

কালের আলো/এসআর/এএএন

উৎসবের আমেজে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলো বৈশাখী শোভাযাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ
উৎসবের আমেজে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলো বৈশাখী শোভাযাত্রা

উৎসবমুখর ও বর্ণাঢ্য পরিবেশে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের বৈশাখী শোভাযাত্রা।

মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণ থেকে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ, দোয়েল চত্বর ও বেগম রোকেয়া হল এলাকা ঘুরে আবার চারুকলা অনুষদের সামনে এসে শেষ হয়।

এতে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য সায়মা হক বিদিশা, উপ-উপাচার্য ড. আব্দুস সালাম, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিদ্দিকুর রহমান খান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য লুৎফর রহমানসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং নগরবাসী।

ইউনেস্কো স্বীকৃত এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে অংশ নিতে সকাল থেকেই চারুকলা এলাকায় ভিড় করেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। অনেককে দেখা যায় সাদা-লাল রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নিতে।

শোভাযাত্রার শুরুতে ছিল মহানগর পুলিশের ১০টি ঘোড়সওয়ার দল। তাদের পেছনে জাতীয় পতাকা বহন করে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর একটি দল অংশ নেয়।

এরপর মূল ব্যানারসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষ, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, শিক্ষকবৃন্দ, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংসদ, কবিতা পরিষদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন।

শোভাযাত্রার আকর্ষণ হিসেবে ছিল পাঁচটি বড় মোটিফ-মোরগ, বেহালা, শান্তির পায়রা, হাতি ও ঘোড়া। এছাড়া প্রায় ৪০ জন শিল্পীর বাদ্যযন্ত্র পরিবেশনা এবং প্রায় ১৫০ ফুট দীর্ঘ পটচিত্রের স্ক্রল পেইন্টিং শোভাযাত্রায় বিশেষ মাত্রা যোগ করে। এতে অংশ নেয় দেশের ১০টি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও, যা আয়োজনটিকে বহুসাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে।

শোভাযাত্রায় অংশ নিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত হাজারো মানুষ চারুকলা এলাকায় সমবেত হন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পুরো আয়োজন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল রঙিন মুখোশ, প্রতীকী মোটিফ, গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা উপস্থাপন এবং বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির অনুষঙ্গ।
এবারের শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি, বৈচিত্র্যময় জাতিসত্তা এবং সম্প্রীতির বার্তা বিভিন্ন শিল্পকর্ম ও প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে পাহাড়ি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ আয়োজনটিকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।

শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে চারুকলা এলাকা ও আশপাশের সড়কে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরাও দায়িত্ব পালন করেন।

প্রতিবছরের মতো এবারও বৈশাখী শোভাযাত্রা বাঙালির ঐতিহ্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয়।

কালের আলো/এসআর/এএএন