‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’ : রাজনীতির আলোচনায় নতুন মাত্রা
বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখে প্রথম জনসভাতেই চমক দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) রাজধানীর পূর্বাচলে আয়োজিত গণসংবর্ধনায় লাখো লাখো জনতার উদ্দেশে তিনি বিশ্বখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ঐতিহাসিক উক্তি ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’-এর প্রসঙ্গ টেনে ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন। অসাধারণ এই শব্দবন্ধ রাজনীতিতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। মূলত ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’-এর মধ্য দিয়ে তিনি একটি সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্র পরিচালনার কথাকেই বুঝিয়েছেন। তার এই বক্তব্য মুগ্ধ করেছে দেশের মানুষকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দেশের মূলধারার গণমাধ্যমেও এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও তারেক রহমানের বক্তব্য নিয়ে ভারতীয় মিডিয়ায় অপপ্রচার হচ্ছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে আয়োজিত ঐতিহাসিক গণসংবর্ধনায় দেওয়া বক্তব্য নিয়ে ভারতীয় একটি গণমাধ্যমের অপপ্রচার শনাক্ত করেছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) ফ্যাক্ট চেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম বাংলাফ্যাক্ট। শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) বাংলাফ্যাক্ট জানিয়েছে, তারেক রহমান তার সম্পূর্ণ ভাষণে ভারতের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। এর পরও ‘এবিপি আনন্দ’ নামের একটি গণমাধ্যম অপ্রাসঙ্গিকভাবে শিরোনামে ‘ভারত নিয়ে পরিকল্পনা’ যুক্ত করেছে। প্রতিবেদনে এ দাবির কোনো প্রমাণ বা ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। বাংলাফ্যাক্টের অনুসন্ধান টিম জানিয়েছে, ভারতের গণমাধ্যম এবিপি আনন্দ তারেক রহমানের বক্তব্যের ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ অংশটুকুই ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর শিরোনাম তৈরি করেছে। তারেক রহমানের ভাষণে ভারতকে নিয়ে কোনো পরিকল্পনার কথা ছিল না। তবে বক্তব্যের একটি অংশ বিকৃতভাবে তুলে ধরে বিভ্রান্তিকর শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ৩০০ ফিটের গণসংবর্ধনায় তারেক রহমানের বক্তব্য প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’-এর মধ্য দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান একটি সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্র পরিচালনার কথাকেই বুঝিয়েছেন। এরই মধ্যে তিনি রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করেছেন। তা ছাড়া অতীতে বিভিন্ন সময়ে তারেক রহমানের বক্তব্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি জনগণের সমর্থনে আগামীতে ক্ষমতায় গেলে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, কর্মসংস্থান তৈরি, বেকার যুবকদের জন্য ভাতা প্রদানসহ বিভিন্ন অঙ্গীকারের কথা তারেক রহমান বিভিন্ন সময়ে বলেছেন। তাছাড়া একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করছেন তিনি। মূলত ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি এসব বিষয়কেই বুঝিয়েছেন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরে জাতিকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তার পরিকল্পনায় একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার রূপরেখা আছে, এতে কোনো সংশয় নেই। কেননা, বিএনপি এরই মধ্যে তাদের নীতি ও কর্মপরিকল্পনা নতুনভাবে সাজিয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি এমন একটি নীতিনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছে, যা আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করতে পারলে তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। তাই বিএনপি প্রস্তুত করেছে আটটি বিশেষ খাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং ধর্মীয় নেতাদের উন্নয়ন সেবা যার প্রতিটিই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। তারেক রহমান পরিকল্পনার কথা বলতে এগুলোকেই বুঝিয়েছেন।’ ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ জুলাই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখা জাতির সামনে উপস্থাপন করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, মার্টিন লুথারের যেমন স্বপ্ন ছিল, তেমনি বাংলাদেশের মানুষ ও দেশের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য তার এবং বিএনপির একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে। ধারণা করা হচ্ছে, তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ বলতে মূলত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা নির্দেশ করছে। যা হলো বিএনপির একটি আধুনিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ। এর মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের বিদ্যমান কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা। এই পরিকল্পনার প্রধান দিকগুলো হলো- কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না, জাতীয় সংসদে বিশিষ্টজনদের নিয়ে একটি ‘উচ্চকক্ষ’ গঠন করা হবে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সমন্বয় করা হবে। এছাড়া অবাধ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করে ‘রেইনবো নেশন’ গঠন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা এই প্ল্যানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সামাজিক সুরক্ষায় প্রতিটি পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ‘হেলথ কার্ড’ চালুর মাধ্যমে জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে এই ৩১ দফায়। সংক্ষেপে, এটি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও কাঠামোগত সংস্কারের একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, টেকসই গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা রূপরেখা মূলত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০ এর একটি আধুনিক ও পরিমার্জিত সংস্করণ।
বিএনপি’র শীর্ষ নেতা তারেক রহমান বারবার বলে আসছেন, বাংলাদেশ কোনো একটি দলের নয়; এটি সব ধর্ম, বর্ণ ও মতের মানুষের দেশ। তিনি উগ্রবাদ ও প্রতিহিংসার রাজনীতির পরিবর্তে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তৃণমূলের ক্ষমতায়ন এবং তরুণ সমাজকে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের অংশীদার করা। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে একটি স্মার্ট ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের কথা তিনি বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরেছেন। ব্যক্তিগত জীবনেও তারেক রহমানকে চরম ধৈর্যের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যু ও দীর্ঘ প্রবাস জীবন সত্ত্বেও তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থেকেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার জীবনের বড় শিক্ষা হলো-বিপর্যয়ের মুখে ধৈর্য ধারণ করা এবং সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করা। সব মিলিয়ে, সংগ্রাম ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা আজ এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কালের আলো/এমএএইচ/এইচএন


আপনার মতামত লিখুন
Array