বিএনপি’র নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র হিসেবে মাহদী আমিন’র প্রথম প্রেস ব্রিফিং
জারিফ নিহাল, কালের আলো:
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের পর প্রথম ব্রিফিং ছিল দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন’র। দোরগোড়ায় থাকা ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে তিনি দলীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র হিসেবে কী কী বিষয়ে কথা বলেন এ নিয়ে বাড়তি নজরও ছিল। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রেস ব্রিফিং যে কারণে গণমাধ্যমে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে ভোটের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্টের অপতৎপরতা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এক যুগেরও বেশি সময় বিএনপি’র বর্তমান চেয়ারম্যানের ভাবনা-চিন্তা নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাওয়া যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের এই শিক্ষক সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এতোদিন দলীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বা টকশোতে কথা বলেছেন। এবার তিনি কথা বললেন ভিন্ন এক মঞ্চে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সামগ্রিক চিত্র, জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটার বার্তা, নানা বিষয়ে দলের অবস্থান, শঙ্কা ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরলেন। জানালেন সিলেট সফরের মধ্যে দিয়ে তারেক রহমানের নির্বাচন কার্যক্রম শুরু হবে।
‘একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল তাদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য ধর্মীয় অনুভূতির ক্রমাগত অপব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে’ বলেও তোপ দেগেছেন। ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে আমরা দুঃখজনকভাবে দেখেছি, নানা উপায়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট করা হচ্ছে, একটি বিতর্কিত নির্বাচন প্রক্রিয়া সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।’ বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) বিকেলে গুলশানস্থ বিএনপির নির্বাচনি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিংয়ে মাহদী আমিন পোস্টাল ব্যালটের ক্ষেত্রে নিচের দিকে ধানের শীষের অবস্থান, নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ততা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক অপপ্রচার, গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে বিএনপির অবস্থান, তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের ফেসবুক আইডি, গণমানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততার লক্ষ্যে বিএনপির ইতোমধ্যেই কল সেন্টার চালুসহ সমসাময়িক নানা বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি তুলে ধরেন আসন্ন নির্বাচনকে সুন্দর, সফল, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে গণতন্ত্রকামী প্রতিটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের বড় ভূমিকার কথাও। জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত এবং একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণের আহ্বান জানিয়ে ব্রিফিং শেষ করলেন।
গত ৪ জানুয়ারি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয় দলটির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিনকে। ওইদিন সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এই কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, এখন থেকে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র হিসেবে মাহদী আমিন নিয়মিত ব্রিফিং করবেন। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) থেকে এই ব্রিফিং শুরু করলেন সূক্ষ্ম বিশ্লেষণী শক্তির এই তরুণ রাজনীতিক।
একটি রাজনৈতিক দলের ধর্মীয় অনভূতির ক্রমাগত অপব্যবহারের বিষয়টি খোলাসা করে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র বলেছেন, ‘আমরা গণমাধ্যমে দেখলাম তাদের মার্কায় ভোট দিতে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ করানো হচ্ছে, যা সরাসরি নির্বাচন আচরণবিধির লঙ্ঘন। শুধু তাই নয়, আমরা দেখেছি সেই বিশেষ রাজনৈতিক দলটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং বিকাশ নাম্বার সংগ্রহ করছে, যার পেছনে অসাধু উদ্দেশ্য রয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই দলটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং বিকাশ নাম্বার সংগ্রহ করছে, যার পেছনে অসাধু উদ্দেশ্য রয়েছে।’
অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এ নির্বাচনে জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা ও দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, ‘১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আমরা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছি। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এ নির্বাচনে জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে।
তিনি আরও বলেন, ‘ইতিপূর্বে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে, যেমন: বাহরাইন, ওমান, কুয়েত ও সৌদি আরবে শত শত ব্যালট একটি নির্দিষ্ট দলের কর্মীদের কাছে রয়েছে, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ সংঘবদ্ধ ভোট সম্পূর্ণ বেআইনি। কোথাও একজনের নাম্বার ব্যবহার করে আরেকজনের পোস্টাল ব্যালট পেপার সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। যেহেতু বাংলাদেশে প্রবাসীদের ভোটদান প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে, আমরা চাই প্রবাসীদের ভোটের ক্ষেত্রেও সমতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত হোক। উল্লেখ্য, বিএনপিই সর্বপ্রথম প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছিল।’
পোস্টাল ব্যালটের ক্ষেত্রে ধানের শীষ প্রতীকের অবস্থান নিচের দিকে
মাহ্দী আমিন বলেন, দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, পোস্টাল ব্যালটের ক্ষেত্রে ধানের শীষ প্রতীকের অবস্থান নিচের দিকে, যা সহজে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভাঁজ করলে ধানের শীষ প্রতীক চোখে পড়ে না বা দাগের কারণে মুছে যেতে পারে। অথচ প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতীকের অবস্থান সহজে দেখা যায় এমন জায়গায় রাখা হয়েছে। চাইলেই কলাম বা লাইনের সংখ্যা পুনঃবিন্যাস করে প্রতীকের অবস্থানগত বৈষম্য দূর করা যেত এবং পোস্টাল ব্যালটকে স্বচ্ছ রাখা যেত।
তিনি আরও বলেন, গত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী আমলের গুম, খুন, হামলা ও মামলার সময়ে বিএনপির কয়েকজন প্রার্থী দেশের বাইরে ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের সেখানে নাগরিকত্ব ছিল এবং মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদনপত্র থাকার পরও নির্বাচন কমিশনে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে জটিলতা তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংবিধানের আর্টিকেল ৬৬ অনুযায়ী এখানে কোনো অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের অবকাশ নেই।
অন্য দল ও নেতারা প্রতিনিয়ত আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন
মাহ্দী আমিন বলেন, আমরা দেখেছি, বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রতীকসহ সরাসরি প্রার্থী ও দলের জন্য ভোট চাইছে বিভিন্ন কর্মসূচি এবং অনলাইনের মাধ্যমে। অথচ, বিএনপির চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান ব্যক্তিগত সফরে তার নানীর কবর জিয়ারত বা মওলানা ভাসানী ও গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদসহ অন্যান্য শহীদদের কবর জিয়ারতে বগুড়াসহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় যেতে চাইলেও সেই ব্যক্তিগত-ধর্মীয় সফরকে স্থগিত করার জন্য নির্বাচন কমিশন থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। সেই অনুরোধকে সম্মান জানিয়ে তিনি নির্ধারিত সফর বাতিল করেছেন। অন্য দল ও নেতারা প্রতিনিয়ত আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন। নির্বাচন কমিশনের এই নির্লিপ্ততা অনাকাঙ্ক্ষিত।
তিনি বলেন, এটি দুঃখজনক যে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক অপপ্রচার চলছে। মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন ও ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন করা হচ্ছে। এর প্রেক্ষিতে বিএনপি নির্বাচন কমিশনে ফ্যাক্ট-চেকিং সেল গঠনের দাবি জানিয়েছে। আমরা আহ্বান জানাচ্ছি, দেশজুড়ে ফ্যাক্ট-চেকিং সেল দ্রুত কার্যকর করা হোক।
জাইমা রহমানের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ভেরিফাই
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র নিশ্চিত করেন, তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার তধরসধ জধযসধহ ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম আইডি সম্প্রতি মেটা কর্তৃক ভেরিফাই করা হয়েছে। ব্লু টিক ছাড়া তার আর কোনো অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট নেই। মাহ্দী আমিন বলেন, বিএনপির আইসিটি দপ্তর কর্তৃক ৫০টিরও বেশি ফেইক আইডি ও পেজ রিমুভ করা হয়েছে। এসব হ্যান্ডেল থেকে ডিপফেইক ও এআই-জেনারেটেড ভিডিও পোস্ট করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছিল। আরও কিছু আইডি ও পেজ অবশিষ্ট আছে; সেগুলো অপসারণের বিষয়ে মেটা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ চলমান।
ডা. জুবাইদা রহমানের কোনো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট বা পেজ নেই
তিনি আরও বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের নামে অনেক ফেইক ফেসবুক পেজ খোলা হয়েছে। এসব পেজে এআই দিয়ে তৈরি বানোয়াট ও মিথ্যা ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে। ডা. জুবাইদা রহমানের কোনো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট বা পেজ নেই। তাই সবাইকে বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। নির্বাচনের সময়ে গণমানুষের সাথে সম্পৃক্ততার লক্ষ্যে বিএনপি ইতিমধ্যে কল সেন্টার চালু করেছে। যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো বিষয়ে অনুসন্ধান, তথ্য, পরামর্শ বা অভিযোগ জানাতে ১৬৫৪৩ নম্বরে কল করতে পারবেন।
তিনি বলেন, বিএনপি প্রণীত বিভিন্ন পলিসির জনমত তৈরি ও গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণের লক্ষ্যে ‘Match My Policy’ কার্যক্রম শুরু করেছে। ওয়েবসাইটের লিংক: https://www.matchmypolicy.net/। এখানে বিএনপির প্রতিটি সেক্টরের মূল পলিসি বিষয়ে যে কেউ ব্যক্তিগত মতামত, পছন্দ-অপছন্দ জানাতে পারবেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের মতামতকে সম্মান ও প্রাধান্য দেওয়া।
সিলেট সফরের মধ্যে দিয়ে তারেক রহমানের নির্বাচন কার্যক্রম শুরু
মাহ্দী আমিন বলেন, আমাদের সম্মানিত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করবেন আগামী ২২ জানুয়ারি সিলেট সফরের মধ্য দিয়ে। বিস্তারিত পরবর্তীতে জানানো হবে। তিনি বলেন, গণভোটের ক্ষেত্রে বিএনপি সবসময় গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। ২০১৬ সালের ভিশন ২০৩০, ২০২২ সালের ২৭ দফা এবং ২০২৩ সালের ৩১ দফার ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে বিএনপি সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। জুলাই চার্টারে আমাদের অবস্থান এবং নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।
কালের আলো/জেএন/এমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array