বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে নতুন আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোয় নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পৃথক তিনটি আইনের অধীনে পরিচালিত বাহিনীকে এবার একটি সমন্বিত আইনের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ‘আনসার বাহিনী আইন’ বাস্তবায়িত হলে বাহিনীর পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ খুলবে।
বৃহস্পতিবার (০১ অক্টোবর) রাজধানীর খিলগাঁওয়ে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর অডিটোরিয়ামে নবনির্মিত ‘অগ্রযাত্রা ভবন’, ‘প্রান্তিক সংযোগ’ পরিষেবা, ‘প্রান্তিক শক্তি’ ও ‘ভ্রাম্যমাণ আইটি প্রশিক্ষণ সেন্টার’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ কথা জানান।
- পৃথক তিন আইন বিলুপ্ত করে সমন্বিত কাঠামোর উদ্যোগ
- তেজগাঁওয়ে হচ্ছে আধুনিক সদর দপ্তর
- এক লাখ স্বেচ্ছাসেবককে আনা হচ্ছে ডিজিটাল ব্যবস্থায়
তিন আইন থেকে এক কাঠামো
বর্তমানে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ‘আনসার বাহিনী আইন, ১৯৯৫’, ‘আনসার ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৩’ এবং ‘গ্রাম প্রতিরক্ষা দল আইন, ১৯৯৫’—এই তিনটি পৃথক আইনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা হলো পৃথক এই আইনি কাঠামোগুলোকে একটি একক আইনের অধীনে নিয়ে আসা। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘একাধিক আইনের পরিবর্তে একটি সমন্বিত ও একক আইন প্রণয়ন করে তার অধীনে আধুনিক বিধিমালা তৈরি করা হলে বাহিনীর সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের আইনিভিত্তি আরও সুদৃঢ় হবে।’ এই উদ্যোগের মাধ্যমে পৃথক আইনের বদলে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি হলে বাহিনীর বিভিন্ন শাখার দায়িত্ব, কর্তৃত্ব ও পারস্পরিক সম্পর্ক নতুনভাবে নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে অভিন্ন নীতিমালা কার্যকর করার পথও সহজ হতে পারে।

তেজগাঁওয়ে আধুনিক সদর দপ্তর
আইনি সংস্কারের পাশাপাশি আনসার বাহিনীর অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তেজগাঁওয়ে ৩ দশমিক ৪২৮ একর পরিত্যক্ত জমি আইনানুগভাবে হস্তান্তরের মাধ্যমে আধুনিক আনসার সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হবে। পরিকল্পিত বহুতল ভবনের সঙ্গে থাকবে আধুনিক কমান্ড সেন্টার। এখান থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে দ্রুত তথ্য বিনিময়, সেন্ট্রাল অপারেশন মনিটরিং এবং সমন্বিত কৌশলগত পরিকল্পনা পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ‘আধুনিক সদর দপ্তর ও কমান্ড সেন্টার থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে দ্রুত তথ্য বিনিময়, সেন্ট্রাল অপারেশন মনিটরিং এবং সমন্বিত কৌশলগত পরিকল্পনা পরিচালনা করা সম্ভব হবে।’ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন নতুন এই কাঠামো বাস্তবায়িত হলে আনসারের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবী কাঠামোর কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা বাড়তে পারে।

নিরাপত্তায় বাড়ছে আনসারের ভূমিকা
জাতীয় নির্বাচন, ধর্মীয় উৎসব, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ও জনসমাগমস্থলের নিরাপত্তায় আনসার সদস্যদের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি দুর্গম পার্বত্য ও সীমান্তবর্তী এলাকায় যৌথ নিরাপত্তা কার্যক্রম, অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ, উচ্ছেদ অভিযান, অপরাধ দমন, নিখোঁজ শিশু উদ্ধার এবং দালালবিরোধী কার্যক্রমেও তাদের সম্পৃক্ততার কথা বলেন তিনি। বাহিনীটির দায়িত্বের পরিধি যে শুধু প্রথাগত নিরাপত্তা সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা স্পষ্ট। জননিরাপত্তার বিভিন্ন স্তরে আনসার সদস্যদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। মন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন, ধর্মীয় উৎসব, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ও জনসমাগমস্থলের নিরাপত্তায় আনসার সদস্যরা নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।’
এক লাখ স্বেচ্ছাসেবককে ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনা
মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও বড় পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, এক লাখ টিডিপি স্বেচ্ছাসেবককে আধুনিক প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে একটি শক্তিশালী স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এক লাখ টিডিপি স্বেচ্ছাসেবককে আধুনিক প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে শক্তিশালী স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে।’
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ, ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্প, ডিজিটাল প্রশিক্ষণ এবং ‘প্রান্তিক সংযোগ’ ও ‘প্রান্তিক শক্তি’র মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিক সেবা কার্যক্রম। মন্ত্রীর মতে, এসব উদ্যোগ দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে। এতে আনসার-ভিডিপির প্রচলিত নিরাপত্তা ভূমিকার সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও আরও গতি আসবে।

ইতিহাস থেকে আধুনিকায়নের পথে
অনুষ্ঠানে আনসার-ভিডিপির ঐতিহাসিক বিকাশও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে ১৯৭৬ সালে জনগণকে সম্পৃক্ত করে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দর্শনের কথা উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৫ সালে পৃথক তিনটি আইন প্রণয়ন এবং ২০০৪ সালে স্বাধীনতা পদক প্রদানের মাধ্যমে বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এখন প্রস্তাবিত একক আইন ও আধুনিক অবকাঠামোর মাধ্যমে সেই কাঠামোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, কেন্দ্রীয় মনিটরিং এবং প্রশিক্ষণভিত্তিক মানবসম্পদ উন্নয়ন বাহিনীটির প্রচলিত কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
একই সংস্কারধারার চারটি উদ্যোগ
একটি একক আইন, আধুনিক সদর দপ্তর, কমান্ড সেন্টার এবং ডিজিটাল প্রশিক্ষণ—চারটি উদ্যোগকে একই সংস্কারধারার অংশ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। লক্ষ্য হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা ও তৃণমূল পর্যায়ের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং বাহিনীর সক্ষমতাকে প্রযুক্তিনির্ভর করা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন সদর দপ্তরকে কেন্দ্র করে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর পরিচালনগত সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার সমন্বয় আরও সুদৃঢ় হবে।’ মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সুশাসন, শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব, উদ্ভাবন, জবাবদিহিতা ও সততার ভিত্তিতে নতুন সদর দপ্তরটি জনসেবার একটি আধুনিক মডেল হিসেবে গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কালের আলো/এমএএএমকে
আপনার মতামত লিখুন
Array