মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি নেই
অনেকেই মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। কিন্তু সমাজের কাছে হেয় হওয়ার ভয়ে বেশিরভাগই চিকিৎসকের কাছে যান না। আবার যখন যাওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন কাছেধারে চিকিৎসক পান না। সময় গড়ালেও পরিস্থিতির যে উন্নতি হচ্ছে না, তা উঠে এসেছে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ বলছে, ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক, ১২ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুর মানসিক সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে ৯১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক আর ৯৩ শতাংশ শিশু চিকিৎসা সেবার বাইরে রয়েছে। পরবর্তীতেও এমন পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা।
এত লোক মানসিক স্বাস্থ্য সেবার বাইরে থাকার কারণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী সেবাকেন্দ্র, সচেতনতা, প্রচারের অভাব আর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কম বাজেটকে দায়ী করছেন।
তিনি বলেন, ৯০ শতাংশ সেবাকেন্দ্রই ঢাকাকেন্দ্রিক। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ঢাকা মেডিকেল ও অনেক জেলা সদর হাসপাতালে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ-সাইকিয়াট্রিস্ট থাকলেও পুরো জেলায় সংখ্যাটা এক বা দুই। ফলে সমস্যায় পড়লে চিকিৎসকের তথ্য না পেয়ে ভুক্তভোগীরা ওঝা, কবিরাজের কাছে গিয়ে পানি পড়া, ঝাড়-ফুঁক নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
২০২৪ সালে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর আঁচল ফাউন্ডেশনের চালানো এক গবেষণা বলছে, তাতে অংশ নেওয়া ৭৯ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী হতাশায় ভোগার কথা বলেছেন। ক্যাম্পাসে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হয় কিনা, এ প্রশ্নে ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী হ্যা, ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী না উত্তর দিয়েছিলেন। আর ২৬ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন এ সম্পর্কে তারা কিছু জানেন না।
ওই গবেষণার সমন্বয়ে ছিলেন শেখ রফিকউজ্জামান। তিনি বলেন, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা কম হয় এবং এই সেবাকে ‘ট্যাবু’ হিসেবে দেখা হয়। ‘শিক্ষা ব্যবস্থায় মানসিক সমস্যার উপসর্গ, স্টিগমাগুলো এখনও সেভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। শিক্ষার্থীদের শেখানো হয়নি কিভাবে অল্পতে সন্তুষ্ট থাকা যায়, শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পারেন না।’
মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কর্মরত জনশক্তি প্রতি লাখ জনসংখ্যার জন্য ০.৫০ জন। সাইকিয়াট্রিস্ট প্রায় ৩৫০ (প্রতি লাখ জনসংখ্যার জন্য ০.১৭ জন), সাইকোলজিস্ট ৫৬৫ (প্রতি লাখ জনসংখ্যার জন্য ০.৩৪ জন), সাইকিয়াট্রিক সোশাল ওয়ার্কার ৭ (প্রতি লাখ জনসংখ্যার জন্য ০.০০৪ জন) ও অকুপেশনাল থেরাপিস্টের সংখ্যা ৩২৪ (প্রতি লাখ জনসংখ্যার জন্য ০.১৮ জন)।
আর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাধারণ চিকিৎসক ২১ হাজার ২৬৭, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মী ৯ হাজার ৪০০, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স ২৮ হাজার ১৬৫, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক হাসপাতালে কর্মরত সেবিকা ৭০০, স্পিচ থেরাপিস্ট ১৭২ জন রয়েছেন।
উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি পড়ানো হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষায়িত স্নাতকোত্তর কোর্স থাকলেও, আলাদা কোনো বিভাগ নেই। বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে জনবল রয়েছে চারশর কম। তবে ৮৭৯ জন জনবলের প্রস্তাব করা হয়েছে বলেছেন ইনস্টিটিউটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কামরুজ্জামান মুকুল।
কালের আলো/এম/এএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array