শীত মৌসুমে দেশের পেঁয়াজের বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ফরিদপুর ও পাবনা অঞ্চলে উৎপাদিত মুড়িকাটা পেঁয়াজ। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর নতুন মৌসুমের আবাদ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। তবে মৌসুমের শুরুতেই সারের সংকট, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তাঁরা। বিশেষ করে ডিএপি সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় পেঁয়াজের উৎপাদন ও কাঙ্ক্ষিত মুনাফা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে খরচ বাড়লেও বাজারে পেঁয়াজের বিক্রিমূল্য সেই অনুপাতে না বাড়লে লোকসানের মুখে পড়তে পারেন তাঁরা। এতে আগামীতে পেঁয়াজের আবাদ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সরকারি দামের চেয়ে বেশি দিয়েও মিলছে না সার
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ শুরু হওয়ায় জমি প্রস্তুত, সার প্রয়োগ, সেচ, রোপণ ও পরিচর্যার কাজে ব্যস্ততা বেড়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় সার না পাওয়ায় অনেকটা বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। বিশেষ করে ডিএপি সারের সংকট তাঁদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত দাম বস্তাপ্রতি এক হাজার ৫০ টাকা হলেও কোথাও কোথাও এক হাজার ৮০০ টাকা দিয়েও চাহিদামতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাড়তি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের। সারের পাশাপাশি মুড়িকাটা পেঁয়াজের গুটি কিনতেও বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মণ গুটি দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার টাকা দরে কিনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। এর সঙ্গে জমি প্রস্তুত, সেচ, রোপণ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিচর্যার খরচ যোগ হয়ে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ছে।
বাড়তি বিনিয়োগে মুনাফা নিয়ে অনিশ্চয়তা
ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর মাঠে কথা হয় পেঁয়াজচাষি রহিম মোল্লা, আবুল কালাম ও জাকির শেখসহ কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁরা জানান, পেঁয়াজ উৎপাদনের প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদিত পেঁয়াজের বিক্রিমূল্য সেই অনুপাতে বাড়বে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, বাড়তি টাকা বিনিয়োগ করে আবাদ করলেও প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। উৎপাদন কম হলে কিংবা মৌসুমে বাজারে পেঁয়াজের দাম পড়ে গেলে লোকসানের ঝুঁকি আরও বাড়বে। জেলার চর মাধবদীয়ার পেঁয়াজচাষি তুহিন মণ্ডল, আজমল ব্যাপারী ও হোসেন শেখও একই উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় কৃষকের ন্যায্য বিক্রয়মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে এ ফসলের আবাদ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। তাঁরা মৌসুমের শুরুতেই ন্যায্যমূল্যে সার সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষি উপকরণের বাজার তদারকি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
আবাদ ব্যাহত হলে বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে
ফরিদপুর সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, মুড়িকাটা পেঁয়াজ দেশের শীতকালীন বাজারে সরবরাহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফরিদপুর অঞ্চলের আগাম উৎপাদিত পেঁয়াজ বাজারের চাহিদা পূরণে সহায়তা করে। ফলে এ ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হলে বাজারের সরবরাহ ও দামের ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।ফরিদপুর কৃষক সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মানিক মজুমদার বলেন, চাষিরা সময়মতো সার, কীটনাশক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ না পেলে পেঁয়াজের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। তাই কৃষকদের প্রয়োজনীয় উপকরণ সময়মতো সরবরাহ করা জরুরি।
৫ হাজার ৮৮৫ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহাদুজ্জামান জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ হাজার ৮৮৫ হেক্টর। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎপাদনের উপকরণ সরবরাহ, চাষিদের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সহসভাপতি অ্যাডভোকেট শিপ্রা গোস্বামী বলেন, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে শুধু আবাদি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করলেই হবে না। সময়মতো সার ও জ্বালানি সরবরাহ এবং উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাজারমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি।তিনি মনে করেন, বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের চাপে কৃষকের মুনাফা কমে গেলে পেঁয়াজের উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহ ধরে রাখা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]