উচ্চ সুদহার, গ্যাস সংকট, ডলারের চাপ ও কমে যাওয়া বাজারচাহিদার কারণে দেশের উৎপাদন খাত বড় ধরনের সংকটে পড়েছে বলে জানিয়েছেন শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানায় নতুন করে অর্থায়নের বদলে যেসব কারখানা এখনো টিকে আছে, সেগুলোকে সহায়তা দিলে শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষা করা সম্ভব হবে।
মঙ্গলবার (১২ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে এ প্রস্তাব দেন ব্যবসায়ী নেতারা। বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান ব্যবসায়ী নেতা ও বিআইসি সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি বলেন, শিল্প খাত সচল রাখতে কার্যকর মূলধন সহায়তা, ঋণের সুদহার কমানো, পেনাল ইন্টারেস্ট হ্রাস এবং বিদেশি রিফাইন্যান্সিং সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।
বৈঠকে এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসাইন ও জসীম উদ্দীন, বিসিআইর সাবেক সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী, মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, বিসিএমইএর চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম স্বপন, বিএমএএমএর সভাপতি মতিউর রহমান, বিজিএপিএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ শাহরিয়ার এবং বিসিআইর সহসভাপতি প্রীতি চক্রবর্তীসহ শীর্ষ ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।
আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, কোভিড-পরবর্তী সময় থেকেই শিল্প খাতে কার্যকর মূলধনের সংকট তৈরি হয়েছে। পরে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, সুদহার বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এতে উৎপাদন খাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
তিনি বলেন, সরকারও মনে করে, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে শিল্প খাত টিকিয়ে রাখতে হবে। সেই বিবেচনা থেকেই বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলো সচল রাখতে বিভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা এলসি সীমা–সংক্রান্ত জটিলতা কমানোর দাবি জানান। তাঁদের মতে, যেসব এলসি সীমা অতিক্রম করেছে, সেগুলো আলাদাভাবে ব্লক করে মূল সীমা সচল রাখলে ব্যবসা পরিচালনা সহজ হবে। পাশাপাশি বিদেশি তহবিল ও রিফাইন্যান্সিং সুবিধা বাড়ানোরও প্রস্তাব দেওয়া হয়, যাতে কম সুদে অর্থায়ন পাওয়া যায়।
সুদহার প্রসঙ্গে পারভেজ বলেন, ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যয় ৮ থেকে ১০ শতাংশের বেশি নয়। এরপরও অতিরিক্ত স্প্রেড যোগ করে ঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে নেওয়া হচ্ছে। সরকার চাইলে এই স্প্রেড কমিয়ে শিল্প খাতকে স্বস্তি দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ঋণ খেলাপি হওয়ার পর অতিরিক্ত পেনাল ইন্টারেস্ট আরোপ শিল্প খাতের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। শিল্পকারখানাকে শাস্তি না দিয়ে কীভাবে তারা ঋণ পরিশোধে সক্ষম হবে, সেই পরিবেশ তৈরি করা উচিত।
সিআইবি রিপোর্টে ‘গ্রুপ কনসেপ্ট’ নিয়েও আপত্তি তোলেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের অভিযোগ, একই পরিচালক থাকার কারণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে গ্রুপ হিসেবে দেখানো হয়। ফলে একটি প্রতিষ্ঠান সমস্যায় পড়লে অন্য ভালো প্রতিষ্ঠানও নেতিবাচক সিআইবি রিপোর্টের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আলাদাভাবে মূল্যায়নের দাবি জানান তাঁরা।
এমএসএমই খাত নিয়েও গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান পারভেজ। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে অনাগ্রহী। জটিল কমপ্লায়েন্স প্রক্রিয়া সহজ করা, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল চালু এবং স্বল্প সুদে ঋণসুবিধা দেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রস্তাবগুলো ইতিবাচকভাবে শুনেছে। গভর্নর জানিয়েছেন, কার্যকর মূলধন, বিদেশি রিফাইন্যান্সিং ও পেনাল ইন্টারেস্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ চলছে এবং শিগগিরই কিছু সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
ব্যবসায়ী নেতা বলেন, একটি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেলে সেটি পুনরায় সচল করা অত্যন্ত কঠিন। তাই যেসব কারখানা এখনো চালু আছে, সেগুলোকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস সংকট, গ্যাসের মূল্য ২৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংকটে পড়েছে। শিল্প শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, এটি জাতীয় সম্পদ। তাই সম্ভাবনাময় শিল্পগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন।
তহবিল সহায়তা প্রসঙ্গে পারভেজ জানান, রপ্তানি খাতের ক্যাশ ইনসেনটিভের অর্থ এপ্রিল পর্যন্ত ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে গভর্নর জানিয়েছেন। এ ছাড়া গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকদের বেতন-সহায়তার প্রয়োজনীয়তা কমে এসেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কালের আলো/এসআর/এএএন
আপনার মতামত লিখুন
Array