খুঁজুন
                               
, ,
           

জনবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬, ৪:০১ অপরাহ্ণ
জনবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই: প্রধানমন্ত্রী

Oplus_131072

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, একটি ন্যায়ভিত্তিক ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।

মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবনে ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’ এর উদ্বোধন শেষে এ তিনি কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, সেবা প্রদান জনগণের প্রতি করুণা নয় বরং জনগণের সেবা নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব। আমাদের লক্ষ্য একটি দুর্নীতিমুক্ত, হয়রানিমুক্ত, প্রযুক্তিনির্ভর ও নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা, যা দেশের টেকসই উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

তিনি আরও বলেন, আজ থেকে হয়তো ১শ’ বছর আগে, যে জমির মালিক ছিলেন মাত্র একজন। সময়ের পরিক্রমায় বর্তমানে সেই জমির মালিক হয়তো ১শ’ কিংবা তারও বেশি।  এভাবে ভূমির মালিকানা-শরিকানা যেমন বেড়েছে স্বাভাবিকভাবেই জমির মালিকানা সংক্রান্ত পুরো প্রক্রিয়াকে রেকর্ডে রাখার জন্য ভূমি কর্মকর্তাদের দায়িত্বও তেমন বেড়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মালিকানা, খাজনা, দলিল, খতিয়ান, দাগ, পর্চা, নামজারি, জমা-খারিজ, মৌজা, সি-এস, আর-এস বা ডি-এস এই শব্দগুলোর সঙ্গে জমির মালিক মাত্রই কমবেশি পরিচিত। ফলে এইসব বিষয়ে নিজেদের মালিকানা হালনাগাদ রাখতে মানুষকে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে আসতে হতো। তবে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ভূমি ব্যবস্থাপনাও আধুনিক হয়েছে।

ভূমি ব্যবস্থাপনা যত বেশি আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর করা যায় জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির পথও তত বেশি সহজ হয়ে যায় উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, জমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনলাইন সুবিধা নিশ্চিত করায় জমিজমা সংক্রান্ত দুর্ভোগ অনেকটা লাঘব হবে।

তিনি বলেন, একইসঙ্গে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ভূমি অফিসগুলোতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্মও কমবে। চলমান এই ভূমি মেলা আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জনগণের নিজেদের দায়দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন করবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাথাপিছু জমির পরিমাণও কমে আসছে। ফলে জমির অর্থনৈতিক মূল্য যেমন বাড়ছে, তেমনি জমি নিয়ে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা এবং জটিলতাও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিরোধ ব্যক্তি ও পরিবারের শান্তি নষ্ট করার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও প্রতিবন্ধকতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার, নির্ভুল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা বর্তমানে সময়ের অপরিহার্য দাবি।

উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে নির্ভুল ভূমি রেকর্ড প্রস্তুত করতে ভূমি মন্ত্রণালয় কাজ করছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ভূমি প্রশাসনের প্রায় সব সেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসে নাগরিকদের জন্য সেবা গ্রহণকে আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য এমন একটি ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, যেখানে ভূমিসেবা গ্রহণের জন্য মানুষকে আর অযথা অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না, দুর্নীতি বা হয়রানির শিকার হতে হবে না।

দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করতে সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করে জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে জনগণকে সহায়তার লক্ষ্যে সারাদেশে ভূমিসেবা মেলা আয়োজন এবং জমি ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ এবং আধুনিকায়ন করার ব্যাপারে আমরা জাতীয় নির্বাচনের কয়েক বছর আগে প্রণীত ৩১ দফা এবং সর্বশেষ নির্বাচনি ইশতেহারেও উল্লেখ করেছিলাম।

তিনি আরও বলেন, আজ থেকে সারাদেশে তিন দিনব্যাপী এ ধরনের ভূমিসেবা মেলার আয়োজনের মাধ্যমে সরকার জনগণের কাছে দেওয়া আরও একটি নির্বাচনি ইশতেহার পূরণ করেছে।

সরকার জনগণকে দেওয়া ওয়াদা পূরণের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, সরকার পর্যায়ক্রমে একের পর নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিটি দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের কাছে দেওয়া ওয়াদা পূরণের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, শুধুমাত্র জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়েই নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে চায়। কারণ, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট দেশের জনগণ বর্তমানে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তাদের অধিকারের প্রতিফলন দেখতে চায়। এ কারণেই বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম সপ্তাহ থেকেই নির্বাচনি ইশতেহার এবং জুলাই সনদের প্রতিটি দফা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ের আদালতগুলোতে দেওয়ানি এবং ফৌজদারি সবমিলিয়ে ৪৭ লাখেরও বেশি মামলা বিচারাধীন। এরমধ্যে জমিজমা সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাই বেশি। সুতরাং এ মুহূর্তে সরকারের সামনে প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে আদালতে বিচারাধীন মামলার দ্রুততম নিষ্পত্তি। তবে প্রচলিত আদালতের বাইরেও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গ্রাম আদালত কিংবা এডিআর (বিকল্প বিবাদ নিরসনের ব্যবস্থা) অর্থাৎ বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মতো আইনানুগ মাধ্যম অবলম্বনের দিকে আরও জোর দেওয়া জরুরি। এতে একদিকে বিরোধ নিষ্পত্তিতে যেমন অল্প সময় লাগবে, অপরদিকে অনেকক্ষেত্রেই বিরোধ হয়তো শত্রুতায় রূপ নেবে না।

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উক্তির কথা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, ‘শক্তি দিয়ে শান্তি রক্ষা করা যায় না, বোঝাপড়ার মাধ্যমেই এটি অর্জন করা সম্ভব’।

বিশেষ করে জমিজমা সংক্রান্ত মামলা বা দেওয়ানি মামলাগুলো পর্যায়ক্রমে সমঝোতা বা মধ্যস্থতা, সালিশের মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পথ কার্যকর করা গেলে একদিকে আদালতে বিচারাধীন মামলার জট কমবে, অপরদিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করাও সহজ হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জমি বা ভূমি শুধু একটুকরো সম্পদই নয়  বরং মানুষের জীবনে এটি একধরনের নিরাপত্তা, নির্ভরতা, অর্থনৈতিক স্থিতি, জীবিকা এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি। এই উপলব্ধি থেকেই ভূমি ব্যবস্থাপনাকে হয়রানি ও দুর্নীতিমুক্ত করার অঙ্গীকার নিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় রাষ্ট্রীয় সেবা পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার কাজ করছে।

সবশেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারাদেশের সব জেলা-উপজেলায় আজ থেকে শুরু হওয়া ভূমি মেলার মাধ্যমে জনগণ নিঃসন্দেহে উপকৃত হবেন। কারণ মেলায় ই-নামজারি, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, রেকর্ড সংশোধন, খতিয়ান গ্রহণ এবং ভূমি সংক্রান্ত যে কোনো অভিযোগ নিষ্পত্তির সুবিধা থাকছে।

সূত্র: বাসস

কালের আলো/এসএকে

চলনবিলে পাখি শিকারের মহোৎসব, জালে বন্দি শত শত পাখি

নাটোর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০১ পূর্বাহ্ণ
চলনবিলে পাখি শিকারের মহোৎসব, জালে বন্দি শত শত পাখি

শীতের আমেজ শুরু হতেই অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠছে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি চলনবিল। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর খাল-বিল ও জলাশয়ে মাছের উপস্থিতি বাড়ায় খাবারের সন্ধানে আসছে নানা প্রজাতির দেশি-বিদেশি পাখি। কিন্তু প্রকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছে না সব পাখি। একশ্রেণির শিকারির পাতা ফাঁদে ঝাঁকে ঝাঁকে আটকা পড়ছে তারা। কোথাও জাল, কোথাও কলাপাতা ও খেজুরের ডাল দিয়ে তৈরি বিশেষ ঘর, আবার কোথাও বিষটোপ ব্যবহার করে চলছে পাখি শিকার। স্থানীয়দের অভিযোগ, শিকার করা পাখির একটি অংশ নিজেদের খাবারের জন্য রাখা হলেও বাকিগুলো বিক্রি করা হয় বিভিন্ন হাট-বাজারে। এমনকি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পাখি শিকার বন্ধে আইন ও প্রশাসনিক অভিযান থাকলেও নিয়মিত শিকার ঠেকানো যাচ্ছে না বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।

মাছের খোঁজে চলনবিলে অতিথি পাখি

পরিবেশবাদীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্ষার পানি নেমে যাওয়ায় চলনবিলের বিভিন্ন খাল, বিল ও জলাশয়ে পুঁটি, খলসে ও দারকে মাছের দেখা মিলছে। এসব মাছের আকর্ষণে সাদা বক, বালিহাঁস, মাছরাঙা, সারস ও পানকৌড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বিলাঞ্চলে আশ্রয় নিচ্ছে। খাবারের সন্ধানে পাখিগুলো এক বিল থেকে আরেক বিলে উড়ে বেড়ায়। বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও ফসলের মাঠে তাদের অবাধ বিচরণে প্রাণ ফিরে পায় প্রকৃতি। কিন্তু পাখির এই আগমনকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন শিকারিরা। বিভিন্ন কৌশলে ফাঁদ পেতে পাখি ধরে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কলাপাতা ও খেজুরের ডালে তৈরি বিশেষ ফাঁদ

চলনবিল অঞ্চলে পাখি শিকারের অন্যতম প্রচলিত কৌশল হলো বাঁশের খুঁটি, কলাপাতা, খেজুরের ডাল ও বেতের পাতা দিয়ে তৈরি বিশেষ ঘর বা ফাঁদ। প্রায় ৬ থেকে ৭ ফুট উঁচু এই ফাঁদ এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে আকাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখির ঝাঁক সহজেই সেখানে বসে পড়ে। ফাঁদের সামনে বাঁশের মগডালে রাখা হয় একটি পোষা বক। আকাশে বকের ঝাঁক দেখা গেলে শিকারি পোষা বকটিকে নাচাতে থাকেন। একপর্যায়ে বকটি ডাকাডাকি শুরু করলে আশপাশের বকেরা ফাঁদের ওপর বসে। তখন ফাঁদের ভেতরে থাকা শিকারিরা একে একে পাখিগুলো ধরে খাঁচায় ভরেন। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের ফাঁদকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। চলনবিলাঞ্চলে এই কৌশলের প্রচলন বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বড়শি, বিষটোপ ও জালেও আটকা পড়ছে পাখি

শুধু বিশেষ ঘর তৈরি করেই নয়, আরও নানা উপায়ে পাখি শিকার করা হচ্ছে। বড়শির মুখে মাছ গেঁথে পাখিকে আকৃষ্ট করা হয়। কোথাও খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে বিষটোপ দেওয়া হচ্ছে। আবার বিলের ভেতরে ধানখেতে আড়াআড়িভাবে জাল পেতে রাখা হয়, যেখানে খাবারের সন্ধানে আসা পাখি আটকা পড়ে। এসব ফাঁদের কারণে পাখি আহত বা মারা যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বিষটোপের ব্যবহার শুধু লক্ষ্য করা পাখির জন্যই নয়, অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্যও বিপজ্জনক হতে পারে। ফলে পাখি শিকার বন্ধের পাশাপাশি বিষটোপ ও অবৈধ ফাঁদ অপসারণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন পরিবেশকর্মীরা।

রাতের অন্ধকারেও চলে শিকার, হাটে বিক্রি

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, একশ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি রাতের অন্ধকারে বন্দুক ব্যবহার করেও পাখি শিকার করেন। শিকার করা পাখি নিজেদের খাওয়ার পাশাপাশি বস্তায় ভরে বিক্রি করা হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাড়িতে খাবারের জন্য পাখি পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিকারি জানান, তাঁরা বিভিন্ন এলাকার ফসলের মাঠে খুঁটি পুঁতে কলাপাতা ও খেজুরের ডাল দিয়ে ফাঁদ তৈরি করেন। পাশাপাশি বিষটোপ ব্যবহার করেও পাখি শিকার করেন। ভোরে দল বেঁধে বিলে গিয়ে শিকার করা হয়। একেকজন শিকারি ১০টি থেকে শুরু করে শতাধিক পাখিও ধরেন বলে তাঁদের ভাষ্য। শিকারিদের কেউ কেউ জানান, এসব পাখির ক্রেতা রয়েছে এবং বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়া যায়। তাঁদের অনেকেই পাখি শিকার যে অপরাধ, সে বিষয়ে সচেতন নন বলেও দাবি করেছেন।

দুই শতাধিক কোয়েল পাখি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল হাটে

সরেজমিনে গিয়ে সোমবার বেলা ১১টার দিকে শিকারিদের জালে বন্দি প্রায় দুই শতাধিক কোয়েল পাখি দেখা যায়। রাতের শেষ প্রহর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এসব পাখি শিকার করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। পরে সেগুলো বিক্রির জন্য হাটে নেওয়া হচ্ছিল। স্থানীয় বাজারে শিকার করা পাখির দামও প্রজাতিভেদে আলাদা। বক বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। বালিহাঁসের দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। আর চাকলা পাখি বিক্রি হচ্ছে জোড়া ১৯০ টাকায়। এ ছাড়া কেউ কেউ হাট-বাজারে ঘুরে ঘুরেও পাখি বিক্রি করেন। প্রকাশ্যে এভাবে পাখি বিক্রির ঘটনা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও শিকার নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। পরিবেশবাদীদের মতে, শিকারিদের পাশাপাশি পাখি কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ,পাখি শিকার বন্ধে চলনবিলের কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিয়মিত কাজ করছে। তারা শিকারবিরোধী প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ফাঁদ থেকে পাখি উদ্ধার করে মুক্ত আকাশে অবমুক্ত করে। এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি।

সংগঠনটির সদস্যদের সহায়তায় শনিবার ভোরে নাটোরের সিংড়ায় পোষা বক ব্যবহার করে বক শিকারের অভিযোগে তিন শিকারির বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত কারাদণ্ড ও জরিমানার আদেশ দেন। অভিযান চলাকালে চলনবিলের আগমুরশন, বামিহাল, কাকিয়ান ও পূর্বভেংড়ী বিল এলাকা থেকে বক শিকারের কাজে ব্যবহৃত অর্ধশত পোষা ও শিকার করা বক উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ধানখেতে তৈরি ১০টি ‘কিল্লা ঘর’ নামের ফাঁদ ধ্বংস করা হয়। পরে সিংড়ার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) উপস্থিতিতে উদ্ধার করা পাখিগুলো মুক্ত আকাশে ছেড়ে দেওয়া হয়।

সচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জানান, চলনবিলের ধানখেতে ফাঁদ পেতে নিয়মিত পাখি শিকার করা হচ্ছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, অভিযানের সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করা হয়। পরিবেশকর্মীদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে পাখি শিকার পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। শিকারিদের সচেতন করার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি, অবৈধ ফাঁদ অপসারণ এবং শিকার করা পাখির বেচাকেনা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। শীতের মৌসুমে চলনবিল পরিযায়ী পাখির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। এসব পাখি জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। তাই নির্বিচারে পাখি শিকার অব্যাহত থাকলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

 

মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ, পটুয়াখালীতে কৃষি উদ্যোক্তার সাফল্য

পটুয়াখালী সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ, পটুয়াখালীতে কৃষি উদ্যোক্তার সাফল্য

বেকারত্ব ঘোচাতে চাকরির পেছনে না ছুটে আধুনিক কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মো. সোহাগ হোসেন মৃধা। মালচিং পেপার ও মাচা পদ্ধতি ব্যবহার করে ১০ একর জমিতে অসময়ে তরমুজ চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন তিনি। তাঁর খেতে রোপণ করা হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার চারা। সব মিলিয়ে প্রায় ৮ লাখ টাকা খরচ করে অন্তত ১৫ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রির আশা করছেন এই উদ্যোক্তা। ইতোমধ্যে প্রায় ৭ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন তিনি। খেতে থাকা বাকি তরমুজ বিক্রি করে আরও প্রায় ৮ লাখ টাকা আয়ের প্রত্যাশা করছেন সোহাগ। তাঁর এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বেকার তরুণদের কাছে আধুনিক কৃষি এখন স্বাবলম্বী হওয়ার একটি সম্ভাবনাময় পথ হিসেবে সামনে আসছে।

পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার দশমিনা সদর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত কাটাখালী গ্রামে সোহাগ হোসেন মৃধার এই তরমুজখেত। প্রচলিত মৌসুমের বাইরে তরমুজ উৎপাদনের লক্ষ্যে তিনি আধুনিক চাষপদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। খেতে মূলত ‘রিজেন্ট-২’ জাতের তরমুজ চাষ করেছেন তিনি। সোহাগের হিসাবে, চাষাবাদে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে বিক্রি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৭ লাখ টাকা। খেতে থাকা তরমুজ বিক্রি করে আরও প্রায় ৮ লাখ টাকা পাওয়ার আশা করছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা পূরণ হলে মোট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। তবে চূড়ান্ত লাভ নির্ভর করবে অবশিষ্ট তরমুজের বিক্রিমূল্য, উৎপাদন ও পরিবহনসংক্রান্ত অন্যান্য খরচ এবং বাজার পরিস্থিতির ওপর।

সাধারণত নির্দিষ্ট মৌসুমে তরমুজের আবাদ বেশি হয়। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিচর্যার মাধ্যমে মৌসুমের বাইরে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা যায়। সংশ্লিষ্ট কৃষি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, উন্নত চাষপদ্ধতি অনুসরণ করে বছরে একাধিকবার তরমুজ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার এবং উপযুক্ত পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে বছরে তিনবার পর্যন্ত তরমুজ চাষের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বাজারে দীর্ঘ সময় তরমুজ সরবরাহের সম্ভাবনা বাড়ে। তবে উৎপাদনের সংখ্যা ও সাফল্য নির্ভর করে জাত, আবহাওয়া, জমির অবস্থা, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় বাজার পরিস্থিতির ওপর। সোহাগের খেতে ‘রিজেন্ট-২’ জাতের তরমুজের উৎপাদন স্থানীয় কৃষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাঁর উদ্যোগ দেখে আশপাশের অনেক কৃষকও আধুনিক পদ্ধতিতে অসময়ে তরমুজ চাষের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

মালচিং পদ্ধতিতে জমির ওপর বিশেষ পলিথিন বা মালচিং পেপার দিয়ে তৈরি বেডে তরমুজের চারা রোপণ করা হয়। জমি প্রস্তুত করার পর বেড তৈরি করে নির্দিষ্ট দূরত্বে পলিথিনে ছিদ্র করা হয়। এরপর সেখানে চারা রোপণ করা হয়। সোহাগের খেতে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন ব্যবস্থাপনায় বাঁশের তৈরি মাচাও ব্যবহার করা হয়েছে। এই পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, পলিথিনের আবরণ মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি আগাছার বৃদ্ধি কমাতে এবং মাটির তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখে। ফলে সঠিক ব্যবস্থাপনায় গাছের পরিচর্যা সহজ হতে পারে। তবে মালচিং পেপার ব্যবহার করলেই সব ধরনের কীটপতঙ্গের আক্রমণ বন্ধ হয়ে যায় না। রোগবালাই ও পোকামাকড়ের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হয়।

প্রচলিত পদ্ধতিতে তরমুজ চাষের সময় অতিবৃষ্টি, মাটির আর্দ্রতার পরিবর্তন ও আগাছার কারণে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। মালচিং পেপার ব্যবহারে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং আগাছা নিয়ন্ত্রণে সুবিধা পাওয়া যায়। ফলে গাছের বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে। মাচা পদ্ধতিতে গাছের লতাপাতা ও ফল নির্দিষ্ট কাঠামোর ওপর ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এতে খেতের পরিচর্যা এবং গাছের অবস্থা পর্যবেক্ষণ সহজ হতে পারে। তবে মাচা তৈরির খরচ, শ্রম, সঠিক সেচ ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, জমি ও আবহাওয়ার উপযোগিতা যাচাই করে মালচিং ও মাচা পদ্ধতি প্রয়োগ করা গেলে তরমুজ চাষে উৎপাদন ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হতে পারে।

কৃষি উদ্যোক্তা মো. সোহাগ হোসেন মৃধা জানান, তিনি ইতোমধ্যে প্রায় ৭ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন। খেতে থাকা তরমুজ থেকে আরও অন্তত ৮ লাখ টাকা বিক্রির আশা করছেন। সোহাগ বলেন, স্থানীয় কৃষি বিভাগ থেকে তাঁকে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং খেতের খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। কৃষি বিভাগের এই সহযোগিতা তাঁর উদ্যোগ পরিচালনায় সহায়ক হচ্ছে বলেও জানান তিনি। বেকার তরুণদের উদ্দেশে সোহাগের পরামর্শ, কৃষিকে শুধু প্রচলিত পেশা হিসেবে না দেখে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত। পরিকল্পিতভাবে অসময়ে তরমুজ চাষ করতে পারলে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

দশমিনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাফর আহমেদ জানান, কৃষক সোহাগ হোসেন মৃধাকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, অসময়ে আধুনিক পদ্ধতিতে তরমুজ চাষে সাফল্যের সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন করে কেউ এ ধরনের কৃষি উদ্যোগে যুক্ত হতে চাইলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কারিগরি পরামর্শ ও মাঠপর্যায়ে সহযোগিতা দেওয়া হবে। কৃষি কর্মকর্তার মতে, আধুনিক চাষপদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা, জমির উপযোগিতা যাচাই, মানসম্মত বীজ নির্বাচন এবং নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, বাজারজাতকরণ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনাও কৃষি উদ্যোগের সাফল্যে ভূমিকা রাখে।

পটুয়াখালীর দশমিনায় সোহাগ হোসেন মৃধার উদ্যোগ দেখাচ্ছে, পরিকল্পিতভাবে আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রচলিত কৃষির বাইরেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব। ১০ একর জমিতে মালচিং পেপার ও মাচা পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করে তিনি ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিক্রি করেছেন। অবশিষ্ট ফসল বিক্রির মাধ্যমে তাঁর প্রত্যাশিত আয় অর্জিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে বাজার ও উৎপাদনের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির, বন্ধুত্বে বাঁধা দুই সম্প্রদায়

রাজশাহী সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ
পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির, বন্ধুত্বে বাঁধা দুই সম্প্রদায়

একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। একদিকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি, অন্যদিকে শোনা যায় শঙ্খধ্বনি। মসজিদে নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা, আর মন্দিরে পূজা-অর্চনায় মগ্ন হন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। দুই ধর্মের মানুষের উপাসনালয় পাশাপাশি হলেও সেখানে নেই বিরোধের ছায়া। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে গড়ে উঠেছে সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার পশ্চিম ঝিকরা গ্রামের এই চিত্র যেন ধর্মীয় সহাবস্থানের জীবন্ত উদাহরণ। বড়াল নদের পাড়ঘেঁষা এই জনপদে ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও মানুষের সামাজিক বন্ধন দৃঢ়। একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।

পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির, নেই বিরোধ

গ্রামের কর্মকারপাড়ায় প্রায় দুই দশক আগে, ২০০৫-০৬ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি কালীমন্দির। এরপর থেকে সেখানে কালীপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজন হয়ে আসছে। পরে ২০২১ সালে স্থানীয়দের উদ্যোগে মন্দিরের পাশেই নির্মাণ করা হয় পশ্চিম ঝিকরা জামে মসজিদ। একই আঙিনায় দুই ধর্মের উপাসনালয় গড়ে ওঠার পর শুরুতে কারও কারও মনে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। আজান, নামাজ, পূজা কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় আচার পালনের সময় কোনো ধরনের সমস্যা হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তবে গত পাঁচ বছরে সেই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়নি। বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দুই সম্প্রদায়ের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।

মন্দির ও মসজিদের কার্যক্রম পরিচালনায় একে অপরের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়। ধর্মীয় আচার পালনের সময় শব্দ ও পরিবেশের বিষয়েও সচেতন থাকেন সংশ্লিষ্টরা। এভাবেই দৈনন্দিন জীবনে সম্প্রীতির চর্চা করছেন গ্রামের মানুষ। মন্দিরের সভাপতি উত্তম কর্মকার বলেন, এই মন্দিরে দুই দশকের বেশি সময় ধরে পূজা হয়ে আসছে। পাশে মসজিদ প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দিকে কোনো সমস্যা হবে কি না, তা নিয়ে তাঁরাও ভেবেছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি বলেন, ‘এই মন্দিরে দুই দশকের বেশি সময় ধরে পূজা হচ্ছে। পাশে মসজিদ হওয়ার পর ভেবেছিলাম, কোনো সমস্যা হবে কি না। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। আজানের সময় আমরা মাইকের শব্দ বন্ধ রাখি। পূজার সময়ও পারস্পরিক বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা হয়। মুসলমান ভাইদের সঙ্গে আমাদের কখনো দ্বন্দ্ব হয়নি।’

উত্তম কর্মকারের বক্তব্যে উঠে আসে, ধর্মীয় পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একে অপরের ধর্মীয় কার্যক্রমের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ টিকে আছে।

মসজিদ ও মন্দিরের সভাপতির মধ্যে বন্ধুত্ব

পশ্চিম ঝিকরার সম্প্রীতির গল্পে বিশেষভাবে উঠে আসে মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. মুশফিকুর রহমান ও মন্দিরের সভাপতি উত্তম কর্মকারের বন্ধুত্ব। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক আন্তরিক। একে অপরের বাড়িতে যাওয়া, আড্ডা দেওয়া এবং বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নেওয়া তাঁদের নিয়মিত জীবনের অংশ। মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি মসজিদের সভাপতি, আর আমার বন্ধু অপু মন্দিরের সভাপতি। আমরা ভিন্ন ধর্মের মানুষ হলেও একসঙ্গে আড্ডা দিই। একে অপরের দাওয়াতে যাই। ঈদে তারা আমাদের বাড়িতে আসে, পূজায় আমরাও যাই। দিন শেষে আমরা সবাই একই গ্রামের মানুষ। এটাই আমাদের বড় পরিচয়।’ তাঁদের এই বন্ধুত্ব শুধু দুই ব্যক্তির সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং গ্রামের অন্য বাসিন্দাদের মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছে। ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রতিবেশী হিসেবে একে অপরের পাশে থাকার বিষয়টিই এখানে বেশি গুরুত্ব পায়।

ঈদ-পূজায় একে অপরের পাশে দাঁড়ান গ্রামবাসী

পশ্চিম ঝিকরার সম্প্রীতি ধর্মীয় উৎসবগুলোতেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুর্গাপূজার সময় মুসলিম যুবকেরা মন্দিরের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা করেন। অন্যদিকে ঈদের সময় হিন্দু যুবকেরাও মসজিদসংলগ্ন এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করেন। উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করা, প্রয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে মসজিদ ও মন্দিরের পাশাপাশি অবস্থান তাঁদের কাছে কেবল দুটি উপাসনালয়ের সহাবস্থান নয়; এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও মানবিকতার প্রতীক। গ্রামের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন আচরণেও এই সম্পর্কের প্রতিফলন দেখা যায়। ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও সামাজিক ও পারিবারিক নানা প্রয়োজনে তাঁরা একে অপরের সহযোগিতা নেন। একই জনপদের মানুষ হিসেবে পারস্পরিক সম্পর্ক অটুট রাখার বিষয়টিকেই তাঁরা গুরুত্ব দেন।

‘সারা বাংলাদেশের জন্য উদাহরণ’

চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস পশ্চিম ঝিকরার এই সম্প্রীতির প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, বিভিন্ন ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা উৎসবকে আরও সুন্দর করে তোলে। তিনি বলেন, ‘পশ্চিম ঝিকরার এই চিত্র সারা বাংলাদেশের জন্য একটি উদাহরণ। উৎসব সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। এখানকার মানুষ তা প্রমাণ করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই সম্প্রীতি অটুট রাখতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্প্রীতি বজায় রাখতে সহযোগিতার আশ্বাস স্থানীয়দের এই ইতিবাচক উদ্যোগকে আরও উৎসাহিত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সামাজিক বন্ধন

গ্রামের প্রবীণদের ভাষ্য, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিভেদ সমাজে দূরত্ব তৈরি করলেও পশ্চিম ঝিকরায় ধর্মীয় পরিচয় মানুষের সম্পর্কের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি। এক সম্প্রদায়ের আনন্দে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও শামিল হন। একইভাবে বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর চর্চাও রয়েছে। এই গ্রামের অভিজ্ঞতা দেখায়, ধর্মীয় সম্প্রীতি কেবল বক্তব্য বা আনুষ্ঠানিক আয়োজনের বিষয় নয়; দৈনন্দিন জীবনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার মাধ্যমেই তা ধরে রাখা সম্ভব। প্রতিবেশীর ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানানো এবং মতপার্থক্য থাকলেও সম্পর্ক অটুট রাখার মানসিকতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি