দেশে ব্যাংক কার্ডের ব্যবহার ও লেনদেনের পরিমাণ বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের অর্থমূল্য বেড়েছে ১০৩ শতাংশ। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে এসব কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ৭৭০ কোটি টাকায়। তবে দীর্ঘমেয়াদে লেনদেন বাড়লেও গত জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে দেশে ইস্যু করা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ব্যয় কমেছে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে কার্ডের সংখ্যা, লেনদেনের পরিমাণ, ব্যয়ের খাত এবং দেশি-বিদেশি কার্ডধারীদের ব্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, কার্ডের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি নগদনির্ভরতা, ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা ও সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ নগদবিহীন লেনদেনের সম্প্রসারণে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
- কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৯৬ শতাংশ, প্রিপেইডে প্রবৃদ্ধি ৮০৩%
- পাঁচ বছরে কার্ড লেনদেন বেড়েছে ১০৩ শতাংশ
- আগস্টে ক্রেডিট কার্ডের ব্যয় কমেছে ৫.৪৪ শতাংশ
- পাঁচ বছরে কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৯৬ শতাংশ
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশে ইস্যু করা ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯৬ শতাংশ। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে এই তিন ধরনের কার্ডের মোট সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৭০ লাখ ১৪ হাজার ৭২২টি। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ কোটি ২৯ লাখ ৫৪ হাজারে।
কার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধির হারে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে প্রিপেইড কার্ড। পাঁচ বছরে এ ধরনের কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০৩ শতাংশ। একই সময়ে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৬৯ শতাংশ এবং ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৫৯ শতাংশ। তবে মোট কার্ডের সংখ্যায় এখনো ডেবিট কার্ডের আধিপত্য রয়েছে।
কার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধির এই প্রবণতা দেশে কার্ডভিত্তিক আর্থিক সেবার বিস্তার নির্দেশ করে। তবে কার্ড ইস্যুর সংখ্যা বাড়া এবং সেগুলোর নিয়মিত ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নগদবিহীন লেনদেনের প্রকৃত অগ্রগতি মূল্যায়নে কার্ডের সংখ্যা ও লেনদেনের অর্থমূল্য—উভয় সূচকই গুরুত্বপূর্ণ।
আগস্টে ক্রেডিট কার্ডের ব্যয় কমেছে ৫.৪৪ শতাংশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে দেশে ইস্যু করা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৮৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। ফলে এক মাসের ব্যবধানে ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন কমেছে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
আগস্টে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্ট স্টোর বা বড় বিপণিবিতানে। এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা, যা মোট ক্রেডিট কার্ড ব্যয়ের প্রায় ৪৮ শতাংশ। জুলাইয়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। তবে সব খাতে ব্যয় কমেনি। খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে। জুলাইয়ে এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৪৮৮ কোটি টাকা, যা আগস্টে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১৮ কোটি টাকায়।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন পরিষেবার বিল পরিশোধে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় হয়েছে ৪৪২ কোটি টাকা। ওষুধ ও ফার্মেসিতে ২৮৪ কোটি, পোশাকের দোকানে ১৯৬ কোটি এবং পরিবহন খাতে ১২৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন কার্ডধারীরা। অর্থাৎ, আগস্টে ক্রেডিট কার্ডের মোট লেনদেন কমলেও কয়েকটি খাতে ব্যয় বেড়েছে। তবে এই পরিসংখ্যান থেকে সামগ্রিক ব্যয় কমে যাওয়ার নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যয় ৯৮৭ কোটি টাকা
আগস্টে বাংলাদেশে ইস্যু করা ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে ৯৮৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন বাংলাদেশিরা। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে ৫০৫ কোটি, ডেবিট কার্ডে ৪২২ কোটি এবং প্রিপেইড কার্ডে ৬০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
বিদেশে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মোট ব্যয়ের ১৭ দশমিক ১৬ শতাংশ হয়েছে দেশটিতে। এরপর থাইল্যান্ডে ১০ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ, ভারতে ৯ দশমিক ১২ শতাংশ এবং সিঙ্গাপুরে ৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে বিদেশে ব্যয়ের ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটিতে মোট ব্যয়ের ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ হার ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং ভারতে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। অন্যদিকে, বিদেশে প্রিপেইড কার্ডে বাংলাদেশিদের মোট ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ হয়েছে ভারতে। দেশটিতে এ ধরনের কার্ডের মোট ব্যয়ের ১৮ দশমিক ৭১ শতাংশ হয়েছে।
বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ড ব্যয় বেড়েছে ৩৪.৬৬ শতাংশ
আগস্টে বিদেশে ইস্যু করা কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে ২৪৯ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন বিদেশিরা। জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল ২৩৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক মাসে তাঁদের কার্ড ব্যয় বেড়েছে ৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। আর গত বছরের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের একই মাসে ব্যয় বেড়েছে ৩৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
তবে বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ড ব্যয়ের তুলনায় বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যয় প্রায় চার গুণ বেশি। আগস্টে বিদেশে বাংলাদেশিদের ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৯৮৭ কোটি টাকা, বিপরীতে বাংলাদেশে বিদেশিদের ব্যয় ছিল ২৪৯ কোটি টাকা।
বাংলাদেশে বিদেশি কার্ডধারীদের সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্ট স্টোরে। মোট ব্যয়ের ৩৫ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে এ খাতে। নগদ অর্থ উত্তোলনে ব্যয় হয়েছে ২৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ, পরিবহন খাতে ১২ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং পোশাকের দোকানে ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ।
দেশভিত্তিক হিসাবে, বাংলাদেশে বিদেশি কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেনের ২১ দশমিক ২৯ শতাংশ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ইস্যু করা কার্ড ব্যবহার করে। যুক্তরাজ্যে ইস্যু করা কার্ডের অংশ ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং ভারতে ইস্যু করা কার্ডের অংশ ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।
নগদনির্ভরতা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্ডের ব্যবহার বাড়লেও নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা, ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সাক্ষরতার ঘাটতি, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি আস্থার অভাব নগদবিহীন লেনদেনের সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে।
কার্ডের সংখ্যা ও লেনদেনের অর্থমূল্য বৃদ্ধি ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসারের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তবে শুধু কার্ডের সংখ্যা বাড়লেই নগদনির্ভরতা কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন সহজলভ্য ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো, নিরাপদ লেনদেনব্যবস্থা এবং গ্রাহকদের আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি।
কার্ডভিত্তিক লেনদেনের সম্প্রসারণের পাশাপাশি জালিয়াতি প্রতিরোধ, গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষা এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। গত পাঁচ বছরে ব্যাংক কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের অর্থমূল্য ১০৩ শতাংশ বৃদ্ধি দেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার সম্প্রসারণের চিত্র তুলে ধরে। তবে আগস্টে ক্রেডিট কার্ডের ব্যয় হ্রাস এবং নগদনির্ভরতা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ থেকে বোঝা যায়, এই অগ্রগতিকে টেকসই করতে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন। নিরাপদ লেনদেনব্যবস্থা, উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো এবং গ্রাহকের আস্থা নিশ্চিত করা গেলে দেশে নগদবিহীন লেনদেনের বিস্তার আরও ত্বরান্বিত হতে পারে।
কালের আলো/জেএন/এমকে
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]