রাষ্ট্রের কোষাগারে যে অর্থ জমা হয়, তার প্রতিটি টাকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন কৃষকের ঘাম, একজন শ্রমিকের পরিশ্রম, একজন প্রবাসীর ত্যাগ, একজন ব্যবসায়ীর কর এবং কোটি মানুষের স্বপ্ন। তাই রাষ্ট্রের অর্থ কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি জনগণের বিশ্বাসের প্রতীক। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। আর সেই দায়িত্ববোধ থেকেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি সাহসী, সময়োপযোগী এবং সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ।
বিশ্ব অর্থনীতি এখনও নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। যুদ্ধ, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অস্থিরতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যয়কে আরও বিচক্ষণ, আরও দায়িত্বশীল এবং আরও ফলপ্রসূ করে তোলার বিকল্প নেই।
এই প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন ও পরিচালন বাজেটের আওতায় নতুন মোটরযান, জলযান ও আকাশযান ক্রয় স্থগিত, সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে কড়াকড়ি, সুদমুক্ত বিশেষ ঋণে গাড়ি কেনা বন্ধ এবং নতুন ভবন নির্মাণে বিধিনিষেধ আরোপ—এসব সিদ্ধান্ত একটি সুস্পষ্ট বার্তা বহন করে: তারেক রহমানের সরকার এখন ব্যয়ের চেয়ে প্রয়োজনকে, আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে জনস্বার্থকে এবং বিলাসিতার চেয়ে জবাবদিহিকে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়।
দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল—সরকারি অর্থের প্রতিটি ব্যয় কি সত্যিই জনকল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে? বিদেশ সফর, নতুন গাড়ি, অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয় কিংবা অহেতুক আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে নানা সময়ে সমালোচনা হয়েছে। সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত সেই প্রশ্নের একটি বাস্তবধর্মী উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এটি প্রমাণ করে, রাষ্ট্র চাইলে নিজের ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে পারে।
এই নীতির আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো বাস্তবতার প্রতি সম্মান। জরুরি সেবা, নিরাপত্তা, অ্যাম্বুলেন্স, দশ বছরের বেশি পুরোনো যানবাহন প্রতিস্থাপন কিংবা নবগঠিত প্রতিষ্ঠানের যৌক্তিক প্রয়োজনকে ব্যতিক্রম হিসেবে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ উন্নয়নের গতি থামিয়ে নয়, অপচয়ের পথ বন্ধ করেই সাশ্রয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায় সরকার।
পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের বিষয়টিও এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নতুন সরকারি জিপ বা কারকে ফুল ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (এফইভি) করার সিদ্ধান্ত শুধু আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণের প্রতীক নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিও। জ্বালানি আমদানির চাপ কমানো, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও সরকার অযথা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ, উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা এবং বিশেষ প্রযুক্তিগত প্রয়োজনের জন্য সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, সরকারের লক্ষ্য দক্ষতা অর্জনের পথ বন্ধ করা নয়; বরং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—সীমিত সম্পদ দিয়ে অসীম চাহিদা পূরণ করা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো—সব ক্ষেত্রেই বিনিয়োগের প্রয়োজন বাড়ছে। তাই অপচয়ের প্রতিটি টাকা যদি সাশ্রয় করে জনকল্যাণে ব্যয় করা যায়, তবে সেটিই হবে প্রকৃত উন্নয়নের দর্শন।
তবে একটি বিষয় কখনোই ভুলে গেলে চলবে না—ভালো সিদ্ধান্তের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় তার বাস্তবায়নে। যদি এই নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়, যদি ব্যতিক্রমের সুযোগ অপব্যবহারের পথ বন্ধ হয়, যদি প্রতিটি ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়, তবে জনগণই হবে এর সবচেয়ে বড় উপকারভোগী। অন্যথায় পরিপত্র কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর পরিবর্তনের প্রত্যাশা অপূর্ণ থেকে যাবে।
অর্থ বিভাগের পরিপত্রে “ভ্যালু ফর মানি”—অর্থাৎ প্রতিটি টাকার সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, সেটিই এই নীতির প্রাণ। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় উন্নয়নের মান নির্ধারণ হয় ব্যয়ের পরিমাণ দিয়ে নয়; বরং জনগণের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাব দিয়ে।
রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের আমানত। সেই আমানতের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণই একটি গণমুখী সরকারের সবচেয়ে বড় পরিচয়। আজ যে সাশ্রয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা যদি আগামী দিনের স্বচ্ছ প্রশাসন, জবাবদিহিমূলক শাসন এবং জনকল্যাণভিত্তিক উন্নয়নের ভিত্তি হয়ে ওঠে, তাহলে ইতিহাস একে শুধু একটি ব্যয়সংকোচন নীতি হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার এক সাহসী সূচনা হিসেবেই স্মরণ করবে। সুতরাং ভ্যালু ফর মানি-এর কার্যকর বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নেই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
আপনার মতামত লিখুন
Array