গ্যাস সংকটের সমাধান কতদূর?
গ্যাস সংকট এখন আর কেবল রান্নার চুলার মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি বিদ্যুৎ বিভাগ হয়ে ধাক্কা দিচ্ছে দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায়। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও যানবাহনের দীর্ঘ সারি। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সরবরাহ ২০ কোটি ঘনফুটের বেশি কমে যাওয়ায় উৎপাদন কমেছে দেড় হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। বাধ্য হয়েই ঢাকার চেয়ে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং হচ্ছে বেশি। গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে উৎপাদন। সংকটে রয়েছে সাভার ও আশুলিয়ার প্রায় ১ হাজার ২০০ শিল্পকারখানাও।
এমন আকালের সময়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু করেছিল পেট্রোবাংলা। কিন্তু সরকারের উচ্চ পর্যায়ে সবুজ সংকেত না পেয়ে দাম বৃদ্ধির তৎপরতা থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁরা সরে এসেছে। শনিবার (০১ আগস্ট) রাতে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, এই মুহূর্তে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই।
মূলত মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন ও কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার মধ্যে দাম বাড়ানোর খবর সামনে আসায় তোলপাড় তৈরি হয়। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে পেট্রোবাংলা ঘেরাওয়ের হুমকি দেন। সোশ্যাল মিডিয়াতেও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির শঙ্কায় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তবে পেট্রোবাংলা নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলো আপাতত বাড়ছে না গ্যাসের দাম। এর আগে পেট্রোবাংলা গ্যাসের দাম বাড়ানোর একটি প্রস্তাব জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠিয়েছে বলে গত শুক্রবার সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই প্রস্তাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ২৫ টাকা এবং যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজির পাম্পমূল্য প্রায় ৬৫ টাকা করার কথা বলা হয়। যদিও প্রস্তাবের বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি পেট্রোবাংলার বিজ্ঞপ্তিতে।
উদ্বেগের মধ্যেই অবশ্য একটি সুখবর দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই কোম্পানিটি। মহেশখালীতে আগুনে পুড়ে যাওয়া এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি মেরামতের কাজ চলছে পুরোদমে। বিদেশি কোম্পানি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটির মেরামতে কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। কারণ ছোট ঘটনা থেকে বড় দুর্ঘটনা হয়ে গেলে বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। এ জন্য মেরামতে সময় বেশি লাগছে। গত কয়েকদিন এটি বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। এতে সারা দেশে গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে।
চলতি সপ্তাহেই গ্যাসের সংকট কেটে যাবে জানিয়ে পেট্রোবাংলা বলছে, আগামী ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে টার্মিনালটির একটি ইউনিট চালু হবে, তখন ২৫০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে। তার পরের সপ্তাহেই ২টি ইউনিট থেকে আগের মতো গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, দেশীয় গ্যাসের তুলনায় আমদানি করা এলএনজির ব্যয় কয়েক গুণ বেশি। এখন দেশীয় চাহিদার ৭০ শতাংশই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আর বাকি ৩০ শতাংশ গ্যাস এলএনজি আমদানি করে মেটানো হচ্ছে। আমদানিতে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার মোট আর্থিক ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
বিপরীতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। দিন দিন দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন কমছে। আগামী কয়েক বছরে আমদানির পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে এমন পূর্বাভাস রয়েছে। এ অবস্থায় বিদেশি উৎস থেকে কেনা দামের কাছাকাছি দাম নির্ধারণ করে সরকারের ভর্তুকি কমানোর বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক বছর ধরেই আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম বৃদ্ধি করে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব না দেয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন এর জের টানতে হচ্ছে। বর্তমান সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না বাড়ালে ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম ও ভর্তুকির চাপ আরও বাড়বে।
এম/এএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array